কোথাও সান্ত্বনা নেই পৃথিবীতে আজ

শায়েখ শোয়েব

কোথাও সান্ত্বনা নেই পৃথিবীতে আজ, বহুদিন থেকে শান্তি নেই’—পৃথিবীতে যে শান্তি নেই সে কথা কবি জীবনানন্দ দাশ অনেক আগেই লিখে গেছেন তার কবিতায়। সত্যিই তো পৃথিবীতে কখনো পূর্ণ শান্তি ছিল না। আসবে এটাও নিশ্চিত করে কারো পক্ষেই বলা সম্ভব নয়। পূর্ণ শান্তির ধারণাটাই যেন ‘ভুল চাওয়া’। পূর্ণতার ধারণাটাই কী তাহলে ভুল! পৃথিবীর দিকে তাকালে শান্তি প্রতিষ্ঠা যেন এক অযৌক্তিক আশা। পৃথিবী একটা জটিল সিস্টেম। জাতে, সংস্কৃতিতে, ভূপ্রকৃতিতে ভিন্নতা আছে। মানুষে মানুষে ভিন্নতা আছে। দেশের, সমাজের এই ভিন্নতা,

ক্ষমতার প্রভাব বলয় সৃষ্টি ও তা বজায় রাখতে গিয়ে শান্তি এখন আর কোথাও নেই। রোবটদের সমাজ হলেই হয়তো পূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যাবে।

তার পরও বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন কাজ করে চলেছে। বৈশ্বিক পর্যায়েও জাতিসংঘ দেশে শান্তি ও সাম্য প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। এর বাইরে গড়ে উঠেছে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জোট। আজ আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস বা বিশ্ব শান্তি দিবস। সারা বিশ্বে দিবসটি নানা আয়োজনে পালিত হয়ে আসছে।

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের (World Peace Day) প্রতিপাদ্য বা থিম হলো: United Nations নির্ধারিত “Invest in Peace – For Everyone, Everywhere, Every Day” (বাংলায়: শান্তিতে বিনিয়োগ করুন – সবার জন্য, সর্বত্র, প্রতিদিন)।

জাতিসংঘের মতে, সত্যিকারের শান্তি কেবল হিংসার অনুপস্থিতিই নয়, বরং এমন একটি অবস্থার, এমন

একটি সমাজের সৃষ্টি করে যেখানে সকল নাগরিক বা বাসিন্দা মনে করেন যে তাঁরা উন্নতি করতে পারবেন। এমন একটি বিশ্ব গড়ে তোলার ডাক দেওয়া হয় যেখানে কারও সঙ্গে কোনওরকম অত্যাচার না করা হয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমান আচরণ করা হয়। ১৯৮১ সালে জাতিসঙ্ঘ এই দিনটির ঘোষণা করে। মানবতার জন্য, সমস্ত পার্থক্য সরিয়ে রেখে শান্তি প্রতিশ্রুতি গড়তে এবং শান্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চেয়ে বিশ্বব্যাপী একটি দিন স্থির করা হয়। বিশ্ব শান্তি দিবস (World Peace Day) নামেও পরিচিত এই দিনটি, এটি পরে ২০০১ সালে ২১ সেপ্টেম্বর দিনটিতে আনুষ্ঠানিক হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল। তার আগে পর্যন্ত, এটি সেপ্টেম্বরের তৃতীয় মঙ্গলবার বার্ষিক সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে পালিত হয়েছিল। দিনটিকে মনে করার জন্য, নিউইয়র্কে জাতিসঙ্ঘের সদর দফতরে ‘শান্তি ঘণ্টা’ (Peace Bell) বাজানো হয়। শান্তি ঘণ্টাটি ১৯৫৪ সালের জুনে জাতিসঙ্ঘের জাপান অ্যাসোসিয়েশন দিয়েছিল। জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্র, পোপ এবং ৬০টিরও বেশি শিশুদের দান করা মুদ্রা এবং পদক থেকে ঢালাই করা হয়েছিল এই শান্তি ঘণ্টা। বেল টাওয়ারটি ‘হানামিডো’

(ফুল দিয়ে সজ্জিত একটি ছোট মন্দির) এর আদলে তৈরি করা হয়েছিল যা গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থানের প্রতীক।

