সময়টা দু’দশকেরও আগের। দক্ষিণ চীনের কুয়াংতোং প্রদেশের তোংকুয়ানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঁচ স্বর্ণকেশী বিদেশি শিশুর ছবি স্থানীয় সংবাদপত্র ইয়াংছেন ইভনিং-এর প্রথম পাতায় জায়গা করে নেয়। সময়ের স্রোতে সেই শিশুদের একজন আবারও আলোচনায়—তবে, এবার একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে, যার পরিচয় গড়ে উঠছিল চীনের মাটিতেই।
২৯ বছরের আদ্রিয়ানা রোমেসভিঙ্কেল, অনলাইনে যিনি ‘অ্যাডি’ নামে পরিচিত। ২০০২ সালে মাত্র ছয় বছর বয়সে পরিবারসহ চীনে আসেন। তখন ছিল এমন এক সময়, যখন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা-ডব্লিউটিওতে যোগ দেওয়ার পর দ্রুত পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছিল চীন। সেই সময়ের ছোট্ট এক বিদেশি শিশু আজ নিজেকে খুঁজে পান এমন এক পরিচয়ে, যার শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত চীনা সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে।
অ্যাডির কাছে চীনে নিজের জায়গা খুঁজে পাওয়ার অভিজ্ঞতাটা নাটকীয় নয় বরং সাধারণ দিনের ছোট ছোট মুহূর্তে গড়ে ওঠা এক আত্মিক সম্পর্ক। তিনি বলেন,‘অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি কখনো হঠাৎ আসে না, বরং সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।’
শৈশবের স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল হয়ে আছে স্কুলের সহপাঠীদের সঙ্গে সকালের শরীরচর্চা। বিদেশি পরিচয় তখন যেন আলাদা কিছু ছিল না—সবার সঙ্গে মিশে যাওয়া ছিল স্বাভাবিক জীবনযাপন। অ্যাডি বলেন, ‘অন্তর্ভুক্তির বিষয়টা এমন যখন তুমি এর মধ্যে থাকো, তখন বুঝতেও পারো না। তুমি শুধু থাকো।’
চীনের মানুষের আন্তরিকতাও তাকে স্পর্শ করেছে গভীরভাবে। তার স্মৃতিতে ভাসে এক প্রবীণ নারীর কথা, যিনি কোন প্রশ্ন ছাড়াই সামনে গরম স্যুপের বাটি এগিয়ে দিয়েছিলেন। ছোট্ট সেই যত্নের মুহূর্তই যেন বাড়ি হয়ে ওঠার অনুভূতিকে আরও গভীর করে তুলে। আজও তিনি সেই এলাকার বাজারে গেলে দোকানিরা তার শৈশবের পছন্দের খাবারের কথা মনে করিয়ে দেন।
অ্যাডির কাছে চীনা হয়ে ওঠা শুধু ভাষা শেখার বিষয় নয়। ক্যান্টনিজ ও ম্যান্ডারিনে সাবলীল হলেও তিনি মনে করেন, ভাষার আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে সংস্কৃতির ভেতরে পারিবারিক আড্ডা, রাতের খাবারের টেবিলের গল্প, কিংবা এমন সব রসিকতায়, যা সময়ের সঙ্গে আত্মস্থ হয়ে যায়। এমনকি কখনো কখনো তার স্বপ্নও আসে ক্যান্টনিজ ভাষায়।
চীনের শিক্ষা ব্যবস্থা ও সামাজিক পরিবেশ বদলে দিয়েছে তার দৃষ্টিভঙ্গিকেও। ব্যক্তি পরিচয়ের চেয়ে সমষ্টিগত মূল্যবোধ, সম্পর্কের গভীরতা এবং সামাজিক সংযোগের গুরুত্ব এসবই তার জীবনবোধের অংশ হয়ে উঠেছে।
বিদেশ সফরে গেলে সাংস্কৃতিক পার্থক্য এখনও অনুভব করেন তরুণী অ্যাডি। যদিও সবকিছু ছাপিয়ে চীনে ফেরার মুহূর্তটি তার কাছে বিশেষ অনুভূতির। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে বাতাস, আর্দ্রতা, শব্দ আর চেনা বিশৃঙ্খলার মধ্যেই খুঁজে যেন প্রশান্তি।
সূত্র: সিএমজি বাংলা