অধ্যাপক ড. হ্য হোংমেই
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। আর এ সময় বৈশ্বিক পুনরুদ্ধারের নতুন প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ডিজিটাল অর্থনীতি। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড)-এর মতে, বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতি বছরে ১০–১২ শতাংশে হারে বাড়ছে, যা সামগ্রিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে দ্রুত। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ভবিষ্যতেও বৈশ্বিক মূল্য সংযোজন সৃষ্টিতে প্রধান ভূমিকা পালন করবে। ২০২৩ সালে, বিশ্বজুড়ে সরবরাহযোগ্য ডিজিটাল সেবার বাণিজ্য সাড়ে চার ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আর এর হাত ধরেই বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কাঠামো পুনর্গঠিত হয়েছে ধারাবাহিকভাবে।
এই ডিজিটাল রূপান্তর এখন বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর জন্য উত্তর–দক্ষিণ উন্নয়ন বৈষম্য কমানোর দারুণ সুযোগ তৈরি করেছে। তবে বিভিন্ন স্থায়ী চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে। এর মধ্যে রয়েছে অপর্যাপ্ত ডিজিটাল অবকাঠামো, সীমিত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক ডিজিটাল বৈষম্য।
কীভাবে ডিজিটালায়নের সুফল সবার মধ্যে ভাগ করে নেওয়া যায় এবং কীভাবে ডিজিটাল বিপ্লবকে টেকসই উন্নয়নের চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করা যায়—এটি বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি অভিন্ন চ্যালেঞ্জ।
ডিজিটাল অর্থনীতি: নতুন প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন
প্রচলিত অবকাঠামোর তুলনায় ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণে কম বিনিয়োগ প্রয়োজন, এর নির্মাণকাল অপেক্ষাকৃত স্বল্প, এবং এটি উল্লেখযোগ্য প্রান্তিক ব্যয়-সুবিধা দেয়। ফলে সীমিত আর্থিক সক্ষমতা ও শিল্পভিত্তি সম্পন্ন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি এক লাফেই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করে।
আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন-এর ‘মেজারিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট: ফ্যাক্টস অ্যান্ড ফিগারস ২০২৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। তবুও প্রায় ২২০ কোটি মানুষ অফলাইনে। এদের অধিকাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বাসিন্দা। উচ্চ আয়ের দেশগুলোয় ইন্টারনেট প্রবেশের হার প্রায় ৯৪ শতাংশ। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এই হার ২৩ শতাংশ। এটি বৈশ্বিক উত্তর–দক্ষিণ ডিজিটাল বৈষম্যের গভীরতা প্রতিফলিত করে। যদিও মোবাইল ব্রডব্যান্ড এবং ৫জি নেটওয়ার্কের আওতা ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে, তবুও সেবার মান, ক্রয়ক্ষমতা, এবং শহর–গ্রাম ও নারী–পুরুষের মধ্যে বৈষম্য এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে রয়ে গেছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বিষয় নয়; বরং এটি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক উন্নয়নের সুযোগ নির্ধারণকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
দুর্বল আর্থিক অবকাঠামো এবং শহর–গ্রামের অসম উন্নয়নের কারণে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিম্ন-আয়ের মানুষরা দীর্ঘদিন আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং স্মার্ট ডিভাইসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ডিজিটাল ফাইন্যান্স সঞ্চয়, অর্থ স্থানান্তর এবং ঋণের মতো সেবাগুলোকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে। এতে করে সেবা পাওয়ার প্রতিবন্ধকতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং আর্থিক সেবার পরিধি বিস্তৃত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের-এর গ্লোবাল ফিনডেস্ক ডাটাবেজ ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিক আর্থিক হিসাবধারী প্রাপ্তবয়স্কদের হার ৭৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০১১ সালের ৫১ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অর্থনীতিগুলোতেও এই হার প্রায় ৭৫ শতাংশে পৌঁছেছে। বর্তমানে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর প্রায় ৪০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক আনুষ্ঠানিক আর্থিক হিসাবের মাধ্যমে সঞ্চয় করেন, যা ২০২১ সালের তুলনায় ১৬ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। এটি আর্থিক আচরণের ওপর ডিজিটাল ফাইন্যান্সের ইতিবাচক প্রভাবকে তুলে ধরে।
