সবুজ ধানক্ষেত, সবজির বাগান কিংবা ফলের বাগিচা—কৃষকের স্বপ্নই পথ দেখায় সভ্যতাকে। কিন্তু সেই স্বপ্নের মাঝে নীরবে ঢুকে পড়ে এক অদৃশ্য শত্রু—পোকামাকড়, আগাছা ও বিভিন্ন রোগজীবাণু। যুগের পর যুগ মানুষ এসবের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। পৃথিবী যত আধুনিক হয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে—প্রকৃতিকে রক্ষা করে কৃষিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য দরকার আরও টেকসই ও নিরাপদ পদ্ধতি। এই বাস্তবতা থেকেই গুরুত্ব পেয়েছে জৈবিক কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। ইংরেজিতে যাকে বলে বায়োলজিক্যাল পেস্ট কন্ট্রোল। এ পদ্ধতিতে ক্ষতিকর পোকামাকড় বা রোগ দমনে ব্যবহার করা হয় প্রকৃতিরই অন্য জীবকে। আজকের বিশ্বে পরিবেশবান্ধব কৃষির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হয়ে উঠেছে এই জৈবিক কীট নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, যার শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় বহু শতাব্দী আগে—প্রাচীন চীনে।
জৈবিক কীট নিয়ন্ত্রণ হলো এমন এক পদ্ধতি যেখানে ক্ষতিকর পোকামাকড়, আগাছা বা রোগজীবাণু নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হয় নানা ধরনের শিকারি পোকা, পরজীবী, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা ভাইরাস।
এই পদ্ধতির মূল ধারণাটি হলো প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খলের ব্যবহার। সহজ করে বলতে গেলে প্রকৃতিতে প্রতিটি জীবেরই একটি প্রাকৃতিক শত্রু থাকে। সেই শত্রুকে কাজে লাগিয়েই ক্ষতিকর জীবের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
কিছু পোকা অন্য পোকাকে খেয়ে ফেলে, কিছু জীব অন্য জীবের শরীরে পরজীবী হিসেবে বাস করে তাকে ধ্বংস করে আবার কিছু ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক শুধু ক্ষতিকর রোগজীবাণুই দমন করে, ফসলের ক্ষতি না করেই।
জৈবিক বালাইনাশক ব্যবস্থায় সাধারণত তিন ধরনের কৌশল ব্যবহার করা হয়। প্রথমটি হলো ক্লাসিক্যাল বা আমদানি পদ্ধতি।এই পদ্ধতিতে কোনো নির্দিষ্ট পোকামাকড়ের প্রাকৃতিক শত্রুকে অন্য অঞ্চল থেকে এনে সেই পোকা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। যখন কোনো দেশে নতুন কোনো পোকা ছড়িয়ে পড়ে এবং তার প্রাকৃতিক শত্রু সেখানে নেই, তখন এই পদ্ধতি খুব কার্যকর হয়।
এরপর আছে সংখ্যা বৃদ্ধি পদ্ধতি। এতে প্রাকৃতিক শত্রুদের কৃত্রিমভাবে বড় সংখ্যায় উৎপাদন করে মাঠে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তিন নম্বরটি হলো সংরক্ষণ পদ্ধতি। এখানে লক্ষ্য থাকে মাঠে ইতিমধ্যেই থাকা উপকারী জীবগুলিকে সংরক্ষণ করা। যেমন—রাসায়নিক বালাইনাশক কম ব্যবহার, উপকারী পোকাদের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি।
জৈবিক বালাইনাশক ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের জীব কাজ করে।শিকারী জীবগুলো সরাসরি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফেলে। যেমন—লেডিবার্ড পোকা জাবপোকা নামের একটি রস চোষক পোকা খেয়ে ফেলে। ওই জাবপোকা গাছের কচি পাতা, কান্ড, ফুল ও ফলের রস চুষে খেয়ে গাছের মারাত্মক ক্ষতি করে।
পরজীবীরা অন্য পোকামাকড়ের শরীরে ডিম পাড়ে। ডিম থেকে বের হওয়া লার্ভা সেই আশ্রয়দাতা পোকাকে ধীরে ধীরে মেরে ফেলে। ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা ভাইরাস অনেক সময় ক্ষতিকর পোকামাকড়কে সংক্রমিত করে ধ্বংস করে। আবার কিছু জীব ক্ষতিকর জীবের সঙ্গে খাদ্য বা পরিবেশের জন্য প্রতিযোগিতা করে তাদের সংখ্যা কমিয়ে দেয়।
জৈবিক বালাইনাশকের প্রাচীনতম উদাহরণ পাওয়া যায় প্রাচীন চীনে। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকের দিকে একটি চীনা গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায় যে দক্ষিণ চীনের কৃষকেরা তাদের সাইট্রাস বাগানে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ ধরনের পিঁপড়া ব্যবহার করত। ওই পিঁপড়ার নাম উইভার অ্যান্ট। ওই পিঁপড়াগুলো গাছে বাসা বানায় এবং বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর পোকা শিকার করে খায়।
চীনা কৃষকেরা লক্ষ্য করেছিলেন—যেসব বাগানে এই পিঁপড়া থাকে, সেখানে ফলের গাছ পোকামাকড়ে কম আক্রান্ত হয়। তাই তারা বনে থাকা পিঁপড়ার বাসা সংগ্রহ করে গাছে বসিয়ে দিতেন।
এমনকি তারা বাঁশের ছোট সেতু তৈরি করতেন, যাতে পিঁপড়ারা সহজে এক গাছ থেকে আরেক গাছে যেতে পারে।ফলে পুরো বাগানই হয়ে উঠত একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যবস্থা। এটি মানব ইতিহাসে জৈবিক বালাইনাশকের অন্যতম প্রাচীন এবং সুপরিকল্পিত উদাহরণ।
