শাংহাই আমদানি মেলায় বাংলাদেশের জন্য যত সম্ভাবনা

ইয়াং ওয়েইমিং স্বর্ণা

 

ইয়াং ওয়েইমিন স্বর্ণা

আট বছর আগের কথা। পাটের তৈরি হাতব্যাগের নমুনা ট্রলিতে ভরে নুরুস সাফা ও তাহেরা আক্তার দম্পতি উড়াল দিয়েছিলেন শাংহাইয়ের উদ্দেশে। তখন তাদের কোম্পানিতে কর্মী ছিলেন মাত্র দশজন। বাংলাদেশের পাটের তৈরি হস্তশিল্প এর আগে কখনও চীনের কোনো প্রদর্শনীতে যায়নি।

এরপর পেরিয়েছে আট বছর। এখন সেই দম্পতির তৈরি পাটের পণ্য বিক্রি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানে। ঢাকার বাইরের হাজার হাজার গ্রামীণ নারীর জীবিকাও যুক্ত হয়েছে তাদের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায়।

বাংলাদেশে পাটের এই সাফল্যের গল্পের একটি নেতিবাচক দিক হলো, গল্পটা আমাদের চিন্তাকে পাটের গণ্ডিতেই আটকে দেয়। মনে হয়, চীন আন্তর্জাতিক আমদানি মেলায় বাংলাদেশের পরিচয় বুঝি পাটজাত পণ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনা আছে আরও অনেক কিছুতে।

৫ থেকে ১০ নভেম্বর শাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে নবম চীন আন্তর্জাতিক আমদানি মেলা। এতে ১৬২টি দেশ, অঞ্চল ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং ৪ হাজার ১৪২টি বিদেশি প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। মেলার প্রদর্শনী এলাকা প্রথমবারের মতো ছাড়িয়ে গেছে ৪৪ লাখ বর্গমিটার।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বলেছেন, চীন আন্তর্জাতিক আমদানি মেলার আয়োজনের লক্ষ্য হলো উন্মুক্তকরণ আরও বাড়ানো এবং চীনের বিশাল বাজারকে বিশ্বের জন্য বড় সুযোগে পরিণত করা। বাংলাদেশের জন্য এই বক্তব্যের তাৎপর্য শুধু পাটের হাতব্যাগে আটকে থাকার কথা নয়। মেলার স্টলে পাটের পাশাপাশি আরও অনেক কিছুই স্থান পেতে পারে।

বাংলাদেশের সব পণ্যে শূন্য-শুল্ক সুবিধা, বিনামূল্যে স্টল বরাদ্দ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য ই-বাণিজ্যভিত্তিক জাতীয় প্যাভিলিয়নের সুযোগ—সব মিলিয়ে বাজারে প্রবেশের পথ অনেকটাই প্রশস্ত এখন। প্রশ্ন হলো, পাটের বাইরে বাংলাদেশের আর কী কী পণ্য শাংহাইয়ের এই বিশাল মেলায় তুলে ধরা যায়?

বাধা কমায় আমদানি মেলা

আমদানি মেলাকে কেবল বড় একটি প্রদর্শনী বা বিক্রয়মেলা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা কঠিন। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য চীনের বাজারে প্রবেশের প্রাথমিক ব্যয় কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে মেলাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশের পণ্যে একতরফাভাবে দেওয়া ১০০ শতাংশ শুল্কমুক্ত সুবিধা বাজারে প্রবেশের খরচ কমিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বিনামূল্যে স্টল বরাদ্দের উদ্যোগ মেলায় অংশ নেওয়ার ব্যয় কমিয়েছে। অন্যদিকে, বড় ই-বাণিজ্য প্ল্যাটফর্মগুলোতে জাতীয় প্যাভিলিয়ন চালুর ফলে মেলা শেষ হওয়ার পরও অনলাইনে পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, এই মেলার মাধ্যমে স্টল থেকে শুরু করে সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর একটি পথ তৈরি হচ্ছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং আমদানি মেলার চারটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন। এগুলো হলো আন্তর্জাতিক ক্রয়, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং উন্মুক্ত সহযোগিতা। বাংলাদেশের জন্য শেষের দুটি ক্ষেত্র বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

একটি বড় ক্রয়াদেশ কোনো প্রতিষ্ঠানের স্বল্পমেয়াদি আয় ও নগদ প্রবাহে পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু চীনের কাপড় সরবরাহকারী, নকশা প্রতিষ্ঠান কিংবা হিমায়িত পণ্য পরিবহনসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ তৈরি হলে তা পুরো উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে পারে।

