বিশ্ব অর্থনীতিতে বদলে যাচ্ছে চীনের ভূমিকা

 

সম্প্রতি টাইম ম্যাগাজিনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে চীন শুধু ‘বিশ্বের কারখানা’ হিসেবে পরিচিত হবে না; বরং প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা রপ্তানিকারক হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, বিশ্বায়নের নতুন এই ধারায় শুধু চীনের শিল্পব্যবস্থার তৈরি পণ্য অন্যান্য দেশে রপ্তানি করা হবে না, বরং অন্য দেশগুলোও চীনের শিল্পব্যবস্থায় সঞ্চিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ পাবে।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফ্রিকায় চীনা কোম্পানির উপস্থিতি বাড়ার ফলে স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজন এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মন্তব্য করেছে, বিশ্বের বিভিন্ন কারখানায় পণ্য ও উৎপাদন উপকরণ সরবরাহ করা চীনা পণ্যের বৈশ্বিক সম্প্রসারণের নতুন দিক হয়ে উঠেছে। এভাবে চীন ক্রমেই ‘কারখানার কারখানা’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

এসব মূল্যায়ন বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত করে। চীন এখন শুধু পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিকারক নয়; বরং বিভিন্ন দেশের উৎপাদনব্যবস্থাকে সচল রাখা, শিল্পের বিকাশে সহায়তা করা এবং বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অর্থাৎ, বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের ভূমিকা পণ্য উৎপাদনের গণ্ডি পেরিয়ে উৎপাদনব্যবস্থার সংগঠক ও শিল্পায়নের সহায়ক শক্তি হিসেবে বিস্তৃত হচ্ছে।

চীনের শুল্ক প্রশাসনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে দেশটির রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে সরঞ্জাম উৎপাদনশিল্পের অবদান ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ। একই সময়ে মধ্যবর্তী পণ্যের রপ্তানি মোট রপ্তানি মূল্যের অর্ধেকেরও বেশি ছিল। এসব পণ্য বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, চীনের রপ্তানি ও অন্যান্য দেশের উৎপাদন কার্যক্রমের মধ্যে সংযোগ ক্রমেই গভীর হচ্ছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস সংযোজন কারখানা, ইউরোপের গাড়ি উৎপাদনশিল্প কিংবা আফ্রিকার নির্মাণসামগ্রী তৈরির কারখানার দিকে তাকালে এই প্রবণতার বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। এসব শিল্পের অনেক ক্ষেত্রেই চীন থেকে আমদানি করা যন্ত্রাংশ, উৎপাদন সরঞ্জাম ও কাঁচামাল প্রয়োজন হয়।

সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির লি কুয়ান ইউ স্কুল অব পাবলিক পলিসির সহযোগী অধ্যাপক কু ছিং ইয়াংয়ের ভাষায়, চীন ধীরে ধীরে প্রধান পণ্য সরবরাহকারীর অবস্থান থেকে শিল্পায়নের সহায়ক শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে।

মধ্যবর্তী পণ্যের রপ্তানি মূলত উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করে। অন্যদিকে, বিদেশে সরাসরি বিনিয়োগ উৎপাদনব্যবস্থা কীভাবে গড়ে তোলা ও পরিচালনা করা হবে, সেই প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

পণ্য আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে সহজেই; কিন্তু একটি দেশে উৎপাদন কারখানা স্থাপন, আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনায় স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও বাস্তব দক্ষতা প্রয়োজন। এসব সক্ষমতা গড়ে তুলতে অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশি কোম্পানিকে সংশ্লিষ্ট দেশে সরাসরি ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করতে হয়। ফলে বিদেশে চীনা কোম্পানির বিনিয়োগ শুধু পুঁজি স্থানান্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে যুক্ত হয় উৎপাদনপ্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনাগত অভিজ্ঞতা এবং শিল্প পরিচালনার দক্ষতা বিনিময়ের সুযোগ।

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটির বহির্মুখী প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (ওডিআই) পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২৮ দশমিক ৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ চীনের মোট বহির্মুখী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এ ক্ষেত্রে টানা ৯ বছর ধরে চীন বিশ্বের শীর্ষ তিন দেশের মধ্যে রয়েছে। বিশ্বজুড়ে চীনা কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণের ফলে বিভিন্ন দেশের উৎপাদনব্যবস্থার বিন্যাসে পরিবর্তন আসছে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন শিল্প গড়ে তোলার সুযোগও তৈরি হচ্ছে।

প্রযুক্তিগত বিপ্লব ও শিল্প রূপান্তরের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের এই পরিবর্তিত ভূমিকা উৎপাদন সক্ষমতার বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাজনের বিবর্তনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। বুদ্ধিমান উৎপাদনব্যবস্থা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং আধুনিক সরবরাহব্যবস্থা এখন উৎপাদনপ্রযুক্তি, জ্ঞান ও ব্যবস্থাপনাগত অভিজ্ঞতা এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ বাড়িয়েছে। ফলে কোনো একটি দেশের শিল্পায়ন এখন শুধু নিজস্ব সম্পদ ও অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল নয়; আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তিগত সংযোগও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এই পরিবর্তনের ফলে শিল্পায়নের সুযোগ বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো চীনা বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উৎপাদন-অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজেদের শিল্পভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে। এর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে। অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের সুফল তখন শুধু কয়েকটি উন্নত অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও বেশি উৎপাদক ও ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা পায়।

তবে এই পরিবর্তনের মধ্যেই কিছু দেশ তথাকথিত অর্থনৈতিক প্রভাব ও চাপ মোকাবিলার যুক্তি দেখিয়ে বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা তৈরির চেষ্টা করছে। শুল্ক আরোপ ও অন্যান্য বিধিনিষেধ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে।

পণ্যের উৎপত্তি বা পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রও বদলে যেতে পারে। কিন্তু এ ধরনের পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতার মৌলিক বাস্তবতা দূর করতে পারে না।

একইভাবে, শুধু বাণিজ্যপ্রতিবন্ধকতা তৈরি করে নিজস্ব উৎপাদনব্যবস্থার দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠাও সম্ভব নয়। বরং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলছে, উৎপাদনশীলতার বিকাশকে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখা কঠিন। টেকসই ও অভিন্ন উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন পরিবর্তনকে বুঝতে পারা, নতুন প্রযুক্তি ও উৎপাদনপদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিসর বাড়ানো। একই সঙ্গে আরও বেশি দেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে, যাতে তারা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুফল ভাগ করে নিতে পারে।

চীনের ভূমিকা এখন শুধু বিশ্বের জন্য পণ্য তৈরি করা নয়; বরং বিভিন্ন দেশের শিল্পায়ন, উৎপাদনব্যবস্থা এবং সরবরাহ নেটওয়ার্কের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়া। ‘বিশ্বের কারখানা’ থেকে ‘কারখানার কারখানা’ হয়ে ওঠার পথে চীনের অগ্রযাত্রা বিশ্ব অর্থনীতির এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।

সূত্র: সিএমজি