ধানক্ষেত পেরিয়ে বিদেশি ফলের বাগান: চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে কৃষিতে নতুন বিপ্লব

একসময় চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের কৃষকদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল ধান, পাট, ভুট্টা ও পেয়ারার মতো প্রচলিত ফসল। তবে সময়ের সাথে সাথে সেই চিত্র আমূল বদলে গেছে। বর্তমানে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও নতুন জাতের বিদেশি ফল চাষের মাধ্যমে উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তারা কৃষিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করেছেন। অ্যাভোকাডো, রাম্বুটান, লংগান, মাল্টা, ড্রাগন, আনারকলি ও আঙুরের মতো উচ্চমূল্যের বিদেশি ফলের বাণিজ্যিক চাষাবাদ এখন স্থানীয় কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিচ্ছে।

প্রায় ১৫ বছর আগে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এই বিদেশি ফল চাষ এখন একটি লাভজনক বাণিজ্যিক শিল্পে রূপ নিয়েছে। জীবননগর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে এলাকায় ড্রাগন ৬৮৮ হেক্টর, মাল্টা ৩১২ হেক্টর, কমলা ১২০ হেক্টর, পেয়ারা ৭৪৮ হেক্টর, আঙুর ৯ হেক্টর, রকমেলন ৬ হেক্টর, অ্যাভোকাডো ৪ হেক্টর, আনারকলি ২ হেক্টর, শরিফা ১ হেক্টর, রাম্বুটান শূন্য দশমিক ১৩ হেক্টর, আনার শূন্য দশমিক ৫০ হেক্টর এবং বারোমাসি কাঁঠাল শূন্য দশমিক ৫০ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে।

রাজাপুর গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা সজল আহমেদ ২০১৪ সালে মাত্র ৯ বিঘা জমিতে পেয়ারা বাগান দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে তিনি প্রায় ১৪০ বিঘা জমিতে দেশি-বিদেশি ফলের বিশাল বাগান গড়ে তুলেছেন। তাঁর ‘বিসমিল্লাহ নার্সারি ও ফলের বাগান’ প্রকল্পে মরক্কো, পাকিস্তান, আফ্রিকা ও ভিয়েতনামের মাল্টা, বিভিন্ন প্রজাতির আম, ড্রাগন, কমলা, আঙুর ও অ্যাভোকাডোসহ প্রায় ২০০ ধরনের ফল রয়েছে। সজল জানান, পেয়ারা চাষে আশানুরূপ লাভ না পাওয়ায় তিনি মাল্টা চাষে মনোনিবেশ করেন, যা এখন তাঁর সাফল্যের চাবিকাঠি।

আরেক সফল উদ্যোক্তা আকশেদ আলী দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ড্রাগন ও মাল্টা চাষ করছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ইউটিউবে ভিডিও দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি সিরাজগঞ্জ থেকে দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল ও প্যারাগুয়ের আদি ফল ‘আনারকলি’র চারা সংগ্রহ করেন। ধানক্ষেত প্রস্তুত করে চারা রোপণের মাত্র ছয় মাসের মাথায় গাছে ফুল আসতে শুরু করে। বাঁশের মাচা ও তারের সাহায্যে পরিচর্যার ফলে বর্তমানে তাঁর বাগানে প্রচুর আনারকলি ঝুলছে, যা আগস্টের শুরু থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় বাজারজাত করা হচ্ছে।

হাসাদাহ গ্রামের দুই ভাই আশরাফুল ইসলাম ও তরিকুল ইসলাম সাড়ে ৩ বিঘা জমিতে ৭৫০টি পার্পেল ও বাইকুনুর জাতের আঙুরগাছ লাগিয়ে দারুণ সাফল্য পেয়েছেন। একসময় বাংলাদেশে আঙুর চাষ অসম্ভব মনে করা হলেও, আধুনিক পদ্ধতি ও জীবননগরের উর্বর পলিমাটির গুণে এখন তা সফলভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। এছাড়া উথলী গ্রামের কৃষক আশরাফুজ্জামান মিলু ও রাজু আহমেদ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ড্রাগন ও মাল্টা চাষে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন।

কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন জানান, জীবননগরের মাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে বিদেশি ফলের চাষ অত্যন্ত সফল হচ্ছে। কৃষি বিভাগ থেকে উদ্যোক্তাদের নিয়মিত প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিনি মনে করেন, বিদেশি ফলের এই বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও টেকসই করে তুলবে।

এই বাগানগুলো এখন কেবল আয়ের উৎস নয়, বরং দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন যশোর, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর এমনকি ঢাকা থেকেও মানুষ বাগান দেখতে ভিড় করছেন। দর্শনার্থী হাসান নিলয় ও হাসিবুল ইসলাম জানান, আগে এসব ফল কেবল ইউটিউব বা টেলিভিশনে দেখলেও এখন নিজ এলাকায় সরাসরি দেখতে পাওয়া এবং সুস্বাদু ফল খাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করছে।

কৃষকদের মতে, আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের ফলে উৎপাদন খরচ কম এবং বাজারে এসব ফলের চাহিদা ও দাম দুটোই বেশি। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে জীবননগরের উৎপাদিত ফলের নিয়মিত সরবরাহ বাড়ছে। ধান ও পাটের পাশাপাশি বিদেশি ফলের এই বাণিজ্যিক চাষাবাদ জীবননগরের কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের পথ প্রশস্ত করেছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র বদলে দিচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কৃষকদের কাছে বিদেশি ফলের চাষও দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কারণ আঙুর মানেই ছিল বিদেশি ফল, যা দেশে আমদানি করেই পাওয়া যেত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অল্প খরচে লাভজনক হওয়ায় এ চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন অন্য কৃষকেরাও। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ধানক্ষেত প্রস্তুত করে সেখানে চারাগুলো রোপণ করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এরপর নিয়মিত সেচ, সার, কীটনাশক প্রয়োগসহ পরিচর্যা করতে থাকেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলগুলো সঠিকভাবে ধরে রাখতে এবং পচন থেকে রক্ষা করতে বাঁশের খুঁটি ও তার দিয়ে মাচা তৈরি করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁর বাগানে বর্তমানে মরক্কো, পাকিস্তান, আফ্রিকা ও ভিয়েতনাম জাতের মাল্টা রয়েছে ৪০ বিঘা জমিতে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিভিন্ন প্রজাতির আম রয়েছে ৩৫ বিঘা জমিতে।

উদ্যোক্তাকৃষিচুয়াডাঙ্গাজীবননগরড্রাগন ফলবিদেশি ফলমাল্টা