তাই আমদানি মেলার সাফল্য শুধু বাংলাদেশের কোনো পণ্য একবার চীনা ক্রেতার নজরে আসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সেই পণ্যকে একটি দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করাই বড় অর্জন।

পাটের হাতব্যাগের গল্পটিও সে কথাই বলে। নুরুস সাফা ও তাহেরা আক্তার শুধু ক্রেতা খুঁজে পাননি; পাটের পণ্যকে বস্তা থেকে ঘরের সাজসজ্জার উপকরণ ও কার্পেটে রূপান্তরের জন্য নকশা এবং বাজারজাতকরণের সক্ষমতাও অর্জন করেছেন।

কাঁচামালের পরিচয় ছাড়িয়ে ব্যান্ডের পথে চামড়াজাত পণ্য

চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। কিন্তু কাঁচা চামড়া রপ্তানি আর ঢাকায় তৈরি এক জোড়া চামড়ার জুতাকে চীনের ভোক্তা পণ্যের বাজারে তুলে ধরার মধ্যে মূল্য সংযোজনের বড় পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশও চীনে রপ্তানির সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উচ্চ মূল্য সংযোজিত চামড়াজাত পণ্য ও ভোক্তাদের ব্যবহারের উপযোগী জুতাকে চিহ্নিত করেছে।

চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জুতা ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার। অন্যদিকে, বাংলাদেশের রয়েছে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের শিল্পভিত্তি এবং দক্ষ শ্রমশক্তি। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ড পরিচিতি এবং সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর কার্যকর বিপণনব্যবস্থা আরও উন্নত করার সুযোগ রয়েছে দেশটির। ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি ১৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়েছে। চামড়াজাত পণ্য ও জুতা এ প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি।

এই প্রবণতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে আমদানি মেলায়। ভোক্তা-পণ্য প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের তৈরি জুতা ও চামড়াজাত পণ্য সরাসরি চীনা ক্রেতা এবং ই-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের পণ্য নির্বাচনকারী দলের সামনে তুলে ধরা সম্ভব। এসব পণ্যের ক্ষেত্রেও শূন্য-শুল্ক সুবিধা প্রযোজ্য। এখন প্রয়োজন কাঁচামাল সরবরাহকারীর পরিচয় ছাড়িয়ে তৈরি পণ্যের নিজস্ব ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাওয়া।

মাছ ও আমের চ্যালেঞ্জ শুল্কে নয়, পরিবহনব্যবস্থায়

মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ প্রথম সারিতে আছে। মাছ ও চিংড়ি ইতোমধ্যে চীনে রপ্তানি হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের আমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য চীনের বাজারে নেওয়ার বিষয়েও দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনা ও সমন্বয় চলছে। সীমিত পরিসরে আমের পরীক্ষামূলক রপ্তানিও হয়েছে।

তবে মাছ, ফল কিংবা অন্যান্য তাজা কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে বাজারে প্রবেশের প্রধান বাধা সব সময় শুল্ক নয়। পণ্যের সতেজতা বজায় রাখা, মান নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদসংক্রান্ত পরীক্ষার শর্ত পূরণ এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য পরিবহনব্যবস্থা এবং দেশের হিমায়িত পণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনের অবকাঠামোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বড় পরিসরে তাজা পণ্য রপ্তানি করতে হলে এসব ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

এ বছরের আমদানি মেলায় কৃষি ও খাদ্যপণ্যের প্রদর্শনী আরও সম্প্রসারিত হয়েছে। বাংলাদেশের মাছ ও ফল রপ্তানিকারকদের জন্য তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বড় পরিমাণে পণ্য পাঠানো নয়; বরং উপযুক্ত হিমায়িত পণ্য পরিবহন সহযোগী, আমদানি-সংক্রান্ত পরীক্ষণ ও অনুমোদনসেবা প্রদানকারী এবং ই-বাণিজ্যভিত্তিক বিতরণ চ্যানেল খুঁজে বের করা। এতে পরীক্ষামূলক রপ্তানিকে নিয়মিত ও স্থিতিশীল সরবরাহব্যবস্থায় রূপ দেওয়া সহজ হবে।

অবমূল্যায়িত দুই খাত: সূচিকর্ম ও ওষুধ

আমদানি মেলায় বাংলাদেশের পণ্যের পরিচিত তালিকায় পাটজাত পণ্যের পাশাপাশি রয়েছে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক পরিচয় বহনকারী কারুশিল্প ও সূচিকর্মের সামগ্রী। বাংলাদেশের নকশিকাঁথা এ ক্ষেত্রে বিশেষ সম্ভাবনাময়। এর নকশা, কারিগরি দক্ষতা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে আলাদা আবেদন তৈরি করতে পারে।