শান্তি ঘণ্টাটি বছরে দুবার বাজানো হয়: বসন্তের প্রথম দিনে এবং ২১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস উদযাপন করতে। শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক দিবসে, জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব, স্থায়ী মিশনের প্রতিনিধি এবং জাতিসঙ্ঘ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বিশ্ব শান্তির জন্য প্রার্থনা করার জন্য ঘণ্টা বাজিয়ে দেন।

শান্তির অন্বেষা সর্বজনীন ও সর্বকালীন; কিন্তু তবু সময় সময়ে কিছু মানুষের অবিমৃষ্যকারিতায় মানবিক শান্তি-স্বস্তি বিপন্ন হয়। এমন না হলে জীবনানন্দ দাস কেন লিখবেন, ‘মানুষ না ভেবে কাজ করে যায় শুধু/ভয়ঙ্করভাবে অনায়াসে।’ তবে কবি যদিও বলেন, মানুষের ভাবনারহিত অনায়াস-কর্মকাণ্ডের পরিণতিতে বিঘ্নিত শান্তি মানুষকে বিপর্যস্ত করে, তবু আসলে কিছু মানুষের দুর্মতিজনিত চিন্তা ও কর্ম মানবিক অশান্তির কারণ।

চেঙ্গিস, হালাকু বা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবাজরা সংখ্যায় নগণ্য হলেও তাঁদের বিধ্বংসী শক্তির ব্যাপকতা বিশ্ববাসীর অজানা নয়। অবশ্য মানবসৃষ্ট অশান্তির বিরুদ্ধে এবং শান্তির সপক্ষে কিছু মানুষের চিন্তা-লেখনী-কর্মোদ্যোগ ক্রিয়াশীল থাকার দৃষ্টান্তও বিরল নয়; (চিন্তাচেতনার বিচারে) পশ্চিম দুনিয়ার জেরেমি বেন্থাম (১৭৪৮-১৮৩২) এবং ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪-১৮০৪) এর অবদান অনস্বীকার্য। বেন্থাম ছিলেন ইংরেজ দার্শনিক; আর কান্ট জার্মান দার্শনিক। এ দুজনের দার্শনিকসত্তার অভিন্নতা ছিল শান্তির অন্বেষা। বেন্থামের বই এ প্ল্যান ফর ইউনিভার্সাল অ্যান্ড পারপেচুয়াল পিস (১৭৭৭); এবং কান্টের বই পারপেচুয়াল পিস (১৭৯৫) সংঘাতপ্রবণ ইউরোপের সামনে শান্তির বিকল্প হাজির করেছিল। তবে ইউরোপের কাছে এ দুজনের পথনির্দেশ বাস্তবতার নিরিখে স্বপ্নবিলাসের বেশি কিছু মনে হয়নি। ফলে উধাও শান্তির ইউরোপ অবলীলাক্রমে দুটি বীভৎস ও মর্মান্তিক মহাসমরের কাছে সমর্পিত হয়েছিল।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ, হানাহানির পরিপ্রেক্ষিতে আমার মনে ইদানীং প্রশ্ন জাগছে, পৃথিবীতে শান্তি গবেষক (peace researcher) বা শান্তিবাদীরা কি তাদের গুরুত্ব ও প্রভাব হারাচ্ছেন? বিগত কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি শাখা হিসেবে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব সংঘাত নিরসনে শান্তি গবেষণা আমাদের আলোড়িত করেছিল। শান্তিবাদীরা তাদের লেখার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে রাষ্ট্রের মধ্যস্থিত বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় দ্বন্দ্ব নিরসনে জোর দিতেন। এর মাধ্যমে শান্তিকামী মানুষদের প্রভাবিত করতে চাইতেন।

সেসব দিন বোধহয় এখন গত হয়েছে। উগ্র জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদী রাজনীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞদের লেখালেখিকে এখন প্রভাবিত করছে। দেশে দেশে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় বলা যায় বাজপাখি বা hawk-দের উত্থান বিপদে ফেলেছে শান্তিবাদী ঘুঘু বা dove-দের। লেখালেখির রাজনীতিতেও তারা ক্রমান্বয়ে হয়ে পড়ছেন ব্রাত্য!

