Tuesday, February 27
Shadow

ভয়াল : ধ্রুব নীলের হরর গল্প

হেমন্তের শুরুতে শীত শীত লাগা এক সন্ধ্যায় কিশোরী বিনু বুঝতে পারল তার ভয়ডর কম। নেই বললেই চলে। লাতু মুনসির মতো পালোয়ানও নির্ঘাৎ অজ্ঞান হয়ে যেত। বিনু ভয় তো পেলই না, উল্টো জিনিসটাকে হাতে নিয়ে বাড়িতে এলো। এসেই বিড় বিড় করতে থাকল, এখন এটারে লুকাই কই, রক্ত পামু কই, কী আপদ নিয়া আইলাম!

শাহ দৌলতপুর গ্রামের পশ্চিম সীমানায় পুরানা ভাঙা জমিদার বাড়ি। শিয়াল আর সাপখোপের আনাগোনা থাকায় ওই বাড়ির ত্রিসীমানা সুরক্ষিত। তবে ডোবা ঘেঁষে থাকা পশ্চিমের ভাঙাচোরা দেয়াল আর দুটো সুপারি গাছের মাঝ দিয়ে চার নম্বর সীমানাটা আবিষ্কার করে ফেলল কানাই তরফদারের মেয়ে বিনু। হেমন্তের ওই বিকালে বাড়িটার উঠানে থাকা ডেউয়া খাবে ঠিক করল। পা টিপে পা টিপে ঢুকে পড়ল বুনোলতায় ঠাঁসা ঘরটার অন্দরমহলে। উৎকট গন্ধে নাক চেপে ধরলেও কান খোলা। শুনতে পেল ঘরের ভেতর থেকেই কেউ একজন ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, ‘কে গো! এককু রক্ক দিবানি? কে গো!’

শব্দের উৎস বুঝে নিয়ে ভেতরের আরেকটা কক্ষে ঢুকল বিনু। সরসর শব্দ করে কী যেন সরে গেল। বিনু চমকে উঠলেও ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠটার আকর্ষণ এড়াতে পারল না। ঝুলন্ত লতাপাতা মোড়ানো পোড়া ইটের দেয়াল ঘেঁষে ইটের বেদি। তাতে মাটির বেশ পুরনো একটা মটকা। ওটার মুখে ঢেঁকি শাকের মতো উঁকি দিচ্ছে ফার্ন আর লতাগুল্ম।

‘ভিতরে হাপখোপ আছেনি?’

সাপ কি কথা বলবে? বিনু নিজেকে বোকা ভাবল এবং বুদ্ধিমান প্রমাণ করতে উবু হয়ে উঁকি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করল মটকার ভেতর থেকে কীসে কথা বলল। এরপরই তার মনে হল পালোয়ান লাতু মুনসিও জ্ঞান হারাত দৃশ্যটা দেখল।

একটা মানুষের মাথা। ব্যস, এটুকুই। ফ্যালফ্যাল করে চাইল বিনুর দিকে। সম্ভবত বিষণ্ন ওই চোখজোড়ার আকুতির কারণেই বিনু ভয় পেল না।

‘এককুনা রক্ত দিবি?’

‘কীয়ের রক্ত?’

গলার নিচে যেখানে কাঁধের শুরু, তার সামান্য উপরে মিহি করে কাটা। গোড়ার দিকে লাল ছোপ দাগ। শুকিয়ে আসা রক্তের মতো। এরপর শরীর বলে কিছু নেই।

‘অইলেই অইল। একটা রক্ত অইলেই চলে।’

‘ইন্দুর বিলাইয়ের রক্ত খাইবেন?’