চীনের বাজারে হস্তশিল্পের প্রতি আগ্রহ এবং ঘরের সাজসজ্জার পণ্যে বৈচিত্র্যের চাহিদা বাড়ছে। এই প্রবণতার সঙ্গে বাংলাদেশের নকশিকাঁথা, হাতে তৈরি কুশন, দেয়ালসজ্জার সামগ্রী ও অন্যান্য সূচিকর্মের পণ্য যুক্ত করা সম্ভব।

এসব পণ্যকে মাঝারি ও উচ্চমূল্যের সাংস্কৃতিক সৃজনশীল পণ্য হিসেবে বাজারজাত করার সুযোগ রয়েছে। কয়েকটি নির্বাচিত নকশিকাঁথা কিংবা ঘরের সাজসজ্জার উপকরণের একটি সংগ্রহই চীনা ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচিতি তুলে ধরতে পারে।

আরেকটি সম্ভাবনাময়, তবে তুলনামূলক জটিল খাত হলো ওষুধশিল্প। বাংলাদেশের ওষুধ প্রায় ১৬০টি দেশে রপ্তানি হয়। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এ শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্য। তবে বার্ষিক রপ্তানি আয় ৩০ কোটি ডলারের কম এবং চীনের বাজারে বাংলাদেশের ওষুধের উপস্থিতি এখনও সীমিত।

চীনের ওষুধবাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে শুধু প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়াই যথেষ্ট নয়। পণ্যের মান সনদ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন, নিবন্ধনপ্রক্রিয়া এবং বড় পরিসরে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। এ বছরের আমদানি মেলায় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধবিষয়ক প্রদর্শনীও সম্প্রসারিত হয়েছে। বাংলাদেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এখানে তাৎপর্য শুধু পণ্য বিক্রির সুযোগ খোঁজা নয়; বরং চীনা প্রযুক্তি সহযোগী, অনুমোদন ও নিবন্ধনবিষয়ক পরামর্শক এবং যৌথভাবে বাজারে প্রবেশে আগ্রহী অংশীদার খুঁজে বের করা।

বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে ওষুধশিল্পকে আটটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত রপ্তানি খাতের একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এ খাতে বাজার সম্প্রসারণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরি করতে হবে; একবারের প্রদর্শনী বা তাৎক্ষণিক ক্রয়াদেশের ওপর নির্ভর করলে চলবে না।

পাটের সাফল্য থেকে অন্য খাতের শিক্ষা

পাটের হাতব্যাগের গল্প বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে গেছে। আমদানি মেলার সুযোগ সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগানো সম্ভব তখনই, যখন কোনো পণ্যকে কাঁচামালের পরিচয় থেকে বের করে নিজস্ব ব্র্যান্ড ও উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করা যায়। একইভাবে, একটি প্রদর্শনীকে শুধু বার্ষিক আয়োজন হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও রপ্তানি পরিকল্পনার অংশ করতে হয়।

চামড়া ও জুতার ক্ষেত্রে প্রয়োজন উৎপাদনের মানোন্নয়ন, নকশা ও ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা। মাছ ও আমের জন্য দরকার হিমায়িত পণ্য পরিবহনব্যবস্থা এবং আমদানি-সংক্রান্ত নিয়মকানুন পূরণের সক্ষমতা। নকশিকাঁথা ও সূচিকর্মের ক্ষেত্রে প্রয়োজন সাংস্কৃতিক পরিচিতি ও বাজারজাতকরণ। আর ওষুধশিল্পের জন্য জরুরি মান নিয়ন্ত্রণ, নিবন্ধন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা।

শুল্কমুক্ত সুবিধা বাজারে প্রবেশের একটি বড় বাধা দূর করেছে। এখন বাংলাদেশের সামনে কাজ হলো এই সুযোগকে বাস্তব বাণিজ্যে রূপ দেওয়া। পাটের হ্যান্ডব্যাগকে স্টল থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং তার পাশে চামড়ার জুতা, নকশিকাঁথা, মাছ, আম ও ওষুধসহ আরও পণ্য তুলে ধরতে হবে। তবে শুধু পণ্য প্রদর্শন করলেই হবে না। প্রতিটি পণ্যের পেছনে এমন একটি কার্যকর সরবরাহ ও বিপণনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের কারখানা থেকে চীনের বাজার পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হবে।

লেখক: সাংবাদিক, সিএমজি বাংলা, বেইজিং

china