দেয়ালের ওপাশে


সাবিত রিজওয়ান

তারা যেন প্রতিবেশী না, শত্রু। কেউ কারো ভালো চায় না। একই উঠান ভাগ করে থাকে, একই পথ দিয়ে হাঁটে, কিন্তু একে অপরের দিকে তাকালে চোখে শুধু কঠোরতা। 

কবির এই উঠানে জন্মেছে। এই উঠানেই বড় হয়েছে। অথচ আজকাল তার নিজের বাড়িটাও তার কাছে অপরিচিত লাগে। পাশের বাড়ির আরশ, যার সঙ্গে একসময় একই গাছে উঠে আম পেড়েছে, আজ সে অদৃশ্য এক দেওয়ালের ওপাশের একজন মানুষ মাত্র। 

সবকিছুর শুরু তিন হাত জমি থেকে। 

আরশ আর তার মা বিশ্বাস করত, কবিরদের বাড়ির সীমানার ভেতরে তাদের তিন হাত জায়গা আছে। কতদিন আর নিজের জমি অন্যের দখলে থাকবে? এক সকালে তারা ইট এনে সীমানা গাঁথতে শুরু করল। প্রায় বিশটা ইট বসেও গেল।

কবিরের বাবা এসে দাঁড়ালেন।
“এইটা আমাদের জায়গা। আপনারা কেন এখানে দেয়াল তুলছেন?”

আরশের মা বললেন,“এই জায়গা আমাদের। এতদিন চুপ ছিলাম, তাই বলে এটা আপনাদের হয়ে যায় না।”

কথা বাড়ল। উত্তাপ বাড়ল। কিন্তু দেয়াল আর সেদিন উঠল না। 

এরপর শুরু হলো নীরব যুদ্ধ। 

আরশদের ঘরের জানালা খুললেই দেখা যেত কবিরদের উঠান। এবং সেই জানালা দিয়েই প্রায়ই বিস্কুটের খোসা, পলিথিন এবং নানা ময়লা এসে পড়ত কবিরদের উঠানের কোণে। প্রথমে কবিরের মা ভেবেছিলেন, হয়তো বাতাসে উড়ে এসেছে। কিন্তু যখন একই ঘটনা বেশ কয়েকবার ঘটতে লাগল, তখন আর ভুল হওয়ার সুযোগ রইল না।

“আপনারা কেন আমাদের উঠানে এসব ফেলেন?”
আরশ অস্বীকার করল।
আরশের মাও বললেন,“মিথ্যা কথা বলবেন না। আমরা কারো জায়গায় ময়লা ফেলি না।”

কথা সেখানেই থেমে গেল। কিন্তু কয়েকদিন নজর রাখার পর সত্য লুকিয়ে থাকল না। এক বিকেলে কবির নিজের চোখে দেখল: আরশ তাদের জানালা দিয়ে পলিথিন ছুড়ে ফেলল, আর সেটা এসে পড়ল উঠানের কোণে। 

শেষ পর্যন্ত একজন আমিন ডেকে আনা হলো। জমি মাপা হলো। ফলাফল পরিষ্কার: আরশদের তিন হাত জমির দাবি মিথ্যা। কবিররা নিজেদের জায়গাতেই রয়েছে। আরশরা আর দেয়াল তুলতে পারলো না।
কিন্তু তাদের আচরণ বদলাল না।

কবিরদের বাড়ির দক্ষিণ পাশে একটি সরু মাটির পথ ছিল। সেই পথ দিয়েই তারা যাতায়াত করত। কবিরদের বাড়ির পরে আর কোনো বাড়ি নেই, পথটা কয়েকজনের জায়গা নিয়ে সামান্য প্রস্তুত। সামনে, ঠিক বিপরীতে, আরশদের বাড়ি। 

প্রায় মাঝে মাঝে কবিরদের প্রবেশ করার পথে আরশ আসে প্রসাব করতে, কখনো করতে পারে, কখনো কবির বা তার বাবা-মা টের পেলে করে না। 

বর্ষার সময় আরশদের উঠানের জমে থাকা পানি নামার সহজ কোনো পথ ছিল না। এক সকালে বৃষ্টির পর কবির বাইরে এসে দেখল, তাদের দক্ষিণ পাশের সেই সরু পথের একাংশ কেটে দেওয়া হয়েছে। কোদালের দাগ এখনও স্পষ্ট। আরশদের উঠানের জমে থাকা পানি সেই কাটা অংশ দিয়ে গড়িয়ে কবিরদের পথ বেয়ে নেমে যাচ্ছে। 

কবির কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আরশকে বলল,
“রাস্তা কাটছ কেন?” 

আরশ নির্বিকারভাবে উত্তর দিল,
“পানি তো নামতেই হবে।” 

কবির বলল,
“এই পথটা তো আমাদের চলার পথ। এভাবে কাটলে নষ্ট হয়ে যাবে।” 

আরশ হালকা হেসে বলল,
“কেসাল করো না। তোমাদেরও সুবিধা হবে, আমাদেরও।”

কবির আর কিছু বলল না। কিন্তু সে জানত, এই পথটা শুধু পথ না; এটা তাদের বাড়ির একমাত্র চলার জায়গা।
বর্ষা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির স্রোতে পথের কিছু মাটি ধুয়ে সরে যাচ্ছিল। কাদা মাটি যখন চলতে চলতে স্যান্ডেলে লেগে থাকে, স্যান্ডেলসহ উঠে যায়, তাতে জায়গাটাও বিশ্রী দেখায়।

একদিন কবির আরশকে ডাকে বলল,
“এভাবে তো পথটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একটা পাইপ বসালে পানি নির্দিষ্ট পথে যাবে। চাইলে খরচ আমরা ভাগাভাগি করতে পারি।”

