চার হত্যার বিচার চাই, তবে আইনের শাসনও অটুট থাক 

মো. সামছুর রহমান সৈকত রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে গোটা দেশ শোকাহত ও ক্ষুব্ধ। একটি পরিবারের চারজন মানুষকে একসঙ্গে হত্যা করার মতো ভয়াবহ ঘটনা যেকোনো বিবেকবান মানুষকে নাড়া দেবে। নিহতদের স্বজনদের কান্না, স্বজন হারানোর বেদনা এবং নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ—সবই স্বাভাবিক। আমরা চাই, এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, প্রকৃত অপরাধীরা শনাক্ত হোক এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হলে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। কিন্তু একই সঙ্গে রংপুর জেলাআইনজীবী সমিতির সাময়িক সিদ্ধান্ত—অভিযুক্তদের পক্ষে কোনো আইনজীবী মামলা পরিচালনা করবেন না—আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্নও দাঁড় করিয়েছে: আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ারআগেই কি কোনো অভিযুক্তের আইনি প্রতিনিধিত্বের পথ বন্ধ করে দেওয়া উচিত? এই প্রশ্ন আসামিদের পক্ষ নেওয়ার প্রশ্ন নয়। এটি ন্যায়বিচার, আইনের শাসন এবং একটি সুষ্ঠু বিচারপ্রক্রিয়ার প্রশ্ন। অভিযুক্ত আর অপরাধী এক নয় কেউ গ্রেপ্তার হলেই তিনি আইনগতভাবে অপরাধী হয়ে যান না। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতে পারে, পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারে, তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যেতে পারে; কিন্তু আদালতেঅভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে অপরাধী বলা যায় না। অভিযোগ থাকা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। স্বাভাবিক বিচারপ্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র অভিযোগ আনে, পুলিশ তদন্ত করে, প্রমাণ সংগ্রহ করে এবং রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে তা উপস্থাপন করে। আসামিপক্ষ সেই প্রমাণ যাচাই ও প্রশ্ন করার সুযোগ পায়। সব পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ বিবেচনা করে আদালত সিদ্ধান্ত দেয়। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য অপরাধীকে রক্ষা করা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহারের মধ্যেও যেন কোনো নিরপরাধ মানুষ অন্যায়ভাবে শাস্তি না পান, তা নিশ্চিত করা। আমরা অভিযুক্তদের নির্দোষ বলছি না; আবার আদালতের রায়ের আগে তাঁদের অপরাধীও বলছি না। আমরা শুধু বলছি—চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের। ভয়াবহ অপরাধের ক্ষেত্রেও নিয়ম বদলানো যায় না চার হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনায় মানুষের ক্ষোভ ও দ্রুত বিচারের দাবি স্বাভাবিক। কিন্তু আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তখনই, যখন কোনো ঘটনার প্রতি জনসাধারণের আবেগ তীব্র থাকে। সহজ ও জনপ্রিয় মামলায় আইনের নিয়ম মেনে চলা কঠিন নয়; কঠিন হলো এমন একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও নিয়ম মেনে চলা, যাঁকে সমাজ ইতিমধ্যে অপরাধী হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। আমরা যদি বলি, অপরাধটি এত ভয়াবহ যে অভিযুক্তের আইনি অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজন নেই, তাহলে একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি হবে। আজ চার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, ভবিষ্যতে অন্য কোনো মামলায়ও জনরোষের অজুহাতে একই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। আইনের নিয়ম যদি অপরাধের ভয়াবহতা বা জনমতের ওপর নির্ভর করে বদলে যায়, তাহলে আইনের শাসন আরআইনের শাসন থাকে না। আসামিপক্ষে আইনজীবী মানে অপরাধের সমর্থন নয় আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারণা আছে—হত্যা মামলার আসামির পক্ষে কোনো আইনজীবী দাঁড়ালে তিনি যেন হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করছেন। এই ধারণা ঠিক নয়। আসামিপক্ষের আইনজীবীর দায়িত্ব হলোআদালতে পরীক্ষা করে দেখা, তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ যথাযথ ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না। আইনজীবী প্রশ্ন করবেন: প্রমাণ কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে; সাক্ষীদের বক্তব্য কতটা নির্ভরযোগ্য; ঘটনাস্থলের আলামত, ফরেনসিক প্রতিবেদন ও ডিজিটাল তথ্যের সঙ্গে ঘটনার মিল আছে কি না; তদন্তেকোনো ভুল বা অসঙ্গতি হয়েছে কি না; এবং কোনো স্বীকারোক্তি আইনসম্মত ও স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছিল কি না। এসব প্রশ্ন করা অপরাধীকে বাঁচানোর চেষ্টা নয়; বরং সত্য উদঘাটনের জন্যই এসব প্রশ্ন প্রয়োজন। কেউ সত্যিই অপরাধী হলে, তার বিরুদ্ধে শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা সম্ভব হওয়া উচিত। আর অভিযোগ ভুল হলে, সেই ভুলও আদালতের সামনে প্রকাশ পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন থাকলে প্রতিরক্ষার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ এই মামলার তদন্ত ও পুলিশের বক্তব্য নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা, ফরেনসিক