‘দে। তাড়াতাড়ি দে। মাথার ভিতরে রক্ত লাগে। একটু দে।’

আশার আলো দেখতে পেয়ে তরতরিয়ে কথাগুলো বলল কাটা মাথাটা। বিনুর মনে হলো দেরি করা ঠিক হচ্ছে না। ঘন কালো চুল মধ্যবয়সী কাটা মুণ্ডুটার। দুই পাশে ধরে মটকা থেকে আলতো করে বের করে আনল বিনু। এরপর মাথাটা ওড়না দিয়ে কোনোমতে ঢেকেঢুকে হাঁটা দিল বাড়ির দিকে।

মাটির বাড়িটার সিলিংয়ে লাগোয়া একটা মাচার মতো আছে। বিনুরা ওটাকে বলে বাড়ির টং। পুরনো আর বাতিল জিনিসপত্রে ঠাসা ওই টঙের একপাশ পরিষ্কার করল। তাতে একটা গামছা বিছিয়ে তাতে রাখল মাথাটা। চোখ বুঁজে আছে ওটা। কথা বলার শক্তি নেই বোধহয়। মাথাটা কি মরে গেছে? বিনু ছুটে গেল পেছনের আঙিনায় থাকা খোয়াড়ে। চট করে ধরে ফেলল ঝুঁটিওয়ালা মোরগটার গলা।

দিন দশেক পর। কাটা মাথার সঙ্গে দিনের বেলায় কথা কম হয়েছে বিনুর। বেশিরভাগ সময়ই দেখেছে চোখ বন্ধ। ওই সময় মাথাটা ঘুমিয়ে থাকে নাকি মরে যায় বোঝার উপার নেই।

যেটুকু কথা হয়েছে বিনু জানতে পেরেছে, অনেক বছর আগে লোকটাকে কেউ জবাই করে দিয়েছিল। বাকি শরীর কোথায় জানে না কাটা মাথাটা। প্রথমে নিজেকে আবিষ্কার করেছিল রক্তাক্ত অনেকগুলো দেহের সঙ্গে। একটা বদ্ধ কূপে। তারপর কেউ তাকে খুঁজে পায়। ছুড়ে ফেলে দেয় সেও। মাঝে এক তান্ত্রিকের কাছে ছিল কিছুদিন।

মাঝে বহু বছরের স্মৃতি নেই কাটা মুণ্ডুটার। পরে কেউ একজন হয়তো খুঁজে পেয়ে মাথাটাকে ওই মটকায় ফেলে যায়। কিছুদিন তার জ্ঞান ছিল মটকার ভেতরে মাংসের লোভে আসা ইঁদুর আর সাপের গুণে।

বিনু শুধু অবাক হয় এই ভেবে যে লোকটা তার গলা দিয়ে রক্ত শুষে নেয়। মুখ দিয়ে কিছুই খায় না।

‘আইজকা বাইরে যাইবেন?’

‘যাব।’

কিছুক্ষণ থাকার পর মাথাটা বলল, ‘শীত করে। ভিতরে নিয়া চল।’

মা-বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে বিনু আবার ওটাকে রেখে দিল টঙের ওপর রক্তভেজা এক টুকরো কাপড়ে। এতেই যেন দম পায় মাথাটা। তারপর চোখ বন্ধ করে দেয় ঘুম।

পরদিন রাতে বাবার সঙ্গে মাছবাজারে গিয়ে চুপচাপ মাছ কাটা দেখে বিনু। হাতে গামছা। মাছ যেখানে কাটে, সেটার সামনে তাজা রক্তসহ বয়ে চলা নর্দমায় আলগোছে গামছাটা ভিজিয়ে নেয়। বাড়িতে ফিরেই ছুটে যায় টঙের কাছে। মোড়া টেনে দাঁড়িয়ে মোটা একটা বাঁশ ধরে ওঠে উপরের ফাঁকা জায়গাটায়।

‘সরেন, গামছা বদলাইয়া দেই।’

বরফগলা পানি ও রক্ত মিশ্রিত তরলে গামছাটা ভিজে চুপচুপে হলে দুদিন অনায়াসে কেটে যায় মুণ্ডুটার। চুপচাপ বসে থাকে তখন।

মাথাটা নিজে থেকে সামান্যই নড়তে পারে। বিনু ধরে সরিয়ে দিল এক পাশে।

‘কাটা মাতারে নিয়া পড়লাম বিপদে। এত রক্ত পাই কই।’

হাসির মতো শব্দ করলো মাথাটা। মূলত হাসতে গিয়ে বাতাস বেরুনোর মতো ফ্যাসফ্যাসে একটা শব্দই হলো শুধু।

‘হাসেন ক্যান?’