আরশ তার দিকে তাকাল, কিন্তু কোনো উত্তর দিল না। তার নীরবতা স্পষ্ট জানিয়ে দিল, সে আগ্রহী নয়।

এই গ্রামে আরশদের আত্মীয়স্বজন আছে। পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ আছে। কবিরদের নেই। তারা নিজের সমস্যার সমাধান নিজেরাই করে।

শেষ পর্যন্ত কবিরের মা, খালার বাড়ি থেকে একটি পাইপ এনে সেই পথে উপরে মাটি চাপা দিয়ে বসাল। যেভাবে পাইপ বসানো হয়। প্রথমে দুই-তিন বা চারদিন বৃষ্টি হয়েছিল। পাইপের ভেতর দিয়ে পানি নেমে যাওয়ায় কিছুদিনের জন্য পথটা কিছুটা রেহাই পেল। 

একদিন রাত বারোটার দিকে কবিরের বাবা প্রসাব করতে উঠে দেখল, বৃষ্টির পর কে যেন অস্বাভাবিকভাবে পাইপের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, বলতে গেলে অকারণে সেটার দিকে তাকিয়ে। কবিরের বাবা চিল্লালো কে? কোনো উত্তর আসলো না। কবিরের বাবাও তেমন গুরুত্ব সহকারে বিষয়টাকে না দেখে ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। সকাল সকালই কাজে যেতে হবে।

পাইপ লাগানোতে কবির ভেবেছিল, হয়তো এবার সব ঠিক থাকবে। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিদিন টিকল না। 

বৃষ্টি দিন শেষ হওয়ার প্রায় পাঁচ-ছয় সপ্তাহ পর একদিন কবির লক্ষ্য করল, পাইপের উপরের চাপা দেওয়া মাটিগুলো শুকিয়ে ধুলোর মতো হয়ে গেছে, আগের তুলনায় জায়গাটা সামান্য নিচু। পাইপের কোনো জায়গায় মাটি কম, কোনো জায়গায় বেশি, কোথাও ঢেকে রাখা পাইপের উপরি অংশের এক টাক্কর বা তার কম অংশ দেখা যায়। অর্থাৎ স্লিম না ছ্যাড়াব্যাড়া। কবির বুঝতে পারল, সমস্যা শুধুই প্রাকৃতিক নয়। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে পাইপে হস্তক্ষেপ করেছে। 

সে আলতো করে মাটি সরিয়ে পাইপ পোঁতা জায়গার কোণগুলো খুঁড়ে দেখল: একপাশে সূক্ষ্ম ফাটল ও কাটা দাগ রয়েছে। এমনভাবে নষ্ট করা হয়েছে, যেন হঠাৎ করেই ভেঙে গেছে বলে মনে হয়। আর কিছুদিন পর যদি লক্ষ্য করতো তাহলে দেখা যেত পাইপের অর্ধেক অংশে সূক্ষ্ম ফাটল ও কাটা দাগ।
কবির কিছু বলেনি। 

তারা কখনো কখনো দেখেছে: আরশ, আর তার মামাতো ভাইরা হাতে কাচি নিয়ে প্রায়ই সেই পথ ঘাস কাটতে দিয়ে যায়। কখনো কারো ক্ষেতে কাজ করতে গেলে কোদাল, লাঙল নিয়ে যায়। স্বাভাবিকই মনে হয়।
প্রমাণ ছিল না। অভিযোগও করা হয়নি।
কবির বুঝতে পারল, কিছু ক্ষতি কখনোই শুধু মাটির হয় না।

একদিন বিকেলে কবির সেই পথটিতে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক তখন আরশ বাজার থেকে ফেরত আসছিল, তার হাতে ঝুড়ি। পথের বাঁকে হাটতে হাটতে সে সামান্য থেমে দাঁড়ালো, যেন নিজের দৃষ্টিতে পথটা যাচাই করছে। কোনো শব্দ নেই, কোনো আঙ্গিক নেই, শুধু নীরব উপস্থিতি।

এখানে বুঝতে বাকী থাকে না পাইপের ক্ষতি, ময়লা ফেলা, রাস্তার পানি ঘেঁষে যাওয়া; সবই ইচ্ছাকৃত। আরশও জানে, কবির তা বুঝেছে। কিন্তু কেউ কিছু বলেনি। নীরবতা সবকিছু বলে দিচ্ছিল। দুজনের চোখ একবারের জন্য মিলল। মুহূর্তটা দীর্ঘ লাগল। ধীরে ধীরে তারা দৃষ্টি সরিয়ে নিল। কারণ তারা জানে, একই মাটিতে দাঁড়িয়ে থেকেও, তারা এখন আলাদা পৃথিবীর মানুষ।

তাদের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে: তিন হাত জমির চেয়েও বড়, অদৃশ্য একটা দেয়াল।
যে দেয়াল মানুষের মন, অহংকার, স্বার্থপরতা এবং নীরব প্রতিশোধের সৃষ্টি।

কবির বুঝতে পারল, এই দেয়াল ভাঙানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে কেবল এটিকে দেখছে, শ্বাস নিচ্ছে, সহ্য করছে।

এভাবেই জীবন চলে: দুজন একই মাটিতে, একই আকাশের নিচে, কিন্তু দুই ভিন্ন দুনিয়ায়।
এভাবেই ছোট-বড় দ্বন্দ্ব, অবিচার, নীরব প্রতিশোধ, এবং অদৃশ্য দেয়াল দিনের পর দিন মানুষকে পৃথক রাখে। 

জন্মস্থান: উত্তর উল্যা, ভরতখালী, সাঘাটা, গাইবান্ধা। 

storiesগল্প