এসএসসি পাস করার পর বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখেন অনেক শিক্ষার্থী। তবে বিদেশে পড়াশোনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলের গুরুত্ব কতটা, তা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে। কুমিল্লার শিক্ষার্থী জিসান চৌধুরীর মতো অনেকেই জানতে চান, এসএসসি পাসের পর কি সরাসরি বিদেশে পড়তে যাওয়া সম্ভব, নাকি সেখানে গিয়ে পুনরায় নিচের কোনো শ্রেণিতে ভর্তি হতে হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ইউনেস্কোর ‘গ্লোবাল ফ্লো অব টারশিয়ারি লেভেল স্টুডেন্টস’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫৩ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনার জন্য বিশ্বের ৫৫টি দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। অথচ ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪৯ হাজার ১৫১ জন, ২০২১ সালে ৪৪ হাজার ৩৩৮ জন এবং ২০১৩ সালে ছিল মাত্র ২৪ হাজার ১১২ জন। অর্থাৎ গত এক দশকে বিদেশে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এসএসসি বা মাধ্যমিকের ফলাফল একেবারে মূল্যহীন নয়, তবে এটি সাধারণত ভর্তির মূল নির্ধারক হিসেবে কাজ করে না। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ১২ বছরের স্কুলশিক্ষা সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এই ১২ বছরের ধাপ সাধারণত এইচএসসি পর্যন্ত। তাই এসএসসি পাসের পর সরাসরি কোনো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হওয়া কঠিন। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশে ফাউন্ডেশন কোর্স বা ডিপ্লোমা প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়া প্রয়োজন হতে পারে।
পরামর্শক তামান্না তমার মতে, বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের তুলনায় ইংরেজি মাধ্যমের ও-লেভেল সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের আবেদন বিদেশে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়। মালয়েশিয়ার মতো কিছু দেশে ফাউন্ডেশন কোর্সের সুযোগ রয়েছে। আবার অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছরের ফাউন্ডেশন কোর্স শেষ করে ব্যাচেলর পর্যায়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া যায়।
বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত তিনটি কারণে এসএসসির ফল যাচাই করে। প্রথমত, শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা বা গ্যাপ আছে কি না তা দেখা। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীর একাডেমিক অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা। যেমন, এসএসসিতে জিপিএ ৩.৫০, এইচএসসিতে ৪.৫০ এবং স্নাতকে ৩.৭৫—এ ধরনের ঊর্ধ্বমুখী ফলাফল ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়। তৃতীয়ত, ফাউন্ডেশন বা ডিপ্লোমা প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য নির্দিষ্ট গ্রেড বা বেঞ্চমার্ক পূরণ করা। সাধারণত জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোতে অন্তত ৬০ শতাংশ নম্বর প্রত্যাশা করা হয়।
আনিসুর রহমান সুরেল এইচএসসি পাসের পর অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে গিয়ে আইইএলটিএস পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তার অভিভাবক মোমেনা সরকার জানান, ভর্তির ক্ষেত্রে এসএসসি ও এইচএসসি—উভয় পরীক্ষার ফলাফলই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে সরাসরি স্নাতক পর্যায়ে ভর্তির ক্ষেত্রে এইচএসসি বা এ-লেভেলের ফলাফলই মূলত প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
মেডিসিন, ইঞ্জিনিয়ারিং বা আইনের মতো প্রতিযোগিতামূলক বিষয়ে আবেদনের ক্ষেত্রে মাধ্যমিক পর্যায়ের গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞানের ফলের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। তবে মাস্টার্স, এমফিল বা পিএইচডির জন্য আবেদন করলে এসএসসির ফলাফলের গুরুত্ব প্রায় থাকে না বললেই চলে। সেক্ষেত্রে সর্বশেষ ডিগ্রির সিজিপিএ, গবেষণা অভিজ্ঞতা, প্রকাশনা, থিসিস ও ভাষাগত দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মনিনুর রশিদের মতে, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পুরোপুরি বজায় রাখতে না পারায় শিক্ষার্থীদের বিদেশে গিয়ে নিজেদের যোগ্যতা নতুন করে প্রমাণ করতে হয়। তিনি উল্লেখ করেন, ও-লেভেল ও এ-লেভেলের মতো পরীক্ষাগুলো বিশ্বজুড়ে স্ট্যান্ডার্ডাইজড বা মানসম্মত হিসেবে স্বীকৃত, যার ফলে সেগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বেশি। কিন্তু এসএসসি ও এইচএসসি এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
পরিশেষে, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ভালো একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট, ভাষাগত দক্ষতা (আইইএলটিএস বা পিটিই), পড়াশোনায় বিরতিহীনতা এবং আর্থিক সক্ষমতা থাকা জরুরি। এসএসসি পাসের পর বিদেশে যেতে চাইলে ফাউন্ডেশন বা ডিপ্লোমা কোর্সের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া একটি কার্যকর পথ হতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কুমিল্লার শিক্ষার্থী জিসান চৌধুরীও এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কয়েক দিন আগেই এসএসসি পাস করেছেন তিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফল প্রকাশের পর উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি ও কলেজ বাছাইয়ের পাশাপাশি বিদেশে পড়াশোনার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশ্বের এক দেশ থেকে অন্য দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার প্রবণতা নতুন নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একসময় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই স্নাতকোত্তর বা পিএইচডি করতে বিদেশে যেতেন।