নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের প্রয়োজন নেই, দরকার সংলাপ ও সহযোগিতা

ফয়সল আবদুল্লাহ

বিশ্ব রাজনীতিতে অস্থিরতার অনেক কারণ থাকতে পারে। সেটা যে সব সময় বড় শক্তিধর রাষ্ট্রের সম্পর্কের পরিবর্তন থেকে জন্ম নেয়, এমনটা নয়। তবে বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে স্থিতিশীল ও সুস্থ সম্পর্ক কিন্তু আন্তর্জাতিক অস্থিরতা দূর করতে পারে। কারণ তাদের পারস্পরিকভাবে জড়িত অর্থনৈতিক সম্পর্কটা গড়ে দেয় বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার মজবুত ভিত্তি।

এমন প্রেক্ষাপটে বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর স্বভাবতই গোটা বিশ্বের নজর ব্যাপক মনোযোগ কেড়েছে। চীন–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে সঠিক পথে পরিচালিত করতে রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ের কূটনীতিই অপরিহার্য। কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কুও চিয়াখুন বুধবার বলেছেন, চীন ট্রাম্পের এই সফরকে স্বাগত জানায়। সফরকালে দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কসহ বৈশ্বিক শান্তি ও উন্নয়ন নিয়ে গভীর মতবিনিময় করবেন।

বুধবার দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত চীন–যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক পরামর্শ বৈঠকেও সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষের মতপার্থক্য ব্যবস্থাপনার অঙ্গীকার তুলে ধরেছে। পারস্পরিক উদ্বেগের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিষয়, পাশাপাশি বাস্তবমুখী সহযোগিতা আরও বিস্তারের বিষয়ে খোলামেলা, গভীর ও গঠনমূলক মতবিনিময়ে ছিল আগের ছয় দফা আলোচনার ধারাবাহিকতা।

অনেক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এমন বাস্তববাদী মনোভাবই কিন্তু গত কয়েক বছরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব সহযোগিতাকে প্রাণবন্ত ও সম্ভাবনাময় রেখেছে। এমনকি কিছু পক্ষ এই সহযোগিতাকে ব্যাহত করার চেষ্টা করলেও কার্যত সেইসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

ট্রাম্পের চীন সফরে তার নেতৃত্বাধীন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলও আছেন। সেমিকন্ডাক্টর, অর্থনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন কৌশলগত খাতের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির ব্যবসায়িক নেতারা রয়েছেন। এতে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার যে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী সমাজ চীনের সঙ্গে পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা সম্প্রসারণে আগ্রহী।

চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২৬–৩০) সময়কাল ও এর পরবর্তী সময়েও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্য, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন, উন্নত উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতাসহ নানা ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।

সভ্যতার অভিজ্ঞতায় এটি স্পষ্ট যে, সহযোগিতা থেকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশই লাভবান হয়, সংঘাত ডেকে আনে ক্ষতি। তাই কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ খাত, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শাসন ব্যবস্থায় সংলাপ ও সহযোগিতা জোরদার করা এখন বেশ জরুরি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শাসনব্যবস্থা যাতে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে ব্যবহৃত হয় সে লক্ষ্যে বেইজিংয়ের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতি চীনের প্রতিশ্রুতিকেই প্রতিফলিত করে।

চীনের সহযোগিতামূলক মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছে তাদের চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগে—বৈশ্বিক উন্নয়ন, বৈশ্বিক নিরাপত্তা, বৈশ্বিক সভ্যতা ও বৈশ্বিক শাসন উদ্যোগ।

এই উদ্যোগগুলো নানা ক্ষেত্রে চীনের আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার ভিত্তি গড়ে তুলছে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় শক্তির কূটনীতিও আছে।

চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শান্তি, উন্নয়ন, ন্যায়, সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন।

চীন কোনো প্রভাব বলয়, মতাদর্শিক মুখোমুখি অবস্থান বা গোষ্ঠীগত রাজনীতি চায় না। আবার এটাও ঠিক যে, পৃথিবী আজ যে গুরুতর বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি, কোনো দেশই সেগুলো একা মোকাবিলা করতে পারবে না। সংঘাত বা বিচ্ছিন্নতাবাদের মাধ্যমেও নিরাপত্তা অর্জন করা যায় না।

চীন বহুপাক্ষিকতা এবং উন্মুক্ত বিশ্ব অর্থনীতির একনিষ্ঠ সমর্থক। এ ধারণা শুধু চীনের কূটনৈতিক চর্চাতেই নয়, বরং এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মৌলিক নীতিতেই আছে। সার্বভৌম সমতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতাই সভ্যতার এগিয়ে চলার ভিত্তি।

বিশ্বের এখন আর নতুন করে কোনো স্নায়ুযুদ্ধের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন বেশি বেশি সংলাপ ও সহযোগিতা, যা দায়িত্বশীল বড় শক্তির কূটনীতির ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে।

সুতরাং, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র যখন একসঙ্গে শান্তি, উন্নয়ন এবং পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা এগিয়ে নেয়, তখন তা শুধু দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থই রক্ষা করে না, বরং সমগ্র বিশ্বের স্বার্থকেও এগিয়ে নেয়।

এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের চীন সফরে এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে যে, মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও চীন ও যুক্তরাষ্ট্র খোলামেলা যোগাযোগ বজায় রাখতে পারে, বাস্তব সহযোগিতা সম্প্রসারণ করতে পারে এবং বৈশ্বিক শান্তি ও উন্নয়নের দায়িত্ব যৌথভাবে পালন করতে পারে। মোটের ওপর, বিশ্ব পরিস্থিতি যত অস্থির হয়ে উঠছে, বড় শক্তিগুলোর এখন তত বেশি একসঙ্গে কাজ করা দরকার।

সিএমজি সম্পাদকীয়

chinacolumnop-edopinion