সুতোয় বাঁধা কমিউনিটি

ফয়সল আবদুল্লাহ

একটি গ্রাম শুধু অবকাঠামোতে উন্নত হলেই হয় না, এটি সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য হয় তখনই, যখন তার মানুষ একে অন্যের কাছাকাছি থাকতে পারে, প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা পায়, নিজের কথা বলার জায়গা পায় এবং সাধারণ সামাজিক সমস্যার সমাধানে দূরের কোনো দপ্তরে যেতে হয় না। চীনে তৃণমূল পর্যায়ের সামাজিক ব্যবস্থাপনায় এখন এমন ধারণা বেশ ভালোমতোই গুরুত্ব পাচ্ছে। একে বলা হচ্ছে সংমিশ্রিত সম্প্রদায়, ইংরেজিতে ইন্টারওভেন কমিউনিটি। এটি এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী শুধু পাশাপাশি বাসই করে না; বরং তারা একই স্কুলে পড়ে, একই এলাকায় কাজ করে, একই নাগরিক সুবিধা ভোগ করে, উৎসব উদযাপন করে একসাথে এবং একসঙ্গেই স্থানীয় বিষয়ে আলোচনা করে।

এমন কমিউনিটির লক্ষ্য হলো বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে বাসস্থান, শিক্ষা, কাজ, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের ঘনিষ্ঠ সংযোগ তৈরি করা।

চীনে ২০২৬ সালের ১ জুলাই কার্যকর হয় ‘জাতিগত ঐক্য ও অগ্রগতি প্রসার আইন’। প্রথমবারের মতো আইনি কাঠামোয় দেশটিতে এমন সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।

অবশ্য আইন করলেই তো একটি ভালো কমিউনিটি তৈরি হয় না। দরকার বাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল, কর্মসংস্থান, বাজার, সংস্কৃতি, বিনোদন এবং স্থানীয় প্রশাসনকে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসা।

চীনের ইনার মঙ্গোলিয়া স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে এ নিয়ে একটি বিস্তৃত নিরীক্ষা চলেছে। এতে যে সাফল্য মিলছে তার অন্যতম উদাহরণ বাওতৌ শহরের লিননান কমিউনিটি।

একসময় এলাকাটি ছিল পুরনো আবাসিক ভবনে ভরা। দেয়ালে ফাটল, বর্ষায় জলাবদ্ধতা—মানুষের জীবনযাত্রা ছিল সমস্যায় ভরা। পুনর্গঠনে জন্য সেখানে তৈরি করা হয় ৯টি নতুন আবাসিক ভবন ও ৬৫৮টি বাসা। স্থাপন করা হয় শিশুযত্নকেন্দ্র, বয়স্ক সেবাকেন্দ্র ও কমিউনিটি হাসপাতাল।

এরপর শুরু হয় আসল পরিবর্তন। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বাসিন্দারা একই আবাসিক পরিবেশে বসবাস করতে শুরু করেন এবং তারা সবাই একই কমিউনিটি-সুবিধা ব্যবহার করতে থাকেন। ধীরে ধীরে বাহ্যিক অবকাঠামোর পাশাপাশি গড়ে উঠতে থাকে একটি অদৃশ্য সুরক্ষাবলয়।

এ ধরনের কমিউনিটির মূল দর্শন হলো—মানুষ যদি একই এলাকায় থাকে, কিন্তু তাদের স্কুল, বাজার ও বিনোদনের জায়গা যদি আলাদা হয়, তবে যোগাযোগ বেড়ে ওঠে না। অন্যদিকে একই খেলার মাঠ, ক্যান্টিন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সাংস্কৃতিক স্থান থাকলে মানুষের স্বাভাবিক সাক্ষাৎ ও যোগাযোগের সুযোগ বাড়ে।

চীনের পরিকল্পনাটিকে তাই শুধু একটি আবাসননীতি হিসেবে দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যাবে না। এটি নগর পরিকল্পনা এবং সামাজিক সংযোগ তৈরির কৌশলও।

