অধ্যাপক ড. হ্য হোংমেই
চীন-বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই জ্ঞানের বিস্তার, সভ্যতার শিক্ষা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে; ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা ভূখণ্ড সম্প্রসারণের ওপর নয়।
বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পাহাড়সম অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। সুরক্ষাবাদের প্রবণতাও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে উন্নয়ন অর্থায়নের ঘাটতি। ঠিক এমন সময় অনেকগুলো উন্নয়নশীল দেশের মুখে শোনা যাচ্ছে একটি প্রশ্ন: জ্ঞান বিনিময়, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে কীভাবে উন্নয়ন সক্ষমতা শক্তিশালী করা যায়, যাতে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়?
গ্লোবাল সাউথ তথা বৈশ্বিক দক্ষিণের অনেক দেশের কাছে এখন উন্নয়ন মানে শুধু মূলধনী বিনিয়োগ বা প্রযুক্তিগত সহায়তা নয়। সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো অভিজ্ঞতা বিনিময়, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক বোঝাপড়ার বিকাশ। চ্যালেঞ্জটি চীন বা বাংলাদেশের কাছে নতুন নয়। বছরের পর বছর এ দুই দেশের মধ্যে আদান-প্রদানের ক্ষেত্র এখন বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার গণ্ডি ছাড়িয়ে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক উন্নয়নেও গভীর ভিত্তি গড়ে তুলেছে।
সীমানা পেরিয়ে গড়ে ওঠা সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক সংযোগ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতায় জুগিয়েছে দীর্ঘস্থায়ী গতি। দেশ দুটির এ অভিজ্ঞতা দেখায়—কীভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে একে অপরের কাছ থেকে শিখতে পারে, জ্ঞান ভাগাভাগি করতে পারে এবং যৌথ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
সহস্রাব্দব্যাপী আদান-প্রদানের সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা
চীন ও বাংলাদেশের সভ্যতাগত সম্পর্কের ইতিহাস হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। পঞ্চম থেকে সপ্তম শতাব্দীর মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের সন্ধানে যাত্রাকালে চীনা বৌদ্ধ ভিক্ষু ফাসিয়ান ও সুয়ানচাং প্রাচীন বঙ্গ অঞ্চলের সমৃদ্ধ সমাজব্যবস্থা ও বিদ্যাচর্চার বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। একাদশ শতাব্দীতে বর্তমান বাংলাদেশের বিক্রমপুরে জন্মগ্রহণকারী প্রখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর চীনে যান এবং তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের বিকাশে স্থায়ী অবদান রাখেন। পঞ্চদশ শতাব্দীতে চ্যং হ্যর নৌবহর একাধিকবার চট্টগ্রাম সফর করে, যা দুই পক্ষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময়কে উৎসাহিত করে।
ইতিহাসের এসব অধ্যায় প্রমাণ করে, চীন-বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই জ্ঞানের বিস্তার, সভ্যতার শিক্ষা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে; ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা ভূখণ্ড সম্প্রসারণের ওপর নয়।
তরুণ প্রজন্ম ও জ্ঞান: ভবিষ্যতের সেতুবন্ধন
এখন শিক্ষা-সহযোগিতা ধীরে ধীরে চীন–বাংলাদেশ সম্পর্কের গতিশীল মাত্রায় পরিণত হয়েছে। আগের চেয়ে অনেক বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী এখন চীনে পড়াশোনা করতে যাচ্ছে। তারা শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞান বা ভাষা শিক্ষায় নিজেদের আটকে রাখছে না; প্রকৌশল, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো উদীয়মান ক্ষেত্রেও উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি বৃত্তি, বিশ্ববিদ্যালয় বৃত্তি এবং বিভিন্ন যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে চীন। এসব শিক্ষার্থীর কাছে চীনে পড়াশোনা কেবল পেশাগত জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের বিষয় নয়; এটি নতুন উন্নয়ন ধারণা, শিল্পখাতের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং উদ্ভাবনী পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ারও সুযোগ। তরুণদের মধ্যে আদান-প্রদান যত বাড়ছে, ততই এমন এক নতুন প্রজন্মের মেধাবী তরুণ উঠে আসছে, যারা দুই দেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও উন্নয়নের অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত এবং চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সেতুবন্ধনের ভূমিকা পালন করছে।
উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা-সহযোগিতাও দুই দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিভিন্ন প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি শিক্ষা উদ্যোগের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক বাংলাদেশি তরুণ ডিজিটাল প্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা এবং প্রকৌশল প্রয়োগের মতো ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করেছে। ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর প্রকাশিত চায়না ডেইলি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের আন্তর্জাতিক কারিগরি শিক্ষা সহযোগিতার অন্যতম প্রধান উদ্যোগ লুবান ওয়ার্কশপ বিশ্বের বহু দেশে অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে। এ পর্যন্ত এটি ২০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি দিয়েছে, ৩৫ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারীকে কারিগরি দক্ষতা প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং ২ হাজার ২০০’রও বেশি স্থানীয় শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে কারিগরি শিক্ষাকে সমন্বিত করার মাধ্যমে এ ধরনের কর্মসূচি শুধু তরুণদের কর্মসংস্থানের সক্ষমতাই বাড়ায় না, বরং অংশীদার দেশগুলোর শিল্পোন্নয়ন ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদও গড়ে তোলে।
এসব উদ্যোগের গুরুত্ব শুধু জ্ঞান হস্তান্তরেই আটকে নেই; বরং স্থানীয় সক্ষমতা শক্তিশালী করার মধ্যেই এর প্রকৃত তাৎপর্য লুকিয়ে আছে। প্রচলিত সহায়তা মডেলের চেয়ে শিক্ষা-সহযোগিতা ও দক্ষতা উন্নয়ন ঘটানো হলে তা টেকসই উন্নয়নের দরকারি সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করে। এতে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির একটি আত্মনির্ভরশীল ভিত্তি তৈরি হয়।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শক্তিশালী করতে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানও অপরিহার্য ভূমিকা রেখে চলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঢাকায় আয়োজিত চীনের অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রদর্শনী, চীনের সাংস্কৃতিক সপ্তাহ, যৌথ শিল্পকলা প্রদর্শনী এবং তরুণদের সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচিতে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা দেখা গেছে। অভিজ্ঞতা বলছে, সাংস্কৃতিক বিনিময় কেবল ঐতিহ্য ও রীতিনীতির প্রদর্শনী নয়; এটি সমাজগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত দূরত্ব কমানোর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ভিন্ন পটভূমির মানুষ যখন উন্মুক্ততা ও অন্তর্ভুক্তির মনোভাব নিয়ে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সহযোগিতা আরও বিস্তৃত সামাজিক সমর্থন পায়। এই সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক তরুণ, গবেষক ও শিল্পী দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলছেন। ফলে চীন–বাংলাদেশ সম্পর্ক শুধু সরকার পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং সমাজের গভীরে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হচ্ছে।
যৌথ উন্নয়নের নতুন সুযোগ
ফোর ডিকেডস অব পোভার্টি রিডাকশন ইন চায়না: ড্রাইভার্স, ইনসাইটস ফর দ্য ওয়ার্ল্ড, অ্যান্ড দ্য ওয়ে অ্যাহেড শীর্ষক বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতির সূচনার পর থেকে চীনে প্রায় ৮০ কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে, যা বৈশ্বিক দারিদ্র্য হ্রাসে এক ঐতিহাসিক অবদান। অন্যদিকে, ক্ষুদ্রঋণ, নারীর ক্ষমতায়ন, কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা এবং তৃণমূল সামাজিক শাসনব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বহু উদ্ভাবনী উদ্যোগ গড়ে তুলেছে। দুই দেশের এ উন্নয়ন অভিজ্ঞতা ভিন্ন হলেও, উভয়ের কাছেই একে অপরের জন্য মূল্যবান শিক্ষণীয় দিক রয়েছে।
এমন এক সময়ে, যখন বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো ক্রমশ নিজেদের জাতীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়নের পথ খুঁজছে, তখন এই ধরনের দ্বিমুখী শিক্ষা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অর্থবহ উন্নয়ন সহযোগিতার অর্থ কোনো একক মডেল অনুকরণ করা নয়; বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি, ধারণা বিনিময় এবং স্থানীয় বাস্তবতার উপযোগী সমাধান অনুসন্ধান করা। আর্থিক সহায়তার তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অভিজ্ঞতা বিনিময়কেন্দ্রিক উন্নয়ন সহযোগিতা আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক প্রভাব সৃষ্টি করে।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, চীন ও বাংলাদেশের সামনে সহযোগিতার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন, তরুণদের উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি, সবুজ উন্নয়ন, কৃষির আধুনিকায়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ এবং জনস্বাস্থ্য সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো ক্ষেত্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। ক্রমবর্ধমান সংখ্যক তরুণ, গবেষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের সংগঠন এসব বিনিময় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করায় দুই দেশের সম্পর্ক প্রচলিত সহযোগিতার কাঠামো অতিক্রম করে আরও বিস্তৃত জ্ঞানভিত্তিক নেটওয়ার্ক এবং শক্তিশালী সামাজিক সংযোগ গড়ে তুলবে।
চীন ও বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং জ্ঞান বিনিময় প্রমাণ করে যে, ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতাও সমতা, পারস্পরিক শিক্ষা ও সহযোগিতার মাধ্যমে অভিন্ন অগ্রগতি অর্জন করতে পারে। ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তায় চিহ্নিত বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিবেশে জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে যৌথ উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়ার এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু চীন–বাংলাদেশ সম্পর্কেই নতুন প্রাণসঞ্চার করছে না; বরং গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর নিজস্ব আধুনিকায়নের পথে অগ্রযাত্রার জন্যও মূল্যবান শিক্ষা দিচ্ছে।
(লেখক: অধ্যাপক ড. হ্য হোংমেই, পরিচালক, দক্ষিণ এশিয়া গবেষণা ইনস্টিটিউট, ইয়ুননান সামাজিক বিজ্ঞান একাডেমি, চীন)