চিনিকে ‘না’ বলছে চীনা তরুণরা

ফয়সল আবদুল্লাহ

চীনে তরুণরা এখন কম চিনিযুক্ত খাবারে ঝুঁকছে। স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, ত্বকের যত্ন এবং বার্ধক্যের গতি কমানোর লক্ষ্যে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনছে তারা।

চেচিয়াং প্রদেশের হাংচৌর ৩০ বছর বয়সী ফ্রিল্যান্সার চাং হুছুয়ান জানান, অতিরিক্ত চিনি শরীরের জন্য ক্ষতিকর—এমন তথ্য জানার পর তিনি আট বছর ধরে চিনি কমাতে শুরু করেন। মাঝে মাঝে রক্তে শর্করার ওঠানামা বুঝতে ‘কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটর’ ব্যবহার করেছেন তিনি।

চাং বললেন, ‘চিনি কেন কমানো প্রয়োজন, তা নিয়ে কৌতুহলী ছিলাম। অতিরিক্ত চিনির অনেক নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে জানতে পারলাম। এতেই কম চিনিযুক্ত জীবনধারায় উৎসাহিত হই।’

চাং আরও বলেন, ‘শানসি ভ্রমণের সময় আবিষ্কার করেছি, সেখানকার নুডলস সুস্বাদু হলেও, তা রক্তে শর্করা বাড়িয়ে দেয়। হাতে তৈরি নুডলস এবং বাজরার কেক খাওয়ার পর আমার ঘুম ঘুম ভাব হচ্ছিল। আমি জোরালোভাবে সুপারিশ করছি যে, যেসব অঞ্চল নুডলসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, সেখানকার রেস্তোরাঁগুলো যেন খাবারে আরও বেশি সবজি যোগ করে।’

তার মতে, চিনি কমানো মানে কঠোর নিয়ম মানা নয়; বরং ভারসাম্য বজায় রাখা। তিনি নিয়মিত খাবারই খান, তবে সবজি ও মাংস আগে এবং ভাত পরে খান, পাশাপাশি চিনিযুক্ত পানীয় বাদ দিয়ে হালকা চা পান করেন।

একইভাবে হপেই প্রদেশের ২৮ বছর বয়সী কর্মী সু রুওসিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখা পড়ে চিনি কমানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মনে করেন, শুধু দামী প্রসাধনী নয়, ভেতর থেকে সুস্থ হওয়াই আসল। এখন তিনি খাবারের উপাদান দেখে চিনি এড়িয়ে চলেন এবং স্বাদেও পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন।

রুওসিন জানালেন, ‘২৫ বছর বয়স হওয়ার পর আমার প্রথম পদক্ষেপ ছিল চিনি খাওয়া বন্ধ করা। আমি ভাবতাম দামী স্কিনকেয়ার পণ্য কেনাই এর সমাধান, পরে বুঝতে পারলাম এটা কেবলই বাহ্যিক। আসল পরিবর্তন ভেতর থেকে আসতে হবে।’

রুওসিনের জন্য চিনি কমানোর সিদ্ধান্তটি কেবল মিষ্টি এড়িয়ে চলা নয়, বরং স্বাদের পছন্দ পরিবর্তন করারও বিষয়। তিনি জানালেন, চিনি গ্রহণের মাত্রা কমানোর পর তার স্বাদের সেন্সরগুলো আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। যে খাবারগুলো একসময় স্বাদহীন মনে হতো, সেগুলোও তার কাছে মিষ্টি লাগতে শুরু করে।

তিনি বলেন, চিনি খেলে তার মনে হতো যেন তাকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কোনো একদিন ছয়টি আইসক্রিম খাওয়ার পর পরদিন তার আবার ততটুকুই খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা হতো। আর এমন নির্ভরশীলতার বিষয়টি বুঝতে পেরেই চিনি ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

এখন তার সকাল ও সন্ধ্যার নাশতার তালিকায় থাকে ভুট্টা ও মিষ্টি আলু। এ ছাড়া অনলাইন থেকে হোল গ্রেইন ব্রেড ও চিকেন ব্রেস্টের মতো খাবারও নিচ্ছেন তিনি।

বেইজিংয়ের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী জানান, তার সহপাঠীদের মধ্যেও ফিটনেস ও স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। নিয়মিত ব্যায়াম ও পরিষ্কার খাদ্যাভ্যাসে তার শক্তি বেড়েছে এবং শরীরের চর্বির হার কমেছে।

২০২৪ সালে প্রকাশিত চীনের খাদ্য তথ্য কেন্দ্রের জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭০ শতাংশ ভোক্তা চিনি কমাতে আগ্রহী।

জরিপে ৮০ শতাংশ ভোক্তা বলেছেন, ইনস্ট্যান্ট খাবার ও পানীয়তে চিনির পরিমাণ কমানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।

বেইজিংয়ের ২০ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী চুও ইরান লক্ষ্য করেছেন, ফিটনেস ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে নিজেদের সুস্থতা উন্নত করার অভিন্ন লক্ষ্য দ্বারা চালিত হয়ে তার অনেক সহপাঠীই স্বাস্থ্যকর জীবনধারা গ্রহণ করছে।

তিনি উল্লেখ করেন, প্রবণতাটি হয়তো এমন কারও মাধ্যমে শুরু হয়েছিল, যার দৃশ্যমান উন্নতিই মূলত অন্যদের অনুপ্রাণিত করেছিল।

চুওর জন্য, মোড় ঘোরানো মুহূর্তটি এসেছিল তার দ্বিতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারে। তিনি বলেন, ‘একদিন ব্যায়াম শুরুর পর বুঝতে পারলাম, অস্বাস্থ্যকর খাবার খেলে আমার সমস্ত কঠোর পরিশ্রম বৃথা যাবে।’ আর ওই অনুভূতিটাই তাকে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে মনোযোগ দিতে উৎসাহিত করে।

চুও বলেন, আগে শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা এবং বাধ্যতামূলক আড়াই কিলোমিটার দৌড়ের সময় বেশ হাঁপিয়ে যেতে হতো এবং ঘন ঘন বিরতির প্রয়োজন পড়ত। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত ব্যায়ামে মনোযোগ দেওয়ার পর চুও তার কর্মশক্তি এবং সার্বিক স্বাস্থ্যের উল্লেখযোগ্য উন্নতি লক্ষ্য করেছেন।

চিনি কমানো এখন চীনা তরুণদের কাছে কেবল খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন নয়, বরং একটি সচেতন ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের প্রতীক। স্বাস্থ্য, সৌন্দর্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণ—এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠছে তাদের নতুন জীবনধারা।

তথ্য ও ছবি: সিএমজি

chinahealthhealth and lifestylelifestyle