‘আইজকা কী মাছ? কাতলা মাছের রক্ত মনে হইতেসে।’

‘আমি তো মাছ চিনি না।’

‘ওই দিন কীসের রক্ত ছিল?’

‘ইন্দুরের রক্ত।’

‘তুমি ইন্দুর মারসো কেমনে? তোমার দেখি অনেক সাহস।’

‘ইন্দুর মারা সোজা। আমি ইন্দুরের গর্ত চিনি। আমার ডর করে না।’

‘আমারে কতদিন লুকাইয়া রাখবা রাজকইন্যা?’

‘হি হি।’

‘এইবার কও, তুমি হাসো কেন?’

‘আম তো রাজকইন্যা না।’

‘আমি হইলাম রাজা বিক্রমাদিত্য। আমার সাম্রাজ্য তোমারে দিয়া দিলাম। আইজ থেইকা তুমি রাজকইন্যা।’

‘আপনি কচুর রাজা। আমি আপনারে পালি। আপনে পালা মাথা। পালা শেষ হইলে মটকায় রাইখা আসব।’

‘ঠিক। আমি তো মানুষ না। গলার নিচে কিছু নাই।’

এরপর কাটা মাথা আর কথা বলল না। আধবোঁজা চোখে বিনুকে দেখল অপলক।

ক্ষণিক তাকিয়ে বিনু ধরতে পারল কাটা মাথাটা নাক দিয়ে শ্বাসও নেয় না। ব্যাপারটা জানার পর তারও দম বন্ধ লাগল। নেমে এল টঙের ওপর থেকে। হাঁটা দিল পাশের বাড়ির তুসির কাছে। এতদিন গোপন রাখলেও আজ ঠিক করেছে কাটা মাথার গল্পটা তুসিকে বলবে।

কানাই তরফদারের সামনের ঘরে রাখা চেয়ারে অস্বস্তি নিয়ে বসে আছেন ময়নামতি ইউনিয়নের মেম্বার আবুল বাশার। আশপাশের গ্রামগুলোতে একটা নতুন পাখি দেখা গেলেও তার ডাক পড়ে। তিনি হাসিমুখেই আসেন। তবে আজকের ঘটনা তাকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে।

কানাই তরফদারের সঙ্গে তার বাড়ির পেছনে টঙের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন গ্রামের হাতেম ব্যাপারী। তিনি তুসির বাবা। রাত পর্যন্ত কাটা মাথার বিষয়টা গোপন রেখেছিল তুসি। সকালে উঠেই সব বলে দেয় বাবাকে। মোবাইল ফোনে সেটার খবর পেয়ে যায় বিশেষ কিছু লোকজন।

বিনুর মুখের দিকে তাকাতেই কাটা মাথার নির্বিকার চোখ দুটোয় ভয়ের একটা ছাপ পড়ে। বিনু সেটা বুঝতে পারে না।

‘খবর পাইয়া গেছে?’

‘জে। আপনারে দেখতে আসছে। চলেন।’

বিনু মাথাটা নিয়ে কসরত করে নামে নিচে। হাতে জড়ানো মাথাটার জাগ্রত চোখে চোখ পড়তেই বাইরে ছুটে গেলেন হাতেম ব্যাপারী। খোঁয়াড়ের পাশে পুরো পেট খালি করে বমি করলেন। তাকে ধরে এনে চেয়ারে বসালেন বিনুর বাবা।

‘এইটা কী! জ্যান্তা মাথা নাকি!’

বাশার মেম্বারের প্রশ্নে বিনু উপর-নিচ মাথা নাড়ল। হাতেম ব্যাপারী একবার ফোন বের করছেন, এরপর পকেটে ঢোকাচ্ছেন। বিষয়টা কাকে যেন না বলে থাকতে পারছেন না। এরপর তাকে ফোনে বলতে শোনা গেল, ‘মাথা! কাটা কল্লা চিনো! কল্লা কথা কইতেসে! কেয়ামতের আলামত বুঝলা!’

বাশার মেম্বারের পাশের চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছেন সুরুজ আলী। টাকার অভাব নাই তার। নিজেকে কৃষক পরিচয় দিলেও আদতে জমিদার। সুরুজ বললেন, ‘ইমাম সাহেবকে ডাক দিলে ভালো হয়। উনার নম্বর আছে কারও কাছে?’

‘আমি ডাইকা আনতেসি।’

কথাটা বলল অস্বস্তি নিয়ে বসে থাকা আরেকজন। সম্ভবত ইমামকে খবর দিয়ে নিজে আর এদিক মাড়াবে না। সে উঠে দাঁড়াতেই ফ্যাসফ্যাসে গলায় প্রতিবাদ জানাল কাটা মাথা, ‘ইমাম সাবরে ডাকবার যান ক্যান? আমার জানাজা পড়াইতে? আমি তো মরি নাই!’

চমকে উঠল উপস্থিত সভাসদ। বিনুর কোলে থাকা কাটা মাথার চাহনিতে একরাশ নির্লিপ্ততা, নাকি শূন্যতা? ‘মরি নাই’ বললেও ওটাকে জীবন্ত মেনে নিতে নারাজ সবাই।

একটা কঞ্চি তুলে নিলেন হাতেম ব্যাপারী। কাটা মুণ্ডুটায় আঘাত করবেন ঠিক করলেও শেষমুহূর্তে দমে গেলেন। মসজিদের ইমাম আসার আগ পর্যন্ত কিছু করা ঠিক হবে না বলে মনে হলো তার।

কাটা মাথাটার জায়গা হলো মেঝেতে। চা-নাস্তা দেওয়ার এক ফাঁকে টঙের ওপর গিয়ে আগের একটা ভেজা গামছা নিয়ে আসে বিনু। সবার চোখের সামনে গামছা বদলে দিলেও কেউ সেটা লক্ষ্য করল না।

ইমাম সাহেব ভেতরে ঢুকতেই থেমে গেল গুঞ্জন। এবার কাটা মাথা সমস্যার কিছু একটা সমাধান হবে ভেবে নড়েচড়ে বসল সবাই।

‘এটা কুদরতি ব্যাপার। এই বাবদ আমার এলেম নাই।’

অন্য শহর থেকে আসা দৌলতপুর জামে মসজিদের ইমাম কথাগুলো বললেন শান্ত স্বরে। তবে ইমামের এই বাবদ জ্ঞান না থাকার ফলে হাতেম ব্যাপারী সাহস ফিরে পেয়েছেন। সাশালেন কাটা মুণ্ডুটাকে, ‘হারামজাদা, তুই কে বল! খারাপ জিন? তোর মতো এমন বহুত মাতামুণ্ডু দেখসি। দুইটা লাত্থি দিলে সব ঠিক।’

বিনু মাথাটার কাছ ঘেঁষে বসল। মেয়ের সাহস দেখে কিছুটা খুশি তার মা ওরফে মন্নুজান। কাটা একটা মুণ্ডুকে যে তার মেয়ে এতদিন ধরে পালছে এটা বিরাট একটা ঘটনা।

‘আমি মানুষ। শইল ছাড়া মানুষ। আমি মরি নাই।’

‘জি না। আপনি বাঁইচা নাই। জ্যান্তা মানুষ দম নেয়। আপনার দম নাই।’

মাটির মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসে থাকা আফজল মিয়ার কথাটা শুনে সভাসদের সাহস আবার ঢাকা পড়ল ভয়ের চাদরে।

‘দম নিলেই মানুষ হয়? আমি মরি নাই। শুধু গলা কাইটা ফেলছিল। কে কাটছে কবে কাটছে মনে নাই। বহুত দিন আগে কাটছে।’

খেঁকিয়ে উঠে হাতেম ব্যাপারী বললেন, ‘তাইলে এতদিন বাঁইচা আছিস কেমনে? ফাইজলামি মারাস! শয়তানের বাইচ্চা!’