শান্তি গবেষকদের পুরোধা হিসেবে সম্প্রতি নরওয়েজিয়ান বংশোদ্ভূত সমাজবিজ্ঞানী, গণিতবিদ

জোহান গালতুং-এর কথা বলতে হয়। দ্বন্দ্ব ও সংঘাত নিরসনে তার ধারণা, তত্ত্ব এবং পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে প্রায় দেড়শ’র বেশি সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার অভিজ্ঞতায় শান্তিকামীরা হয়েছিলেন আশান্বিত। তার ধারণার অনুসারীরা পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন নামে নতুন বিভাগ খুলেছেন। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও এই নামে একটি বিভাগ আছে।

শান্তিবাদীরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত নিরসনে কথা বলেন এবং সব পক্ষের জন্যই একটি win-win situation তৈরির ওপর জোর দেন। আমরা দেখছি বিশ্বব্যাপী দ্বন্দ্বের মূল কারণ হচ্ছে জাতিগত, ধর্মীয়, গোষ্ঠীগত বা বর্ণগত বিদ্বেষ। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বিতরণের মূল কারণ স্রেফ তাদের ধর্ম। মাত্র কয়েক বছর আগে আমরা তাই দেখেছি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে সংলাপ বা dialogue among civilizations-এর ওপর গুরুত্বারোপ। স্যামুয়েল পি হান্টিংটনের clash of civilizations তত্ত্বের বিপরীতে—যেখানে তিনি বিভিন্ন সভ্যতার সংঘাতের আশঙ্কা

দেখেছিলেন, শান্তিবাদীরা বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু সেসব দিনও এখন গত হয়েছে।

যে কথা না বললেই নয়, শান্তিবাদীরা সংঘর্ষের উৎপত্তি খুঁজতে গিয়ে দেখেছেন বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে জাতিগত বিদ্বেষের সূচনা হয়, কিন্তু শিশু বয়সের টেক্সট বুক বা পাঠ্যবই থেকে। তাই তারা স্কুলের পাঠ্যবই থেকেই জাতিগত ও সম্প্রদায়গত শান্তি ও সহিষ্ণুতার শিক্ষা দিতে বলেন।  

মিডিয়ার কথা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শান্তির বার্তা ছড়ানোর পরিবর্তে মিডিয়া তো এখন স্ব স্ব দেশের extension of foreign ministry বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বর্ধিতাংশ হিসেবে কাজ করে। আমরা দেখেছি কীভাবে পশ্চিমা মিডিয়া ইরাক যুদ্ধকে বৈধতা দিয়েছিল। এ শিক্ষা থেকে আমরা বলতে পারি, বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় শান্তি সাংবাদিকতা বা peace journalism এর কোনও বিকল্প

নেই।

এতক্ষণ যা বললাম এর অর্থ এই নয়, বিশ্বে শান্তিবাদীদের আর কোনও ভবিষ্যৎ নেই। অবশ্যই আছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আছে। যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মিডিয়া দেখি বা সোশ্যাল মিডিয়ার সাধারণ মানুষের বক্তব্য দেখি, তখন টের পাই পৃথিবীতে পারস্পরিক ঘৃণার পাহাড় কীভাবে বাড়ছে। কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তো এ পৃথিবীকে রক্ষা করতে হবে। গবেষক, সাংবাদিক, লেখকদের তাই শান্তির বার্তা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে, যা ধীরে ধীরে রাজনীতিবিদ বা নীতিনির্ধারকদের বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করবে।

শান্তি গবেষণার একজন অনুরক্ত হিসেবে আমিও সশ্রদ্ধচিত্তে সুদৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারণ করতে চাই,

বিদগ্ধজনের কাছে স্বীকৃত ও সর্বজনগ্রাহ্য সত্য হলো, বেন্থাম ও কান্টের শান্তি-স্বপ্ন অমর। কারণ এমন স্বপ্নের মৃত্যু নেই; কমতি নেই এমন স্বপ্নের স্বাপ্নিকের। তাই পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষের মুখপাত্র হয়ে জন লেননের “ইমাজিন” এমন একটি ইউটোপিয়াকে আমন্ত্রণ জানায়

যেখানে সম্পদ বা লোভ নেই, সেই লড়াই ছাড়াই যা তিনি বিশ্বাস করতেন যে জাতি এবং ধর্ম তাদের অস্তিত্বের মাধ্যমে প্রচারিত হয়।

Imagine there’s no countries

It isn’t hard to do

Nothing to kill or die for

And no religion, too

Imagine all the people

Living life in peace

মাটিনিউজে লিখুন: matinewsbd@gmail.com

কলামমতামতশায়েখ শোয়েব