ড্রাগন চাষে বছরে ২০ লাখ টাকা আয় সৌরভের - Mati News
Tuesday, June 9

ড্রাগন চাষে বছরে ২০ লাখ টাকা আয় সৌরভের

পুলিশে চাকরি করার স্বপ্ন ছিল শৈশব থেকেই। কিন্তু নানা বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। তবে থেমে যাননি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নের তুলাতলী গ্রামের শিক্ষিত যুবক সৌরভ কুমার বিশ্বাস (৩০)। জীবনের নতুন পথ খুঁজতে গিয়ে শখের বসে শুরু করেছিলেন ড্রাগন চাষ। আর সেই শখই এখন বদলে দিয়েছে তার জীবন। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ড্রাগন চাষ করে বর্তমানে বছরে প্রায় ২০ লাখ টাকা আয় করছেন তিনি।

সৌরভ ২০১৮ সালে এক শিক্ষকের কাছ থেকে মাত্র ১২টি ড্রাগনের কাটিং সংগ্রহ করে ছোট পরিসরে ড্রাগন চাষ শুরু করেন। তখন তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়ির পাশে পরীক্ষামূলকভাবে ড্রাগন গাছ লাগিয়েছিলেন। পরবর্তিতে ধীরে ধীরে ড্রাগন চাষের প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে। এরই ধারাাবাহিকতায় ২০২২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেয়ার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু নানা সংকটে সেই স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায় নতুন করে কৃষিকেই জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেন।

তুলাতলী গ্রামের সৌরভ কুমার বিশ্বাসের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ২০২৩ সালে তার বাবা স্বপন কুমার বিশ্বাসের পরামর্শে বড় পরিসরে ড্রাগন চাষ শুরু করেন। বর্তমানে দুই বিঘা জমিজুড়ে গড়ে তুলেছেন আধুনিক ড্রাগন বাগান। 

সেখানে রয়েছে ইলোরা, পালোরা, রেড ভেলভেট, বোল্ডার ও থাই রেডসহ বিভিন্ন জাতের প্রায় দুই হাজার গাছ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাত নামলেই সৌরভের ড্রাগন বাগানে জ্বলে ওঠে অসংখ্য কৃত্রিম আলো। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন কোনো আলোকিত স্বপ্নরাজ্য। বিশেষ এই লাইটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করায় বছরের ১২ মাসই ফল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। আলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গাছের ফুল ও ফল ধারণের সময় বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। ফলে মৌসুমের বাইরে গিয়েও বাজারে ড্রাগনের চাহিদা কাজে লাগিয়ে বাড়তি লাভ পাচ্ছেন।

ড্রাগন চারা রোপণের ১২ থেকে ১৫ মাষের মধ্যে ফল দেয়া শুরু করে। একটানা ২০-২৫ বছর পর্যন্ত ফল দেয়। দো- আশঁ বা বেলে-দো-আশঁ মাটি ড্রাগন চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী ।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)কে সৌরভ কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘শুরুতে এটা শুধুই শখ ছিল। পরে বুঝতে পারি ড্রাগন চাষে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। এখন আমার বাগানে প্রায় ২ হাজার গাছ আছে। বছরে প্রায় ২০ লাখ টাকার ড্রাগন বিক্রি করছি বর্তমানে।’

তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ করলে যে কোনো কৃষিতেই সফল হওয়া সম্ভব। আমি চাই তরুণরা বেকার না থেকে কৃষিতে এগিয়ে আসুক।’
যারা ড্রাগন চাষাবাদে আগ্রহী তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, দো-আশঁ বা বেলে-দো-আশঁ মাটি ড্রাগন চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী । পর্যাপ্ত রোদ, পানি নিষ্কাশন এবং পরিচর্যা ব্যবস্থাই এর অধিক ফলন হয়। চারা রোপণের ১২ থেকে ১৫ মাসের মধ্যে ফল দেয়া শুরু করে। একটানা ২০-২৫ বছর পর্যন্ত ফল দেয়।

সৌরভের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করছেন তার বাগানে। কেউ আসছেন ঘুরতে, কেউ আবার নতুন কিছু শেখার আগ্রহ নিয়ে। বিশেষ করে রাতের আলোকসজ্জা ও রঙিন ড্রাগনের সমাহার দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করছে।

বাউফল থেকে বাগান দেখতে আসা আলম বিশ্বাস বাসস’কে বলেন, এত বড় ও সুশৃঙ্খল ড্রাগন বাগান আগে কখনও দেখিনি। রাতে এখানে এসে মনে হয়েছে যেন স্বপ্নের কোনো বাগানে চলে এসেছি। বিভিন্ন রঙের ফল ও সুন্দর ফুল দেখে আমি মুগ্ধ। সৌরভের বাগান দেখে আমিও অনুপ্রাণিত হয়েছি।’

কলাপাড়া থেকে আসা দর্শনার্থী আবদুল্লাহ আল ইমরান বাসস’কে বলেন, ‘এ ধরনের আধুনিক বাগান এখন সময়ের দাবি। পরিকল্পিতভাবে চাষ করতে পারলে কৃষিতে অনেক লাভ করা সম্ভব। সৌরভ প্রমাণ করেছেন শিক্ষিত তরুণরা চাইলে কৃষিতেও সফল হতে পারে।’

বালিয়াতলী ইউনিয়নের আবদুল খালেক বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এটিই সবচেয়ে বড় ড্রাগন বাগান। এখানে এসে জানতে পারলাম, তিনি সারা বছর ফল উৎপাদন করেন। আমিও ছোট পরিসরে হলেও এমন একটি বাগান করার পরিকল্পনা করছি।’

সৌরভের সফলতায় আশাবাদী স্থানীয় কৃষি বিভাগও। পটুয়াখালী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. আমানুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, ‘সৌরভকে শুরু থেকেই কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। তার বাগানটি একটি আধুনিক ও অনুসরণযোগ্য মডেল। বর্তমানে জেলায় মোট ২৩ হেক্টর জমিতে ড্রাগন চাষ হচ্ছে। এ চাষ সম্প্রসারণে কৃষকদের প্রশিক্ষণসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ড্রাগন একটি উচ্চমূল্যের ফল। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে চাষ করলে এটি কৃষকদের জন্য লাভজনক হতে পারে। সৌরভের মতো তরুণ উদ্যোক্তারা কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছেন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *