চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা আরও কার্যকর ও টেকসই করতে জ্ঞান বিনিময়, যৌথ গবেষণা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আ স ম রিদওয়ানুর রহমান।
সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ‘চীন-বাংলাদেশ শাসন অভিজ্ঞতা বিনিময় রাউন্ড টেবিল’-এর সমাপনী বক্তব্যে তিনি এ বিষয়ে তিনি তার বক্তব্য তুলে ধরেন।
রিদওয়ানুর রহমান বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের উদ্দেশ্য কোনো একটি দেশের মডেলকে অন্য দেশের জন্য সরাসরি অনুসরণ করা নয়। বরং একে অপরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজ নিজ জাতীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি ও সমাধান খুঁজে বের করাই হওয়া উচিত।’
তিনি বলেন, ‘কোন দেশ আধুনিক বা কোন দেশের মডেল অনুসরণ করা উচিত— এমন প্রশ্নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দুই দেশ একে অপরের অভিজ্ঞতা থেকে কী শিখতে পারে এবং সেই জ্ঞান কীভাবে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিতে রূপান্তর করা যায়।’
সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আজকের আলোচনায় বঙ্গোপসাগরকে শুধু সামুদ্রিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং সমন্বিত সমুদ্র শাসন, টেকসই সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নীল অর্থনীতি ও ব্লু কার্বন উন্নয়নের দৃষ্টিতে দেখার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।’
বঙ্গোপসাগরকে একটি আন্তঃসংযুক্ত পরিবেশগত ও অর্থনৈতিকব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জ্বালানি, দূষণ, নৌপরিবহন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে কার্যকর সমাধান পাওয়া কঠিন। এজন্য সমন্বিত নীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রয়োজন।’
রিদওয়ানুর রহমান আরও বলেন, ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় শুধু দুর্যোগের পর প্রতিক্রিয়া দেখানো যথেষ্ট নয়; বরং আগাম সতর্কতা, তথ্য ও ডেটা ব্যবস্থাপনা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে আগেই ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।’
তার ভাষায়, স্থিতিস্থাপকতা শুধু আকস্মিক ধাক্কা সামলে ওঠার সক্ষমতা নয়; বরং রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি আগাম অনুমান করা, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্য অব্যাহত রাখার সক্ষমতাও এর অংশ।
চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিআইআইএসএস মহাপরিচালক বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জ্ঞান-ভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক করতে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যৌথ গবেষণা, তুলনামূলক অধ্যয়ন এবং প্রমাণভিত্তিক নীতিগত পরামর্শ বাড়ানো প্রয়োজন।’
তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশগত স্থিতিস্থাপকতাকে আলাদা বিষয় হিসেবে না দেখে সমন্বিতভাবে বিবেচনার ওপরও গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের সহযোগিতা বাড়িয়ে স্থানীয় শাসনব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং নাগরিকসেবা আরও কার্যকর করার আহ্বান জানান।
রিদওয়ানুর রহমান বলেন, ‘চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এমন সহযোগিতার দিকে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন, যা শুধু সম্পর্কের পরিধি বাড়াবে না; বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, উন্নত শাসন সক্ষমতা, টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সমাজের সক্ষমতাও বাড়াবে।’
তিনি বলেন, পারস্পরিক শিক্ষা তখনই সবচেয়ে কার্যকর হয়, যখন তা অন্ধ অনুকরণ বা একতরফা নির্দেশনা হয়ে ওঠে না। বরং একে অপরের অভিজ্ঞতা থেকে সম্ভাবনার নতুন পথ খুঁজে নেওয়ার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে।
দিনব্যাপী আলোচনার ভিত্তিতে আরও গভীর গবেষণা সহযোগিতা, প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ, নিয়মিত অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং বাস্তব-ভিত্তিক নীতিগত উদ্যোগ নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন বিআইআইএসএস মহাপরিচালক।
এর আগে রাউন্ডটেবিলে বাংলাদেশ ও চীনের বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা শাসন ও উন্নয়ন অভিজ্ঞতা, নীল অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়ে মতবিনিময় করেন।
সূত্র: সিএমজি