‘আমার দম নাই। আমি দম ছাড়া মানুষ।’

‘দম লাগে। দম ছাড়া কীসের জ্যাঁতা!’

‘এককু রক্ক দিবি গো মা!’

বিনুর দিকে চোখ দুটো ঘুরিয়ে বলল কাটা মাথা।

বিনুর মনে পড়ল কাটা মাথার নিচে থাকা গামছাটা ভেজা হলেও তাতে রক্ত থাকার কথা নয়। আছে শুধু পানি। রক্ত তো সব আগেই শুষে নিয়েছে মাথাটা।

রক্তের কথা শুনে মিইয়ে গেল হাতেম ব্যাপারীর সাহস। বাশার মেম্বারেরও মনে হলো এভাবে একটা কিছু শুনেই ঘর থেকে বের হওয়া ঠিক হয়নি। ইমাম সাহেব লম্বা করে শ্বাস নিয়ে সুরা পড়তে শুরু করলেন। কাটা মাথার দম বিষয়ক কথা শুনে তারও দম আটকে এসেছিল।

‘এইটারে কবর দেওয়া দরকার। আমার মনে হয় ঠিকমতো কবর দেওয়া হয় নাই। এ কারণে উইঠা আসছে।’

হাতেম ব্যাপারীর নিজের কানে অস্বাভাবিক লাগল না কথাগুলো। বাশার মেম্বারের অস্বস্তি বাড়তেই থাকল। ইমাম এবার শব্দ করে সুরা পড়তে শুরু করেছেন।

কবর দেওয়ার কথা শুনে মাথাটাকে মেঝে থেকে তুলে নিতে চাইল বিনু। তাকে আঁকশির মতো ধরে ফেললেন মন্নুজান।

‘আমারে কবর দিবেন ক্যান! কবর দিবেন ক্যান! ও মা! বিনু মা! আমারে এক্কুন রক্ত দেও।’

মায়ের দিকে প্রশ্ন নিয়ে তাকাল বিনু। মন্নুজান বুঝতে পারছেন এ কয়দিনে রক্তের লোভ পেয়ে বসেছে মাথাটার। ছোট্ট বিনুকে হাতে রেখেছে তাই। মেয়ের আরও শক্ত করে ধরলেন তিনি।

‘দিতাসি তোরে রক্ত!’

এই বলে হাতেম ব্যাপারী কঞ্চি দিয়ে বাড়ি দিলেন কাটা মাথাটায়। প্রত্যাশিত কোনো শব্দ বের হলো না ওটার মুখ দিয়ে। আগের মতোই রুগ্ন ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, ‘আমারে কবর দিয়েন না। আমার নাম বিশঙ্কর দাশ।’

মাঝপথে সুরা পড়া বন্ধ করে দিলেন ইমাম। তাৎক্ষণিক মনে হলো ঠিক হয়নি কাজটা। পরে আবার গোড়া থেকে শুরু করবেন ভেবে বাশার মেম্বারকে বললেন, ‘আমার এলম নাই এ ব্যাপারে। আপনারা যা করার করেন।’

বাশার মেম্বারের মনে পড়ল শীত পড়া শুরু হয়েছে। তিনি মাফলার আনেননি। দ্রুত চলে যাওয়া উচিত। সবার মগজের ভেতর হেমন্তের শিরশিরে বাতাসে ভেসে আসা কাটা মস্তকের কথাগুলো ক্রমে একটা দুঃস্বপ্নের মতো ঠেকলেও হাতেম ব্যাপারীর সাহস গাণিতিক হারে বেড়েছে। এবার গুঁতো দিয়ে মাথাটাকে কাত করে ফেলে দিলেন। কাটা মাথার চোখের দিকে তাকাতে হচ্ছে না বলে স্বস্তি পেল উপস্থিত সভাসদ।

‘ইমাম সাহেব। মাথাটারে কেরোসিন দিয়া জ্বালাইয়া দেই?’