বিশ্বব্যাপী এখনও প্রায় ৯০ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন। তাদের অধিকাংশেরই মোবাইল ফোন রয়েছে এবং ৫০ কোটিরও বেশি মানুষের স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ আছে। এটি ডিজিটাল আর্থিক সেবা আরও সম্প্রসারণের শক্তিশালী প্রযুক্তিগত ভিত্তি।
যুব বেকারত্ব ও কাঠামোগত কর্মসংস্থান বৈষম্য হ্রাস
অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশে যুব-প্রধান জনসংখ্যাগত কাঠামো স্পষ্টভাবে দেখা যায়। সেখানে শ্রমশক্তির সরবরাহ প্রচুর হলেও, দেশীয় উৎপাদন ও সেবা খাতের শ্রমশক্তি গ্রহণের সক্ষমতা সীমিত। পাশাপাশি নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা এবং গ্রাম থেকে শহরে শ্রমিক স্থানান্তরের অপর্যাপ্ত সুযোগের কারণে দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত কর্মসংস্থান বৈষম্য রয়ে গেছে। ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান—যেমন গিগ ইকোনমি, প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাজ এবং দূরবর্তী কর্মসংস্থান—চাকরির সুযোগ বাড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) উল্লেখ করেছে যে, বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে এবং এটি অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এ খাতের প্রবৃদ্ধি আরও জোরালো। একই সঙ্গে, প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাজে নারীদের অংশগ্রহণও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, ডিজিটাল অর্থনীতি কর্মসংস্থানের কাঠামোকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে। এর ফলে শ্রমবাজার ধীরে ধীরে ‘কাজের সুযোগের সীমাবদ্ধতা’ থেকে ‘দক্ষতার সঙ্গে কাজের চাহিদার সামঞ্জস্যের সীমাবদ্ধতা’-র দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অর্থাৎ, এটি যেমন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে, তেমনি কর্মশক্তির দক্ষতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নতুন নতুন চাহিদা তৈরি করছে।
এসএমই’র জন্য আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের বাধা হ্রাস
প্রথাগত আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য সাধারণত দীর্ঘ মূল্য শৃঙ্খলের (ভ্যালু চেইন) ওপর নির্ভরশীল, যেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য বহু স্তরের মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে লেনদেন ব্যয় বাড়ে এবং দর-কষাকষির সুযোগ কমে যায়। এই পরিস্থিতি অনেক উন্নয়নশীল দেশকে প্রাথমিক পণ্য রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল করে রেখেছে এবং তাদের বাণিজ্য কাঠামোটিকেও গণ্ডির মধ্যে আটকে রেখেছে। ডিজিটাল আন্তঃসীমান্ত ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো চাহিদা ও সরবরাহের সমন্বয় প্রক্রিয়াকে নতুনভাবে সাজিয়ে মধ্যস্থতাকারীর সংখ্যা কমায় এবং তথ্য ও লেনদেন ব্যয় হ্রাস করে। ফলে এসএমইগুলোর জন্য বৈশ্বিক বাজারে সরাসরি প্রবেশের আরও সহজ পথ তৈরি হয়।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন (আঙ্কটাড) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার গবেষণা বলছে ডিজিটাল বাণিজ্য এবং প্ল্যাটফর্মভিত্তিক অর্থনীতি এসএমইগুলোর জন্য বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়িয়েছে এবং আরও বৈচিত্র্যময় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করছে। তবে বিভিন্ন অঞ্চলে অবকাঠামো, লজিস্টিক ও ব্যবসায়িক পরিবেশে উল্লেখযোগ্য বৈষম্য থাকায় ডিজিটাল বাণিজ্যের সুফল এখনও সমানভাবে বণ্টিত হয়নি।
মোদ্দাকথায়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ডিজিটাল অর্থনীতির গুরুত্ব কেবল নতুন প্রবৃদ্ধির উৎস হিসেবে নয়, বরং পুঁজি-নির্ভরতা, প্রথাগত অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের ওপর নির্ভরতা আংশিকভাবে কমিয়ে আনার সক্ষমতার মধ্যেও নিহিত। বাজারে প্রবেশের বাধা কমিয়ে, সেবার পরিধি বাড়িয়ে এবং সম্পদ বণ্টনের দক্ষতা উন্নত করে এটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর জন্য স্বল্প ব্যয়ে বিশ্বায়নে অংশগ্রহণের একটি নতুন পথ উন্মুক্ত করে।
তবে ডিজিটাল অর্থনীতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সুফল নিশ্চিত করে না। এর সুবিধাগুলোর বণ্টন এখনও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং মানবসম্পদের মতো বিভিন্ন বিষয়ে সীমাবদ্ধ। তাই ডিজিটাল প্রযুক্তির সুবিধাগুলোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করা এবং সেগুলোকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন লক্ষ্যের সেবায় কার্যকরভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
(লেখক: অধ্যাপক ড. হ্য হোংমেই, পরিচালক, দক্ষিণ এশিয়া গবেষণা ইনস্টিটিউট, ইয়ুননান সামাজিক বিজ্ঞান একাডেমি, চীন)