এরপর আসে ১৫ মিনিটের জীবনচক্রের ধারণা। ধারণাটি সরল। একজন মানুষ যেন নিজের বাড়ি থেকে প্রায় ১৫ মিনিটের মধ্যে প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলো পেয়ে যান, সেটাই নিশ্চিত করা হয় এতে। ১৫ মিনেট দূরত্বেই থাকা চাই  বাজার, স্বাস্থ্যসেবা, সাংস্কৃতিক জায়গা, খেলার মাঠ, এবং মানুষের মিলিত হওয়ার জায়গা।

ইনার মঙ্গোলিয়ায় এখন ২৫৪টি ১৫ মিনিটের জীবনচক্রের সুবিধা পাচ্ছে ৫৩৪টি কমিউনিটি। এর অধীনে আছে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ৬০ লাখ ৭০ হাজার মানুষ।

এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো—কাছাকাছি সেবা মানে শুধু সুবিধাই নয়, এটি প্রশাসনিক দক্ষতাও বাড়াতে পারে। সেখানকার মানুষকে ছোটখাট সমস্যার জন্য দূরের কোনো সরকারি অফিসে যেতে হচ্ছে না। সেবা চলে আসছে মানুষের কাছে।

চীনের ইনার মঙ্গোলিয়ার এই উদাহরণের অনুকরণে বাংলাদেশের গ্রামগুলোর মধ্যে কমিউনিটি ধারণা যত শক্তিশালী হবে তত বাড়বে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা।

ইনার মঙ্গোলিয়ার স্থানীয় হলুদ জাতের গরুকে কেন্দ্র করে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখানে স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গ্রামের সমবায় সংগঠন এবং কৃষক—এই চার পক্ষকে যুক্ত করা হয়েছে। গবাদিপশু পালন থেকে শুরু করে প্রজনন, রোগ প্রতিরোধ, বিক্রি এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ—পুরো একটি শিল্পশৃঙ্খল গড়ে তোলা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় সেখানে আছে ১ হাজার ৭০টি প্রজনন সমবায়। যুক্ত হয়েছেন ৪২ হাজার ৮০০ কৃষক ও পশুপালক। অর্থাৎ অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতাও মানুষকে কাছে আনে, তৈরি করে সুরক্ষাবলয়।

যখন একই শিল্পে কৃষক, ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী, প্রক্রিয়াজাতকারী এবং বাজার—সবাই একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন একটি স্থানীয় অর্থনৈতিক বাস্তুতন্ত্রও তৈরি হয়। এই কারণে ইনার মঙ্গোলিয়ায় কমিউনিটি পর্যায়ে দক্ষতা প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান কেন্দ্র, অস্থায়ী বা নমনীয় কাজের বাজার এবং অনলাইন নিয়োগ প্ল্যাটফর্মও গড়ে তোলা হয়েছে। এর সূত্র ধরে ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীনের ওই অঞ্চলে ১০ লাখ ৫৭ হাজার নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে।

মানুষের মধ্যে সম্পর্ক গড়তে সংস্কৃতিও শক্তিশালী সেতু। ইনার মঙ্গোলিয়ায় ঐতিহ্যবাহী উৎসব, সংগীত, খেলাধুলা ও লোকসংস্কৃতিকে কমিউনিটির দৈনন্দিন জীবনে যুক্ত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

এরইমধ্যে উলানচাব শহরে জাতিগত ঐক্য ও স্থানীয় ইতিহাসকে কেন্দ্র করে ১৩টি থিমভিত্তিক পার্ক এবং ২৩টি সাংস্কৃতিক করিডর তৈরি হয়েছে। শিলিনগোলের তৃণভূমিতে প্রতিবছর ২০০টির বেশি স্থানীয় ঘোড়দৌড়, মঙ্গোলীয় কুস্তি ও লোকগান উৎসবের আয়োজন করা হয়। আবার কমিউনিটিতে অব্যবহৃত ভবনকে পরিণত করা হয় এমন একটি স্থানে, যেখানে শরীরচর্চা, অবসর, প্রতিবেশীদের আলোচনা, প্রশিক্ষণ, মধ্যস্থতা ও পরামর্শ—সবই করা যায়।

