শত শত বছরের পুরোনো একটি বিশাল গ্রন্থ—যা একসময় ছিল শুধু পণ্ডিতদের জগতের সম্পদ। আজ প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই ইতিহাসের পাতাগুলোই হয়ে উঠেছে সবার জন্য উন্মুক্ত, জীবন্ত ও আকর্ষণীয়। চীনের লানচৌয়ের এই অনন্য প্রদর্শনী প্রমাণ করছে, ইতিহাস শুধু সংরক্ষণ করার বিষয় নয়; নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ারও বিষয়।
উত্তর-পশ্চিম চীনের কানসু প্রদেশের রাজধানী লানচৌয়ের একটি শিল্পকলা প্রদর্শনী শতাব্দীপ্রাচীন চীনা বিশ্বকোষ ‘সিখু ছুয়ানশু’কে পণ্ডিতদের গণ্ডি থেকে বের করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। দুর্বোধ্য ধ্রুপদী চীনা ভাষার বিশাল এই সংকলন থেকে প্রদর্শনীতে তুলে ধরা হয়েছে ১২২টি আকর্ষণীয় চিত্র।
এসব চিত্রের মধ্যে রয়েছে প্রাচীন ভারতীয় এক কাল্পনিক প্রাণী, প্রায় এক হাজার বছর আগের একটি নক্ষত্র-মানচিত্র এবং এক পরিশ্রমী সম্রাটের ব্যক্তিগত হিজিবিজি লেখা। ‘সিখু ছুয়ানশু’, যার অর্থ ‘চার কোষাগারের সম্পূর্ণ গ্রন্থাগার’, চীনের ইতিহাসে ধ্রুপদী সাহিত্যকর্মের অন্যতম বৃহৎ সংগ্রহ।
ছিং রাজবংশের শাসনামলে সংকলিত এই গ্রন্থে রয়েছে প্রায় ৮০ কোটি অক্ষর। মূলত সাতটি অনুলিপি তৈরি হলেও বর্তমানে টিকে আছে মাত্র সাড়ে তিনটি। ২০২১ সালে লানচৌয়ে এর ডিজিটাল রূপ তৈরির প্রকল্প শুরু হয়। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে তরুণ সম্পাদকরা পৃষ্ঠা ধরে তথ্য যাচাই করতে গিয়ে প্রাণবন্ত ও কৌতুকপূর্ণ চিত্রগুলো আবিষ্কার করেন।
প্রকল্পটির প্রধান সংস্থা তুচে প্রকাশনা ও গণমাধ্যমের ডিজিটাল প্রকাশনা কেন্দ্রের উপপরিচালক চাং ইয়াং বলেন, “বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন এই ধরনের একটি বই পড়া খুব কঠিন হবে। কিন্তু আমরা যখন পাতা উল্টে যাচ্ছিলাম, তখন এমন অনেক প্রাণবন্ত ছবি খুঁজে পেলাম যা আধুনিক পাঠকদের কৌতূহল জাগিয়ে তুলতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে এই মূল্যবান বিশাল গ্রন্থটি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। অনুলিপিটি সংরক্ষণের জন্য লানচৌয়ে একটি ভূগর্ভস্থ বিশেষ গ্রন্থাগার তৈরি করা হয়, যেখানে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নির্দিষ্ট মাত্রায় রাখা হয়। ২০২১ সালে গ্রন্থটির ডিজিটাল রূপ তৈরির প্রকল্প শুরু হয়।
দলটি চিত্রগুলোকে ১২টি বিভাগে সাজায়। এসব বিভাগের মধ্যে রয়েছে চা সংস্কৃতি, জ্যোতির্বিদ্যা, স্থাপত্য, চিকিৎসা, পোশাক ও অস্ত্র নির্মাণ। প্রদর্শনী চালুর পর সর্বোচ্চ ভিড়ের দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
সি’আনের দর্শনার্থী লিয়াং থাও বলেন, আমরা অনেকদিন ধরেই সিখু ছুয়ানশুর নাম শুনেছিলাম, কিন্তু এই প্রথম আমরা এটিকে এত কাছ থেকে দেখছি। এটি একই সাথে আনন্দদায়ক এবং বিস্ময়কর।
ডিজিটাল রূপান্তর প্রকল্পের প্রধান সোং শুয়েচুয়ান বলেন, এই প্রদর্শনীটি প্রাচীন সম্পদকে শুধু ঘরে আটকে না রেখে সবার দেখার ও উপভোগ করার সুযোগ করে দিয়েছে।
প্রদর্শনীটি তাই শুধু একটি প্রাচীন গ্রন্থের সংরক্ষণ নয়; বরং প্রযুক্তি ও সৃজনশীল উপস্থাপনার মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে সহজ, আকর্ষণীয় ও জীবন্ত করে তোলার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: সিএমজি