হাতেম ব্যাপারীর প্রশ্নটা ইমামের কান পর্যন্তই, মাথায় গেল না। মাগরিবের ওয়াক্ত হয়ে যাওয়ায় তার এবার যেতেই হবে। বিষয়টা সম্ভবত থানা-পুলিশ সংক্রান্ত বলে যেতে উদ্যত হলেন বাশার মেম্বার। ‘হাতে টাইম নাই, কেরোসিন লয়া আসি’ বলে নিজের বাড়ির রান্নাঘরের দিকে ছুটলেন হাতেম ব্যাপারী।

কাটা মুণ্ডু তাকাল মন্নুজানের দিকে। বিনুর কাছে সে তার মায়ের কথাও শুনেছে অল্পবিস্তর।

‘আমি তো মরি নাই। ও বিনুর মা। আমারে বাঁচাও।’

রক্তের অভাবে ক্রমে নির্লিপ্ত চোখ দুটো স্থির হয়ে আসছে। নড়ছে না মুখ। মৃত ও প্রাচীন মুণ্ডুর মতো পড়ে রইল মেঝেতে।

‘মইরা গেল নাকি?’

‘মরাই তো ছিল।’

‘মরা কল্লা কতা কয় ক্যামনে? ও হুজুর, আপনে কিছু করবেন না?’

‘আমি কী করবো? আমি তো কুদরতি জানি না। সব কুদরত উনার হাতে। আমি গেলাম। মেম্বার সাহেব পরামর্শ দেবেন। আপনারাও চলেন। বাদ মাগরিব সিদ্ধান্ত নিয়েন।’

সময় রাত। বাদ মাগরিব কেউ আর আসেনি। কাটা মাথাটাকেও আর টঙে রেখে আসেনি বিনু। লুকোছাপার দরকার নেই বুঝে গেছে।

পেছনের ঘরে চৌকির নিচে গামছার ওপর রাখা মাথাটা। এর মাঝে একবার বাইরে গিয়ে গর্তের পাশে রাখা ইঁদুর মারার কলটা দেখতে যায় বিনু। ভেতরে দুটো ধেড়ে ইঁদুর দেখে হাসি ফোটে মুখে।

কানাই তরফদার বিষণ্ন মুখে বসে আছেন মাটির রোয়াকে। মন্নুজান এসে তার হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিতেই মনে হলো যাবতীয় সমস্যা আপাতত কুয়াশায় ঢাকা থাক।

‘বিনুরে পাইয়া বসছে। তোমার মাইয়াও কানতাসে। তার নাকি মনে হইসে মাথাটারে ওরা পুঁইতা ফেলবে। আমিও কই এই সব মাতামুতা ঘরে রাখন ঠিক অইত না।’

‘কী করব তাইলে? হেরায় তো কেউ আইল না।’

‘সব ওই মাতার শয়তানি। জাদুটোনা করা মাতা। খালি বিনুরে ডাকে।’

‘তুমি আবার কেরোসিন নিয়া আসো নাই তো?’

‘কেরোসিন কই পামু। আমি চটের বস্তা নিয়া আসছি। নতুন বস্তা। বিশ টেকা দাম। যা ঘটার আইজ রাইতেই ঘটাব।’

বিনুর বাবা কিছু বললেন না। চায়ের কাপ রেখে বিড়ি ধরিয়ে হাঁটা ধরলেন হাতেম ব্যাপারীর বাড়ির পথ ধরে। আসল কথা হলো তিনি নিজেও পালিয়ে বেড়াতে চাইলেন এই অস্বস্তিকর ঘটনার হাত থেকে।

সারাদিনের ধকল আর নিতে পারেনি বিনু। ঘুমিয়ে পড়েছে না খেয়েই। আজ তাকে খাওয়ার জন্য জাগাবেন না ঠিক করলেন মন্নুজান। রাত দশটা পার হতেই তোশকের তলা থেকে বের করলেন চটের বস্তাটা।