পুরো ব্যবস্থাটির সবচেয়ে সমৃদ্ধ অংশ হলো তৃণমূল শাসনব্যবস্থা। ইনার মঙ্গোলিয়ায় ছোট ছোট ভৌগোলিক এলাকা বা আবাসিক অংশকে একটি গ্রিড হিসেবে বিবেচনা করে সেখানকার জন্য নির্দিষ্ট কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে।

তাদের কাজ শুধু অভিযোগ শোনা নয়। তারা এলাকায় ঘুরে সম্ভাব্য সমস্যা শনাক্ত করেন, ঝুঁকি খুঁজে বের করেন, বিরোধ মীমাংসায় সহায়তা করেন।

হোহোট শহরের একটি আবাসিক এলাকায় একদিন নিয়মিত পরিদর্শনের সময় এক গ্রিড কর্মী দেখতে পান, কয়েকটি টেলিযোগাযোগ তার ঢিলে হয়ে মাটির কাছাকাছি ঝুলছে। এতে পথচারীদের আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি ছিল। কেউ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করবে, সেই অপেক্ষা করা হয়নি। ওই কমিউনিটি একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করে। এরপর টেলিযোগাযোগ কোম্পানি, সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান, আবাসিক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষসহ সবাই এসে তারগুলো গুছিয়ে নিরাপদে নিয়ে যায়।

ইনার মঙ্গোলিয়ার বিভিন্ন কমিউনিটিতে আলোচনাসভা ও পরামর্শ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে বাসিন্দারা সরকারি প্রনিধিদের সঙ্গে বসে সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সংস্কার, পরিবেশ উন্নয়ন, বিরোধ সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করেন।

এ ধরনের কমিউনিটির আরেকটি বড় অংশ হলো মানবিক বিষয়ের দেখভাল। কোনো পরিবারের কেউ মারা গেলে কমিউনিটির কর্মী ও প্রতিবেশীরা তার পাশে এসে দাঁড়ান। কারও বাড়িতে বৃদ্ধ কেউ থাকলে তার যত্নের সমস্যা হলে, কমিউনিটির কাউকে না কাউকে পাশে পাওয়া যায়। আবার শিলিনহোটের আইমিন কমিউনিটিতে মানবিক সহায়তার একটি প্ল্যাটফর্ম হয়েছে। সেই প্লাটফর্মের স্লোগান হলো ‘এখানে এলে আপনি পরিবারেরই একজন।’

বাংলাদেশে গ্রাম পর্যায়ে এ ধরনের কমিউনিটি গড়ে তোলা হলে গ্রামবাসীরা নিজেদের ভূমিকা, অধিকার ও অর্থনৈতিক সুযোগ যেমন জানতে পারবে, তেমনি বুঝতে পারবে—ব্যক্তিগত নয়, দলগত উন্নয়নই সত্যিকারের টেকসই উন্নয়ন। এক্ষেত্রে কমিউনিটি পরিকল্পনাকে শুধু আবাসন পরিকল্পনা হিসেবে দেখলে হবে না। এখানে বাড়ির সঙ্গে স্কুল, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সংস্কৃতি, বিনোদন—সবকিছুকে এক সুতোয় পরিকল্পনা করা হবে। কর্মসংস্থান কেন্দ্র, দক্ষতা প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা, সমবায় ও স্থানীয় শিল্পকে আবাসিক উন্নয়নে যুক্ত করার মতো বড় পদক্ষেপগুলোও তখন সহজ হয়ে আসবে।

সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতেও ভূমিকা রাখবে এ ধরনের কমিউনিটি। উৎসব, পার্ক, কমিউনিটি অনুষ্ঠান এবং তরুণদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংস্কৃতিক হয়ে উঠবে দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

চীনের অভিজ্ঞতা থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি তাই—উন্নয়ন তখনই মানুষের জীবনে গভীরভাবে পৌঁছায়, যখন তা মানুষের বসবাসের জায়গা—অর্থাৎ কমিউনিটিকে—আরও বাসযোগ্য, আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলে।

লেখক: সাংবাদিক, সিএমজি বাংলা