আফরিন মিম
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নে ৪ হাজার ৬৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও নিমার্ণ কাজের উদ্বোধন করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার সকালে মোংলা বন্দরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি ‘মোংলা বন্দরের সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্প দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ (এমপিএ) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন (ইপিসি) ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) সহযোগী প্রতিষ্ঠান চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি)। প্রকল্পটির নির্মাণকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ৪২ মাস।
প্রকল্পের আওতায় ৩৬৮ মিটার সম্মিলিত দৈর্ঘ্যের ১০ ও ১১ নম্বর দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটি নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি গড়ে তোলা হবে আধুনিক কার্গো হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম, কন্টেইনার ইয়ার্ড এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামো।
প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী, এসব স্থাপনা চালু হলে বছরে প্রায় ৩ লাখ ৯৪ হাজার টিইইউ (টুয়েন্টি-ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে। নির্মাণ করা হবে ৮৭ হাজার ৬০০ বর্গমিটারের লোডেড কন্টেইনার ইয়ার্ড, ৩৪ হাজার ১৭০ বর্গমিটারের খালি কন্টেইনার ইয়ার্ড এবং ৯ হাজার ৮৭০ বর্গমিটারের কন্টেইনার পরিদর্শন এলাকা। এ ছাড়া ৪ হাজার ২৬০ বর্গমিটারের বিপজ্জনক পণ্য হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড, রেফার কন্টেইনার ইয়ার্ড এবং আধুনিক নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনায় ৪৯ সেট আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম সংগ্রহ ও স্থাপন করা হবে।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামুদ্রিক বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার হিসেবে মোংলা বন্দর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পশুর নদী ও মোংলা নালার সংযোগস্থলে অবস্থিত বন্দরটি বঙ্গোপসাগরের মোহনা থেকে প্রায় ৭১ নটিক্যাল মাইল উজানে অবস্থিত। সুন্দরবনের নিকটবর্তী হওয়ায় বন্দরটির কার্যক্রম পরিচালনায় পরিবেশগত ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
জোয়ার-ভাটা-নির্ভর পশুর নদীর নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলে যেমন ভৌগোলিক সুবিধা রয়েছে, তেমনি নাব্যতা বজায় রাখা, পলি জমা নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার মতো কারিগরি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আধুনিক ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পদ্মা সেতু চালুর পর রাজধানী ঢাকার সঙ্গে মোংলা বন্দরের সড়ক যোগাযোগের দূরত্ব কমে প্রায় ১৭০ কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বন্দরটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৪ হাজার ৬৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে চীন সরকার এক্সিম ব্যাংক অব চায়নার মাধ্যমে প্রায় ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহজ শর্তের ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। গত ১০ অক্টোবর চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ২ দশমিক ৪০৪ বিলিয়ন চীনা ইউয়ান ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরের পণ্য ও কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তথ্য ও ছবি: সিএমজি