ফয়সল আবদুল্লাহ
পৃথিবীর আগ্নেয়গিরিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হলো সুপারভলকানো, যার একটি অগ্ন্যুৎপাতেই বেরিয়ে আসতে পারে এক হাজার ঘনকিলোমিটারেরও বেশি আগ্নেয় পদার্থ। অনায়াসে চাপা পড়তে পারে আধুনিক যে কোনো বড় শহর।
সম্প্রতি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিজ্ঞানী এই রহস্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তারা দেখিয়েছেন কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ইয়েলোস্টোন ক্যালডেরার নিচে বিশাল ম্যাগমা ব্যবস্থা তৈরি হয় এবং দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন চীনের বিজ্ঞান একাডেমির অধীন ভূতত্ত্ব ও ভূ-পদার্থবিদ্যা ইনস্টিটিউট এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। এটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ।
উত্তর আমেরিকার ইয়েলোস্টোন জাতীয় পার্কে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত সুপারভলকানো ইয়েলোস্টোন ক্যালডেরা। গত ২১ লাখ বছরে এই আগ্নেয়গিরি অন্তত দুটি বিশাল অগ্ন্যুৎপাত ঘটিয়েছে। যার প্রথমটিতে প্রায় আড়াই হাজার ঘনকিলোমিটার লাভা বের হয়েছিল। দ্বিতীয়টিতে বের হয়েছিল এক হাজার ঘনকিলোমিটার লাভা।
আগে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল—সুপারভলকানোর নিচে পৃথিবীর ভূত্বকের ভেতরে বিশাল তরল ম্যাগমার হ্রদ জমে থাকে। গলিত শিলা ধীরে ধীরে জমা হয়ে চাপ বাড়াতে থাকে। একসময় সেই চাপ আশপাশের শিলাস্তর ভেঙে অগ্ন্যুৎপাত ঘটায়।
তবে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের এক দশকের যৌথ গবেষণায় দেখা গেল ম্যাগমা অনেক সময় পুরোপুরি তরল থাকে না। তরল শিলা ও কঠিন স্ফটিকের মিশ্রণ—বা ম্যাগমা মাশ অবস্থায়ও থাকতে পারে। আবার গবেষণায় এও দেখা গেছে, ইয়েলোস্টোনের ম্যাগমা ব্যবস্থা খাড়াভাবে থাকে না। বরং এটি ঢালু হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রসারিত হয়।
গবেষকরা উত্তর-পশ্চিম আমেরিকার ভূগর্ভের একটি ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করে অতীত ও বর্তমান আগ্নেয় কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করেন। এতে দেখা যায়, ইয়েলোস্টোনের ম্যাগমার উৎস আগের ধারণার চেয়েও গভীরে—উত্তর আমেরিকার নর্থ আমেরিকান লিথোস্ফিয়ারের নিচের দিকে, প্রায় ১০০ কিলোমিটার গভীরে।
এই গভীরতায় আংশিক গলিত উষ্ণ শিলা একটি সরু চ্যানেলের মধ্য দিয়ে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়। যখন এই হালকা গলিত পদার্থ উপরের দিকে ওঠে এবং ভূত্বকের পুরু অংশের নিচে প্রবাহিত ম্যান্টলের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, তখন চাপ কমে যায় এবং শিলাস্তর গলে তৈরি হয় নতুন ম্যাগমা।
অন্যদিকে, উত্তর আমেরিকা মহাদেশ ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে সরে যাচ্ছে বলে গভীরের শিলাস্তরের ওপর তৈরি হয় বিপরীতমুখী চাপ। দুই শক্তির টানাপোড়েনে মহাদেশীয় ভূত্বকের নিচে তৈরি হয় একটি তীর্যক পথ। তাতেই উঠে আসে গলিত লাভা।
গবেষণার প্রধান লেখক চীনা বিজ্ঞানী লিউ লিচুন বলেন, এই গবেষণা প্রথমবারের মতো ব্যাখ্যা করেছে কীভাবে সুপারভলকানোর নিচে ম্যাগমা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং সময়ের সঙ্গে বিকশিত হয়। তার ধারণা, এখনকার আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতোই একদিন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত অনুমান করা সম্ভব হতে পারে।
সূত্র: সিএমজি