দক্ষিণ-পশ্চিম চীনে বুনো হাতি সংরক্ষণ ও সহাবস্থান নিশ্চিতে নজরদারি জোরদার

চীনের ইয়ুননান প্রদেশের গহীন অরণ্যে বুনো এশীয় হাতি সংরক্ষণে জোরদার করা হয়েছে নজরদারি কার্যক্রম। বিশেষ মনিটরিং দল ও বন বিভাগের কর্মীরা ড্রোনের মাধ্যমে নজরে রাখছেন হাতির চলাচলে, যাতে মানুষ ও হাতির মধ্যে এড়ানো যায় সংঘাত। শীতকালে খাদ্যের অভাবে হাতিরা গ্রামে ঢুকলে আগেভাগেই গ্রামবাসীদের সতর্ক করা হচ্ছে। পাশাপাশি, হাতির ক্ষতিতে সরকারি বিমার আওতায় দেওয়া হচ্ছে ক্ষতিপূরণ। চীন সরকারের এসব উদ্যোগে দিন দিন আরও দৃঢ় হচ্ছে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।

ইয়ুননানের চিয়াংছেং কাউন্টিতে বছরে গড়ে ৫০টিরও বেশি বুনো এশীয় হাতির আনাগোনা রয়েছে। শীতের সময় বনে খাদ্যের উৎস কমে গেলে এই হাতিরা খাবারের খোঁজে গ্রামে ঢুকে পড়ে।

সম্প্রতি হাতি পর্যবেক্ষকরা স্থানীয় বন অগ্নিনির্বাপক দলের সঙ্গে সমন্বয় করে নজরদারি ও সতর্কবার্তা জোরদার করেছেন। গেল চীনা নববর্ষেও মানুষ ও যানবাহনের চলাচল বেড়ে যাওয়ায় হাতির আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা হয়ে ওঠে আরও গুরুত্বপূর্ণ।

চিয়াংছেং কাউন্টির হাতি পর্যবেক্ষণ দলের দলনেতা তিয়াও ফাসিং জানালেন, ‘এক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় এশীয় হাতির জনসংখ্যা পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব রয়েছে। প্রতিদিন কয়েক ডজন হাতির গতিবিধি রিয়েল-টাইমে ট্র্যাক করতে হয় তাদের।’

একদিন একটি হাতির পাল দেখতে পেয়ে তিয়াও দ্রুত আশপাশের গ্রামবাসীদের দূরে থাকার সতর্কবার্তা দেন। সতর্কবার্তার পর অগ্নিনির্বাপক কর্মকর্তা ড্রোন উড়িয়ে একটি ভুট্টাক্ষেতে খাদ্য গ্রহণরত হাতিগুলো শনাক্ত করেন।

তিয়াও ফাসিং আরও বলেন, ‘ওরা সাধারণত ওই সময় বের হয় না। দলটিতে অনেক হাতি শাবকও দেখা গিয়েছিল। যার মধ্যে সবচেয়ে ছোটটির বয়স ছিল আনুমানিক দুই মাস।’

তাৎক্ষণিক সতর্কতার পাশাপাশি বীমা কোম্পানির পক্ষ থেকে হাতির কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতিও মূল্যায়ন করেন তিয়াও।

তিনি জানান, ২০১০ সালে ইউনান প্রদেশ বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত ঘটনার জন্য সরকারি অর্থায়নে একটি জনদায়বদ্ধতা বীমা ব্যবস্থা চালু করে। হাতি-সংক্রান্ত কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলে বীমা কোম্পানি বাড়িঘর, খাদ্যশস্য ও অর্থকরী ফসলের ক্ষতিপূরণ দেয়।

খাংপিং টাউনের বাসিন্দা লি চিয়াংমেই জানালেন, ‘বর্তমান বাজারদরে ক্ষতিপূরণ বেশ সন্তোষজনক। হাতিরাও সানন্দে খেয়ে চলে যায়। যেন আমরা তাদেরই লালন করছি। আমাদের ফসল নষ্ট হলে বীমা কোম্পানি ক্ষতিপূরণ দেয়।’

হাতি পর্যবেক্ষণের কাজ করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি মাঠপর্যায়ে উপস্থিত থাকতে হয়। মুখোমুখি হতে হয় নানা ঝুঁকির।

তিয়াও ফাসিংয়ের মতে, ‘শুরুর দিকে যখন ড্রোন ছিল না, তখন প্রতিদিন পদচিহ্ন অনুসরণ করে হাতির পেছনে হাঁটতে হতো। সেটা ছিল আরও বিপজ্জনক। পরিবার আমাকে চাকরি ছাড়তে বলেছিল। কিন্তু আমি ভাবলাম, সতর্কবার্তা না দিলে মানুষ নিরাপদে মাঠে কাজ করতে পারবে না। সেই চিন্তা থেকেই কাজ চালিয়ে গেছি।’

২০২২ সালে ইয়ুননান প্রদেশ প্রশাসন স্টেট কাউন্সিলে আবেদন করে এশীয় হাতি জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয়। সিশুসুয়াংবান্না, পুয়ার ও লিনছাং অঞ্চলের ছয়টি কাউন্টি বা জেলাজুড়ে প্রস্তাবিত উদ্যানের আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ৩৮ হাজার ৬০০ হেক্টরে।

জাতীয় পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উদ্যান প্রস্তুতির কাজ এগিয়ে চলছে।

ইয়ুননানের বন প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানালেন, জাতীয় উদ্যান প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বেসলাইন গবেষণা, বিশেষায়িত সম্পদ জরিপ, আবাসস্থল পুনরুদ্ধার, পরিবেশগত সংস্কার কাজ এগিয়ে চলেছে।  তিয়াও বলেন, এশীয় হাতি জাতীয় উদ্যান গড়ে উঠলে হাতিরা একটি নিরাপদ আবাস পাবে।

তার মতো আরও অনেকের আশা—স্থানীয়রা যেন শান্তিতে থাকতে পারে এবং হাতিরাও যেন একটি ভালো আবাসস্থল পায়।

সূত্র: সিএমজি

chinaelephantnatureyunnan