আধুনিক সময়ে এসেও চীন জৈবিক বালাইনাশক গবেষণায় অর্জন করেছে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। দেশটির কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এ কাজে উপকারী ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও উপকারী পোকামাকড় নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করছে।
২০২৪ সালে চীনের কৃষি বিজ্ঞান একাডেমির শেনচেনের কৃষি জিনোমিক্স ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় আবিষ্কৃত হয়েছে একটি বিশেষ প্রোটিন, যা পোকামাকড় তাদের দেহে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করে। গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সেল-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পোকামাকড়ের শরীরে থাকা এক ধরনের প্রোটিন কীটনাশক প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চীনা বিজ্ঞানীরা একটি ক্ষুদ্র অণু-নির্ভর অবরোধকারী শনাক্ত করেছেন, যা এই প্রোটিনের কাজ বন্ধ করতে পারে। ফলে পোকামাকড় আর সহজে বিষাক্ত পদার্থ নিষ্ক্রিয় করতে পারে না, এবং অল্প পরিমাণে ব্যবহৃত কীটনাশকও তখন বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। বিশেষ বিষয় হলো, এই প্রোটিন মানুষ বা উদ্ভিদে নেই; তাই এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি বালাইনাশক পরিবেশের জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হতে পারে।
অন্যদিকে পঙ্গপাল নিয়ন্ত্রণেও জৈবিক পদ্ধতিতে চীনা গবেষকরা সম্প্রতি কিছু সাফল্য পেয়েছেন।
চীনের বিজ্ঞানীরা পঙ্গপালের ঝাঁকবদ্ধ আক্রমণের পেছনের জৈবিক রহস্য উন্মোচন করেছেন। গবেষণাটি নামকরা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেখা গেছে, পঙ্গপালের বিশাল ঝাঁক তৈরির পেছনে মূল ভূমিকা রাখে ৪-ভিনাইলঅ্যানিসোল নামের একটি ফেরোমোন, যা অন্য পঙ্গপালকে একত্রিত হওয়ার সংকেত দেয়।
চীনা বিজ্ঞান একাডেমির ও পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা আবিষ্কার করেছেন, এই ফেরোমোন তৈরির একটি নির্দিষ্ট জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া রয়েছে। উদ্ভিদে থাকা ফেনাইলঅ্যালানিন নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে শুরু হয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ এনজাইমের মাধ্যমে দ্রুত এই ফেরোমোন তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়া বোঝার পর বিজ্ঞানীরা এমন কিছু ক্ষুদ্র অণু-নির্ভর অবরোধকারী তৈরি করেছেন, যা এই এনজাইমগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে পারে। ফলে ৪-ভিনাইলঅ্যানিসোল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় এবং পঙ্গপালের ঝাঁক তৈরিও বন্ধ হতে পারে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এই অবরোধকারী উপাদানগুলো ইঁদুর ও মৌমাছির জন্য বিষাক্ত নয়। অর্থাৎ ভবিষ্যতে নিরাপদ কীট নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি তৈরির সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে এতে।
চীনের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি শুধু গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ নয়; তা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমেও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ভুট্টা ক্ষেতে মারাত্মক ক্ষতি করা ফল আর্মিওয়ার্ম পোকা দমনেও চীনের জৈবিক কীটনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পোকাটি এখন ৭০টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং আফ্রিকার লক্ষ লক্ষ কৃষকের জীবিকা হুমকির মুখে ফেলেছে। এই পোকা দমনে এখন রাসায়নিক বালাইনাশকের পরিবর্তে চীনের দেখানো জৈবিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। কেনিয়ার ভুট্টা ক্ষেতে বিশেষ একটি ব্যাকটেরিয়া দমনে ব্যবহৃত হচ্ছে নিমের তেল, ফেরোমোন ফাঁদ এবং পরজীবী কীট।
প্রকৃতি একমুখী নয়। প্রতিটি জীব অন্য জীবের সঙ্গে সম্পর্কের জালে জড়িয়ে আছে। কখনো শিকারী, কখনো রক্ষক, কখনো ভারসাম্যের প্রহরী। প্রাচীন চীনের কৃষকেরা যখন তাদের সাইট্রাস বাগানে পিঁপড়ার বাসা ঝুলিয়ে দিতেন, তখন কি তারা ভেবেছেন—একদিন সেই ধারণাই আধুনিক কৃষিবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠবে? জৈবিক বালাইনাশক আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ নয়, বরং সহযোগিতা ও ভারসাম্যই রচনা করতে পারে সভ্যতার টেকসই ভবিষ্যত।
সূত্র: সিএমজি