‘আমারে কই নিয়া যাও? এইটা কী? শক্ত এইটা কী। রক্ক নাই তো। ও বিনু, বিনুরে।’

বস্তার ভেতর থেকে কাটা মাথার কথাগুলো আবছা কানে এলো মন্নুজানের। তবে কাটা মুণ্ডুর কথার জবাব দেবেন না ঠিক করেছেন। নিজেকে বোঝালেন, বড় ভুল হচ্ছে কোথাও। ভুল ঠিক করার দায়িত্ব নিয়ে হেঁটে চলেছেন বড় দিঘিটার দিকে।

‘ও বিনু আম্মা। কই নিয়া যাস আমারে। তোরে না আমার রাজত্ব দিলাম।’

মন্নুজানের বুকে আতঙ্ক চেপে বসল পাথরের মতো। কয়েকবার নিজেকে জিজ্ঞাসা করলেন, বিনুর সঙ্গে এই মাথার কীসের সম্পর্ক। বুকের মধ্যে যেন পাথর। পাথর! বস্তার ভেতর ভারী পাথর দিতে পারলে হতো। দুই চারটা ইটে কাজ হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ কাটছে না তার।

‘আমারে বাড়িত নিয়া যা।’

আকাশে থালার মতো চাঁদ। মন্নুজানের মনে হলো কাটা মুণ্ডুটা আসলেই মরা। কেউ তার কথা শোনেনি। সবাই ভুল শুনেছে। বিশ্বাস করেই ধরা খেয়েছে সবাই। বস্তার মুখ ফাঁক করে দেখলেন। ওই তো দেখা যায়। একদম ফ্যাকাসে। সব মাথা তো আর পচে গলে যায় না।

‘আমিও তো কই। কবেই মইরা ভূত! মরা কল্লার মুখে আবার বড় বড় কথা!’

এবার শুধু ঠোঁট নড়ল কাটা মাথার। বাতাস বের হলো না। শব্দও শোনা গেল। মন্নুজান ফের উঁকি দিলেন। ঠোঁট নেড়ে মাথাটা বিনুকেই ডাকছে বোধহয়। শঙ্কায় ফের দুলে উঠল মন্নুজানের বুক। মেয়েকে অমঙ্গলের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। পা চালালেন দ্রুত।

‘ওই দেখা যায় দিঘির পাড়। বস্তার ভেতর মাথাটা নড়ে নাকি? নাহ, মরা কল্লা নড়ে না। চোখের ভুল! চোখের ভুল!’

দিঘির পাড় থেকে শ্যাওলায় মাখামাখি হয়ে থাকা আরও দুখান ইট তুলে বস্তায় ভরলেন মন্নুজান। শক্ত করে গেরো দিলেন। কাটা মুণ্ডু দম নেয় না। পানিতে ডুবলে সেটার সমাপ্তি নাও ঘটতে পারে এমনটা ধরে নিয়েছিলেন মন্নুজান। তাই আঁচলে গোঁজা বস্তুটা বের করলেন। বিশ টাকায় বস্তার পাশাপাশি দুইশ টাকা দিয়ে চকচকে ছুরিটাও কিনেছিলেন।

নিরব নিথর দিঘির পাড়। কোনো এক প্রাগৈতিহাসিক ফলের মতো আলগোছে মাথাটা বের করে আনলেন মন্নুজান। চোখ মেলে আছে ওটা। নড়তে থাকা ফ্যাকাসে শুকনো ঠোঁটে ফিসফিস করে বলা দুই অক্ষরের শব্দটা তীরের মতো বিঁধছে মন্নুজানের কানে।  ছুরিটা দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরলেন। তার শুধু মনে হচ্ছে হাতে সময় নেই, একদমই নেই।

(গল্পকারকে এক কাপ কফি খাওয়াতে চাইলে 01976324725 নম্বরে ২০ টাকা বিকাশ পাঠাতে পারেন)

আমাদের কাছে গল্প পাঠানোর ঠিকানা : matinewsbd@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Please disable your adblocker or whitelist this site!

error: Content is protected !!