আগে সবুজ, পরে শহর

ছাই ইউয়ে মুক্তা

 

 

২০১৭ সালে প্রথম চারাগাছ রোপণের মাধ্যমে যাত্রা শুরু। আজ সেই উদ্যোগের ফল হিসেবে চীনের সিয়ং’আন নতুন এলাকা ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রায় ৩২ হাজার ২০০ হেক্টর বনভূমি। ‘আগে সবুজায়ন, পরে নগর নির্মাণ’—নীতিকে বাস্তবে রূপ দিয়েই এখানে গড়ে তোলা হচ্ছে এক নতুন পরিবেশবান্ধব নগর, যা ধীরে ধীরে গোটা বিশ্বের সামনে নিজেকে তুলে ধরছে সবুজ নগরীর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে।

চীনের সিয়ং’আন গোষ্ঠীর প্রাকৃতিক নির্মাণ বিনিয়োগ কোম্পানির কর্মী লি সিয়াং ছেং বলেন, সিয়ং’আনে বনায়ন মানে শুধু গর্ত খুঁড়ে গাছ লাগানো নয়। এখানে প্রায়-প্রাকৃতিক বনায়ন এবং বিভিন্ন ধরনের মিশ্র বৃক্ষরোপণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে স্থানীয় প্রজাতিগুলোকে। সবুজ বলয় ও পরিবেশগত করিডোরে সুরক্ষা বন ও প্রাকৃতিক বাস্তুতান্ত্রিক বন তৈরি করে গড়ে তোলা হয়েছে একটি সমতল বন নেটওয়ার্ক।

২০১৮ সালে লি সিয়াং ছেং সিয়ং’আনে এসে চারাগাছ চাষ ও ভূদৃশ্য উন্নয়নের সমন্বয়ে প্রায় ৬৬৬৭ হেক্টর এলাকার একটি বন প্রকল্পে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আগে সবুজ, পরে শহর’ নীতি তাকে বুঝিয়েছে—সবুজ কেবল শহরের সাজসজ্জা নয়, বরং ভবিষ্যতের এই শহরের মূল রঙ হতে চলেছে।

সিয়ং’আন গোষ্ঠীর প্রাকৃতিক কোম্পানির উপ-মহাব্যবস্থাপক স্যু ছেং লি বলেন, সিয়ং’আনের উন্নয়নের মূল ধারণাই হলো সবুজ উন্নয়ন। এখানে শহরকে শুধু গাছ লাগিয়ে সবুজ করা নয়, বরং পুরো শহরকে একটি নীল-সবুজ পরিবেশের মধ্যে গড়ে তোলাই লক্ষ্য।

২০১৭ সাল থেকে সিয়ং’আন নতুন এলাকায় ৩২ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে বনায়ন করা হয়েছে। এতে বনভূমির হার ১১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৫ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে। শুরুতে লাগানো পাইনাস ট্যাবুলিফর্মিস, সোফোরা জাপোনিকা এবং ফ্র্যাক্সিনাস চাইনেনসিস প্রজাতির ২ কোটিরও বেশি গাছ এখন সুবিশাল বনে পরিণত হয়েছে।

‘৩ কিলোমিটার বনভূমির ভেতর, ১ কিলোমিটার বনসীমা এবং ৩০০ মিটার পার্ক’—এই পরিবেশগত পরিকল্পনাও ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে এখানে।

বনবিদ্যায় একটি প্রবাদ আছে—‘রোপণ ৩০ শতাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ ৭০ শতাংশ।’ অর্থাৎ গাছ লাগানোই শেষ নয়, বরং যত্ন নেওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সিয়ং’আন গোষ্ঠীর প্রাকৃতিক কোম্পানির পরিবেশ বিভাগের উপপরিচালক লিউ চি চুন জানান, বনটির রক্ষণাবেক্ষণে গ্রিডভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং সারাদিন টহলব্যবস্থা চালু হয়েছে। বনটিকে পাঁচটি এলাকায় ভাগ করা হয়েছে—রংছেং, আনসিন, সিয়ংপেই, সিয়ংচং ও সিয়ংনান। প্রতিটি এলাকায় ৩ থেকে ৪ জন বনরক্ষী এবং ২০ জনের বেশি গ্রিড সদস্য কাজ করেন।

সিয়ংচং এলাকার ব্যবস্থাপনা কার্যালয়ের কর্মী লিউ চিয়ান হুয়া জানান, একটি স্মার্ট বন ও তৃণভূমি ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সব কাজ সমন্বয় করা হয়।

তিনি বলেন, ‘এই প্ল্যাটফর্মে চারটি নেটওয়ার্ক রয়েছে—কর্মী টহল, অগ্নিনিরোধক বেষ্টনী, ভিডিও নজরদারি এবং জরুরি সরবরাহ ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে বনরক্ষীদের অবস্থান ও বনের পরিস্থিতি রিয়েল টাইমে জানা যায়, ফলে বন ব্যবস্থাপনা আরও ডিজিটাল ও বুদ্ধিমান হয়েছে।’

লিউ চি চুন বলেন, বসন্তকালে দাবানল প্রতিরোধ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ জন্য বিশেষ অগ্নিনির্বাপণ কমান্ড প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। এখানে ১০৫টি উঁচু ক্যামেরা ও ৬০টি স্থল পর্যবেক্ষণ পয়েন্ট ব্যবহার করে ২৪ ঘণ্টার নজরদারি চালু রয়েছে।

এখন বন প্রকল্পের প্রধান বনায়ন কাজ প্রায় শেষ। পরবর্তী লক্ষ্য—গাছ লাগানোর চেয়ে বেশি সবুজ রক্ষা করা। মানুষ ও যন্ত্রের সমন্বয়ে সিয়ং’আন নতুন এলাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনচক্রভিত্তিক বন রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

সিয়ং’আন গোষ্ঠীর শিল্প উন্নয়ন বিভাগের উপপরিচালক লি ছং ছং জানান, এখানে একটি জাতীয় বনভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রদর্শনী কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বনের ভেতরে ওষুধি লতা, ফুল ও ছত্রাকসহ বিভিন্ন অর্থকরী ফসল চাষের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পরীক্ষামূলক রোপণের মাধ্যমে এমন জাত নির্বাচন করা হচ্ছে, যা বনের বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করবে না এবং জমির মূল্যও কমাবে না। সফল পরীক্ষার পর এসব ফসল আশপাশের এলাকাতেও ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

একটি সুস্থ বাস্তুতন্ত্র নগর উন্নয়নে নতুন শক্তি যোগায়। বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, এই বনভূমিতে এখন প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার ঘনমিটার বনসম্পদ রয়েছে এবং এর মোট বাস্তুতন্ত্র সেবামূল্য প্রায় ৩০০ কোটি ইউয়ান। এর মধ্যে রয়েছে জল সংরক্ষণ, মাটি রক্ষা, কার্বন শোষণ, অক্সিজেন নিঃসরণ এবং বায়ু পরিশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সুবিধা।

একটি ছোট চারাগাছ থেকে শুরু করে হাজার হাজার একরের বন—এই সবুজ সমুদ্রই সিয়ং’আন নতুন এলাকার ‘সহস্রাব্দ পরিকল্পনা’-কে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে এবং আধুনিক নগর গঠনে যোগাচ্ছে অবিরাম সবুজ শক্তি।

লেখক: সংবাদকর্মী, সিএমজি বাংলা

chinanature