ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যাবে, যেখানেই ছিল স্বাদু পানি, সেখানেই গড়ে উঠেছিল সভ্যতা। নদী, খাল আর ঝরনাই ছিল প্রাচীন সভ্যতার ভিত্তি। কিন্তু শুধু পানির অস্তিত্ব থাকাই যথেষ্ট ছিল না। পানিটাকে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার প্রযুক্তিও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের এক পর্যায়ে মানুষ বুঝতে শুরু করল, নদী বা খাল থেকে উঁচু জমিতে পানি তুলতে পারলেই কৃষিতে ঘটে যাবে দারুণ কিছু। আর এই প্রয়োজন থেকেই প্রাচীন চীনে জন্ম নেয় এক অসাধারণ প্রযুক্তি—চেইন পাম্প। সহজ অথচ কার্যকর এই প্রযুক্তি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চীনসহ সারা বিশ্বের কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় দিয়েছে নতুন মাত্রা। মানবসভ্যতার জলব্যবস্থাপনার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে চীনের আবিষ্কার চেইন পাম্প।
মানবসভ্যতার অন্যতম আবিষ্কার হিসেবে আমরা প্রায়ই বাইসাইকেলের কথা শুনি। এই যানটি যেমন অল্প শক্তি প্রয়োগে আমাদের অনেকটা পথ এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে, ঠিক সেভাবেই কৃষিতে অল্প পরিশ্রমে বেশি সেচের সুবিধা দিয়েছে চেইন পাম্প।
চেইন পাম্প মূলত একটি পানি তোলার যান্ত্রিক কাঠামো। এতে একটি লম্বা চেইনের সঙ্গে ছোট ছোট কাপ বা পাত্র যুক্ত থাকে। চেইনটি ঘুরতে থাকে একটি লম্বা উপবৃত্তাকার চাকার মতো কাঠামোয় ভর করে।
ওই চাকাটি ঘোরানো হয় মানুষ কিংবা গৃহপালিত পশুর শক্তিতে। আবার পানির স্রোতের শক্তিতেও ঘুরতে পারে এর চাকা। চাকার সঙ্গে যুক্ত থাকে চেইন। আর চেইনের সঙ্গে লেগে থাকে কাপ বা চারকোণা পাত্র। সেগুলো চেইনের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে পানিতে ডুবে পানি তুলে ওপরে নিয়ে আসে এবং নির্দিষ্ট জায়গায় এসে কাত হতেই পড়ে যায় সেই পানি।
প্রক্রিয়াটি দেখতে সহজ মনে হলেও এর কার্যকারিতা অসাধারণ। কারণ এটি বিরতিহীন পানি তুলতে পারে এবং অনেক উঁচু জমিতেও পানি পৌঁছে দিতে পারে। তাছাড়া, হাতে করে পানি বয়ে নিয়ে যেতে একজন ব্যক্তির যে শক্তি প্রয়োগ করতে হয়, চেইন পাম্প ব্যবহার করে সেই একই শক্তিতে তোলা যায় বহুগুণ পানি।
চেইন পাম্পের ইতিহাস অন্তত দুই হাজার বছরের পুরনো। খ্রিস্টপূর্ব ২০৬ – খ্রিস্টাব্দ ২২০ সালে হান রাজবংশের সময় এই প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়। সেই সময় চীনে কৃষি উৎপাদন দ্রুত বাড়ছিল এবং একটি বৃহৎ জনসংখ্যাকে খাদ্য সরবরাহ করতে দরকার ছিল উন্নত সেচব্যবস্থার। ২৭ থেকে ৯৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে হান রাজবংশের সময়কার চীনা পণ্ডিত ওয়াং ছোংয়ের লেখা নথিতে পাওয়া যায় এই পাম্পের বর্ণনা।
ওই সময়কার চীনা প্রকৌশলীরা বুঝতে পারলেন, নদী বা খাল থেকে উঁচু জমিতে পানি তুলতে একটি নির্ভরযোগ্য যন্ত্র দরকার। এই ভাবনা থেকেই তৈরি হয় চেইন পাম্পের উন্নত সংস্করণ।
চীনের বহু প্রাচীন গ্রন্থে এই প্রযুক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। এমনকি প্রাচীন কৃষি নির্দেশিকা ও প্রযুক্তিগত পাণ্ডুলিপিতেও চেইন পাম্পের নকশা ও ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
চীনের দশম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সোং রাজবংশের সময় কৃষি সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে পানি তোলার প্রযুক্তিতেও বড় উন্নতি ঘটে। তখন আবিষ্কৃত হয় আরও জটিল নকশার বর্গাকার পাত্রের চেইন পাম্প। সোং যুগের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির অনেক আগেই এটি আবিষ্কৃত হলেও প্রথম দিকে কৃষিকাজে খুব বেশি ব্যবহার হতো না। তবে প্রথম সহস্রাব্দের শেষের দিকে এর ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকে।
ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে চীনারা বায়ুচালিত চাকা বা উইন্ডমিল ব্যবহার করে এসব চেইন পাম্প চালাত। পরবর্তীতে সোং রাজবংশের বিজ্ঞানী সোং ইয়িংসিং তার বিখ্যাত গ্রন্থ থিয়ানকং খাইউ’তে পানিচালিত সিলিন্ডার চেইন পাম্পের বর্ণনা দিয়েছিলেন, যা নদী থেকে উঁচু কৃষিজমিতে পানি তুলতে ব্যবহৃত হতো।
চীনে চেইন পাম্পের একটি জনপ্রিয় সংস্করণ ছিল ‘ড্রাগনের মেরুদণ্ড পাম্প’। এটি ছিল মূলত কাঠের তৈরি একটি ঢালু কাঠামো, যার ভেতর দিয়ে চেইনের সঙ্গে যুক্ত কাঠের প্লেট বা কাপ উপরে উঠত। কৃষকরা পায়ের সাহায্যে একটি প্যাডেল ঘুরিয়ে এই পাম্প চালাতেন। দূর থেকে দেখতে অতিকায় লম্বাটে প্রাণীর শিরদাঁড়ার মতো দেখায় বলেই ওটার নামটা হয়েছিল ড্রাগনের মেরুদণ্ড।
এই পদ্ধতির সুবিধা ছিল, এটি সহজে তৈরি করা যেত, পরিচালনা করা সহজ ছিল এবং এক বা দুই জন মানুষই এটি চালাতে পারত। ফলে দ্রুত চীনের গ্রামাঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে পাম্পটি।
প্রাচীনকালে কৃষিকাজ অনেকটাই নির্ভর করত বৃষ্টির উপর। কিন্তু চেইন পাম্পের মাধ্যমে কৃষকরা নদী, খাল বা পুকুর থেকে পানি তুলে উঁচু জমিতে সেচ দিতে পারতেন। এতে করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। প্রথমত, উঁচু জমিতেও শুরু হয় চাষ-বাস। আগে যেখানে পানি পৌঁছানো কঠিন ছিল, সেখানেও গড়ে ওঠে কৃষি খামার। দ্বিতীয়ত, এর ফলে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনের বিষয়টিও চালু হয় এবং পরিশেষে বেড়ে যায় খাদ্য উৎপাদন, যা পরবর্তীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। ইতিহাসবিদরাও স্বীকার করেছেন যে, চীনের কৃষি অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এই চেইন পাম্প।
চেইন পাম্প শুধু গ্রামীণ কৃষিতে নয়, শহরেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। প্রাচীন চীনের শহরগুলোতে পানি সরবরাহ, খাল পরিষ্কার রাখা, এমনকি খনির পানি নিষ্কাশনেও চেইন পাম্প ব্যবহার করা হতো।
বিশেষ করে বড় বড় সেচখাল ও জলপথ রক্ষণাবেক্ষণে এই প্রযুক্তি ছিল অত্যন্ত কার্যকর।
সময়ের সঙ্গে চেইন পাম্পের নকশাতেও উন্নতি ঘটে। প্রথমদিকে এটি পুরোপুরি মানুষের শক্তিতে চালিত হতো। পরে যুক্ত হয় পশুর শক্তি ব্যবহার, জলচক্রের মাধ্যমে চালানো এবং তৈরি হয় আরও বড় কাঠামো।
চীনের আবিষ্কার চেইন পাম্প শুধু চীনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধীরে ধীরে এই প্রযুক্তি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের মাধ্যমে এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। ভিয়েতনাম, কোরিয়া এবং জাপানে কৃষিক্ষেত্রে চেইন পাম্প ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। সিল্ক রোডের মাধ্যমে চীনের প্রযুক্তি পৌঁছে যায় মধ্যপ্রাচ্যেও।
চীনের এই প্রযুক্তির ধারণা ইউরোপে পৌঁছায় মধ্যযুগের দিকে। ইউরোপীয় প্রকৌশলীরা চীনের নকশাটিকে অনুকরণ করে শিল্পকারখানা ও খনি থেকে পানি উত্তোলনে ব্যবহার করতে শুরু করেন চেইন পাম্প।
চেইন পাম্প তৈরিতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা বা দামী উপকরণের দরকার হতো না। কাঠ, দড়ি, চেইন এবং কয়েকটি সহজ যান্ত্রিক অংশ দিয়েই এটি তৈরি করা সম্ভব ছিল। এর কোনোটি হাতের শক্তিতে চলে, আবার কোনোটি চালানো যায় সাইকেলের মতো প্যাডেল দাবিয়ে। এতে একসঙ্গে দুটো কাজও হয়। সেচের পাশাপাশি এই চেইন পাম্প কৃষকের স্বাস্থ্যও ঠিক রাখে।
আজকের যুগে বৈদ্যুতিক পাম্প ও আধুনিক সেচ প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবুও চেইন পাম্প দেখা যায় প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয়।
সভ্যতার ইতিহাসে অনেক বড় বড় আবিষ্কার রয়েছে—কাগজ, কম্পাস, গানপাউডার বা মুদ্রণযন্ত্রের মতো। কিন্তু কখনও কখনও একটি সরল প্রযুক্তিও মানুষের জীবনকে যে গভীরভাবে বদলে দিতে পারে, চীনের আবিষ্কার চেইন পাম্প তারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
সূত্র: সিএমজি