তথ্য, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য প্রমাণের মধ্যে কোনো অমিল আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর নিরপেক্ষতদন্তের মাধ্যমে বের করতে হবে। তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠা মানেই অভিযুক্তরা নির্দোষ—এমন নয়। একইভাবে পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করেছে বলেই তাঁর অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এটিও নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত। তদন্তের দুর্বলতা, ভুল বা অসঙ্গতি আদালতের সামনে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো আসামিপক্ষের আইনজীবী। বিচার তো এক পক্ষের বক্তব্য শুনেহয় না; দুই পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ যাচাই করেই বিচার সম্পন্ন হয়। ১৬৪ ধারার জবানবন্দি থাকলেও বিচার শেষ হয় না দুই অভিযুক্ত আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন—এমন খবর প্রকাশিত হয়েছে। এমন জবানবন্দি তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে। তবেজবানবন্দি থাকলেই বিচার শেষ হয়ে যায় না। জবানবন্দি কী পরিস্থিতিতে দেওয়া হয়েছিল, তা স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছিল কি না, আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গেতার সামঞ্জস্য আছে কি না—এসবই আদালতের বিবেচনার বিষয়। অতএব, একটি জবানবন্দির পাশাপাশি মামলার সব প্রমাণের সামগ্রিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। সেই মূল্যায়নে আসামিপক্ষের আইনজীবীর ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আইনজীবী সমিতির সিদ্ধান্তের প্রভাব নিহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করা এবং দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো—সবই প্রশংসনীয় ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু কোনো পেশাজীবী সংগঠন যখন সম্মিলিতভাবে ঘোষণা দেয় যেঅভিযুক্তদের পক্ষে কোনো সদস্য আইনি লড়াই করবেন না, তখন বিষয়টি শুধু প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি আইনজীবীর পেশাগত স্বাধীনতা এবং অভিযুক্তের ন্যায্য বিচার পাওয়ার সুযোগ—দুই প্রশ্নইসামনে আনে। কোনো আইনজীবী ব্যক্তিগতভাবে মামলা গ্রহণ না করতে চাইলে সেটি তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্ত হতে পারে। কিন্তু এমন পরিবেশ তৈরি হওয়া উচিত নয়, যেখানে কোনো আইনজীবী পেশাগত বিবেচনায় মামলা নিতেচাইলে সামাজিক বা সংগঠনগত চাপের কারণে তাঁকে সরে যেতে হয়। কোনো অজনপ্রিয় ব্যক্তির পক্ষে দাঁড়ানো মানেই তাঁর অপরাধ সমর্থন করা নয়; বরং অনেক সময় কঠিন ও সংবেদনশীল মামলায় স্বাধীনআইনি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাই আইনের শাসনের প্রকৃত পরীক্ষা। আমরা আসামির পক্ষে নই; আমরা ন্যায়বিচারের পক্ষে এই অবস্থানটি স্পষ্ট করা জরুরি। আমরা চাই প্রকৃত হত্যাকারীরা শাস্তি পাক। আমরা চাই নিহত পরিবারের স্বজনেরা ন্যায়বিচার পান। আমরা চাই পুলিশ সর্বোচ্চ দক্ষতা, সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে তদন্তকরুক। আমরা চাই রাষ্ট্রপক্ষ শক্তিশালী প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করুক এবং আসামিপক্ষ সেই প্রমাণ যাচাই করার সুযোগ পাক। সবশেষে আমরা চাই, আদালত জনরোষ নয়—প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতেসিদ্ধান্ত দিক। আইনজীবী সমাজের দায়িত্ব এখানে আরও বেশি। তাঁরা নিহত পরিবারের পাশে থাকবেন, দ্রুত বিচার চাইবেন এবং প্রকৃত অপরাধীর শাস্তি দাবি করবেন—এটাই প্রত্যাশিত। একই সঙ্গে একজন অভিযুক্তেরন্যায্য বিচার নিশ্চিত করাও আইনের শাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ—এ কথাও তাঁদের মনে রাখতে হবে। রংপুরের চার হত্যাকাণ্ডের সত্য অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। অভিযুক্তরা অপরাধী প্রমাণিত হলে শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আর তাঁরা অপরাধী নাহলে, নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পথও খোলা রাখতে হবে। আদালতের কাজ জনরোষকে বৈধতা দেওয়া নয়; প্রমাণ যাচাই করে সত্য নির্ধারণ করা। একজন অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে শাস্তি না দেওয়াওরাষ্ট্রের সমান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাই চার হত্যার বিচার অবশ্যই চাই। প্রকৃত অপরাধীর শাস্তিও চাই। তবে সেই বিচার হতে হবে স্বচ্ছ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, আদালতের স্বাধীন সিদ্ধান্ত এবং অভিযুক্তের ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকারনিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে। কারণ ন্যায়বিচার শুধু অপরাধীর শাস্তি নয়; ন্যায়বিচার হলো নিরপরাধকে শাস্তি থেকে রক্ষা করার নিশ্চয়তাও। চার হত্যার বিচার চাই—কিন্তু আদালতের রায়ের আগে কোনো মানুষের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় চাই না। – লেখক: শিক্ষার্থী, তৃতীয় বর্ষ , আইন বিভাগ , ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ।