মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খোলার প্রক্রিয়ায় এবারও সিন্ডিকেটের ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যদিও আগের মতো সরাসরি মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকায় নেই, তবে অখ্যাত ও নতুন অনেক এজেন্সিকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যাদের কর্মী পাঠানোর কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নির্বাচিত ২৫টি এজেন্সির মধ্যে ১৭টিরই মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কোনো অভিজ্ঞতা নেই। বাকি ৮টি এজেন্সি মিলে অতীতে মাত্র ১ হাজার ৬১২ জন কর্মী পাঠিয়েছে।
তালিকায় থাকা ‘ভালুকা ওভারসিজ’ নামের একটি এজেন্সির লাইসেন্স পাওয়া গেছে ২০২২ সালে। গত ২৩ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ২৩৫ জন কর্মীর ছাড়পত্র নিলেও এর মধ্যে মালয়েশিয়াগামী কোনো কর্মী ছিল না। অথচ এই প্রতিষ্ঠানটিই এখন মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য নির্বাচিত ২৫টি এজেন্সির তালিকায় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. আবু সোহাগ খান জানিয়েছেন, এর আগে বিভিন্ন এজেন্সির নামে তিনি এক হাজারের বেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছেন। এবার সরাসরি সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি মালয়েশিয়া থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্বাচিত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
অভিবাসন খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এজেন্সি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে মালয়েশিয়ার কর্মী নিয়োগের সফটওয়্যার ‘মাইগ্রাম’ বা এফডব্লিউসিএমএস-এর মালিক প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেট। অভিযোগ রয়েছে, মালয়েশিয়া থেকে আমিন নূর পুরো বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং বাংলাদেশে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন বায়রার সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন ওরফে স্বপন। তাঁরাই নির্ধারণ করেছেন চক্রে কারা থাকবে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ৪২৩টি এজেন্সির একটি তালিকা পাঠিয়েছিল। সেখান থেকে মালয়েশিয়া সরকার ২৫টিকে চূড়ান্ত করেছে এবং পরে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে আরও ৩৩৮টি এজেন্সিকে সহযোগী হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। তবে বায়রার সদস্যরা মনে করছেন, এটি সিন্ডিকেটমুক্ত ব্যবস্থা নয়, বরং পুরোনো ব্যবস্থাকে নতুন কাঠামোয় উপস্থাপনের একটি কৌশল মাত্র।
নতুন এই প্রক্রিয়ায় কর্মীর খরচ অনেক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বায়রা সদস্যদের তথ্যমতে, সিন্ডিকেট ফি হিসেবে সাড়ে ৫ হাজার মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা) এবং প্রতিটি ভিসার চাহিদাপত্রের জন্য ৮-৯ হাজার রিঙ্গিত (২ লাখ ৬৫-৭৫ হাজার টাকা) দিতে হতে পারে। সব মিলিয়ে একজন কর্মীকে ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকার বেশি খরচ করতে হবে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ভেরিটে ইনকরপোরেটেডের গবেষণায় দেখা গেছে, আগেরবার গড়ে মাথাপিছু ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল।
তালিকায় থাকা এজেন্সিগুলোর মধ্যে ‘দি অ্যাংকর কেয়ার গ্লোবাল মাইগ্রেশন অ্যান্ড কনসালট্যান্ট’ সব মিলিয়ে মাত্র ৩৭১ জনের ছাড়পত্র নিয়েছে, যার মধ্যে মালয়েশিয়ায় গেছে মাত্র ১১ জন। আবার ‘বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজ লিমিটেড’ ৭৯৫ জনের ছাড়পত্র নিলেও মালয়েশিয়ায় কোনো কর্মী পাঠানোর রেকর্ড নেই। এছাড়া ‘ইউনাইটেড গালফ সার্ভিসেস’-এর মালিক লায়লা আরজুমান বানুর স্বামী আবদুল হাইয়ের প্রতিষ্ঠান ‘গ্রিনল্যান্ড ওভারসিজ’ আগের চক্রের সদস্য ছিল, যা এখন তাঁদের মেয়ে রেহানা আরজুমান হাই পরিচালনা করছেন।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এজেন্সি যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি করেছে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি। ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী এজেন্সি বাছাইয়ের একক দায়িত্ব মালয়েশিয়া সরকারের ওপর ন্যস্ত ছিল। তবে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান মনে করেন, এই ২৫টি এজেন্সি বাছাইয়ের মাধ্যমে এটিই প্রমাণিত হলো যে, দুই দেশের সরকারের চেয়ে সিন্ডিকেট অনেক বেশি শক্তিশালী।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে প্রথম দফায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়। এরপর ২০১৬ সালে খুলে দেওয়া হলেও দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে তা আবার বন্ধ হয়ে যায়। ২০২২ সালের আগস্টে চক্রের মাধ্যমে বাজারটি পুনরায় চালু হলেও ২০২৪ সালের জুন থেকে তা আবারও বন্ধ ছিল। এখন নতুন করে বাজারটি খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে নেপাল ও বাংলাদেশের জন্য ২৫টি করে এবং ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের জন্য ১০টি করে এজেন্সির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত ২৩ জুলাই বিএমইটির কাছে ৫৭টি এজেন্সির তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছে। এতে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে নারী শ্রমিক পাচারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ৫টি এজেন্সির বিরুদ্ধে তদন্তের কথা বলা হয়েছে। এদিকে, সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বোয়েসেলের মাধ্যমে বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর সুযোগ থাকলেও অতীতে তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়নি। ২০২২ সালেও বোয়েসেল ১০ হাজারের বেশি চাহিদার বিপরীতে মাত্র দেড় হাজারের মতো কর্মী পাঠিয়েছিল।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়াটি এখনো চূড়ান্ত নয় এবং এটি প্রক্রিয়াধীন। দালাল ও প্রতারক চক্র থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রণালয় বলেছে, কোনো এজেন্সির তালিকা বা নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হলে তা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হবে। বায়রার সদ্য সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, যাচাই-বাছাই করা হলে অখ্যাত এজেন্সিগুলো তালিকায় থাকত না। সহযোগী এজেন্সি হিসেবে যাদের নাম দেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকেই আবেদন করেনি, বরং তাদের জোর করে সহযোগী বানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে অপরিচিত এজেন্সির আড়ালে আছে চক্র (সিন্ডিকেট) তৈরির পুরোনো হোতারাই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে এবার মালয়েশিয়া যেতে ৬-৭ লাখ টাকা খরচ করতে হতে পারে কর্মীদের। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নির্বাচিত ২৫টি এজেন্সির প্রায় ২৩ বছরের (জানুয়ারি ২০০৪ থেকে গত ২৩ আগস্ট পর্যন্ত) তথ্য সংগ্রহ করেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমই) এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২৫টির মধ্যে ১৭ এজেন্সির মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কোনো অভিজ্ঞতা নেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যার মধ্যে ৫টি এজেন্সির নামে কর্মী গেছে ১১, ৭৪, ১০০, ১৫০ ও ২০২ জন করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অন্য ৩টি থেকে গেছে ৪৩৬, ৩৩৩ ও ৩০৬ জন করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এটির মালিকানায় রয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমিনুল ইসলাম বিন আবদুল নূর। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে বিদেশে আত্মগোপন করে আছেন স্বপন।