বর্ষার ভেজা বিকেল 

আসাদুজ্জামান খান মুকুল 

আজ থেকে ২৫-২৬ বছর আগের কথা।অনিমাদের বাসার পাশে রাস্তার মোড়ে একটি টং দোকান ছিল। রহিম মিয়া সেখানে চা-পান বিক্রি করতেন। সবাই তাকে মামা বলে ডাকত।অনিমা রোজ এই দোকানের পাশ দিয়েই কলেজ আসা-যাওয়া করত।কলেজ থেকে ফেরার পথে মাঝেমধ্যেই ওখান থেকে বাবার জন্য কিনে নিত খিলিপান। বাবার প্রতি তার ছিল অন্যরকম টান। চয়ন ছিল ওই এলাকারই একটা মেসে থাকা ছেলে, প্রাইভেট কোম্পানিতে নতুন ঢুকেছে। প্রায়ই অফিস ফিরে ওখানটায় সেও চা খেতে আসত।

একদিন অনিমা পান নিয়ে খুচরো টাকা ব্যাগে না পেয়ে কিছুটা ইতস্তত করে দাঁড়িয়ে রইল। দোকানদার মামা কিছুটা বিরক্ত হচ্ছিল বুঝে চয়ন চুপচাপ পাঁচটা টাকা দিয়ে বললেন-

“মামা, উনার এটা রেখে দিন।”

অনিমা অনেকটা অস্বস্তিতে পড়ে বলেছে- 

“না না আপনি দিবেন কেন ?”

চয়ন হাত নেড়ে বলে-

“আরে কি যে বলেন, ও কোন সমস্যা না। না হয় কাল আমাকে দিয়ে দিবেন।”

সেদিন কথা ওটুকুই ছিল, তারপর থেকে দেখা হলে অল্প অল্প কথা, কুশল বিনিময়। এভাবে ধীরে ধীরে দুজনের মাঝে সংকোচটা কেটে যেতে থাকে। তবে দিন যতই গড়িয়ে যায় ব্যাপারটা আর একটুর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দুজনের মাঝে কিছু কিছু করে অনুরাগ, অনুভূতি জন্মাতে শুরু করে।

পরের কয়েকটি মাসে তাদের সীমাবদ্ধ গন্ডিটা ছাড়িয়ে গেল। বিকেল সাড়ে চারটে বাজতেই চয়ন অফিসের ফাইল গুছিয়ে প্রতিদিনের মত ওই মোড়ের দোকানে।,অনিমাও ঠিক সেই সময়েই পান কেনার ছলে বের হতো। দুজনের অনুভূতি যেন এক বিন্দুতে স্থির। মাঝেমধ্যে দাঁড়িয়ে একসাথে চা খেয়ে রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেত কলেজ মাঠের দিকে। চলত নানান গল্পগুজব।

কদম গাছে সদ্য ফোঁটা কদম ফুলের গন্ধে অনিমা তাকিয়ে থাকতো মুগ্ধ হয়ে। চয়ন হাত বাড়িয়ে কদম ফুল তুলে অনিমার খোঁপায় গুঁজে দিত। কোনদিন একে অপরকে না দেখলে যে দিনটাই যেন ভালো লাগত না। সেটা দুজনেই মনে মনে বুঝে গিয়েছিল। বাড়ি ফিরে অনিমা প্রায়ই কথার ছলে চয়নের নানা গুণের কথা, ওর সহজ-সরল ব্যবহারের গল্প করত মায়ের কাছে। মা-ও মেয়ের মুখে চয়নের নাম আর প্রশংসা শুনতে শুনতে মনে মনে ছেলেটার প্রতি একটা ইতিবাচক ধারণা তৈরি হল।

তারপর একদিন অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামছে আষাঢ়ের শেষ দিকে। ঠিক সেই সময়েই চয়নের দেশের বাড়ি থেকে খবর এল ওর মা খুব অসুস্থ। চয়নকে তড়িঘড়ি করে পাবনায় গ্রামের বাড়িতে চলে যেতে হলো। যাওয়ার আগে  অনিমার দেখা মেলেনি, কথাও হয়নি। এখনকার মতো তখন ফোনের সুবিধা ছিল না।যাবার বেলায় চয়ন শুধু একটা চিরকুটে ওর নাম ঠিকানাটা লিখে দোকানের মামার কাছে রেখে গেল অনিমাকে দিতে। তাতে লেখা ছিল-

“মায়ের অসুস্থতায় দ্রুত চলে এলাম, বলতে পারিনি, মাঝে মাঝে চিঠি দেব, তুমি ভালো থেকো অনিমা।”

সঙ্গে ছিল একটা সদ্য ফোটা কদম ফুল।

অনিমা চয়নের চিঠির জন্য দিন গুনতে থাকে, কিন্তু চিঠির দেখা আর মেলেনি। এক মাস, দুই মাস করে আট-নয় মাসে কোন খবর না থাকায় ওর চারপাশটা শূন্যতায় ভরে যায়। প্রথম দিকে দুটো চিঠি আসার পর হঠাৎ সব বন্ধ। পারিবারিক ঝামেলা, মায়ের অসুস্থতা, আর অর্থকষ্টে চয়ন যেন একদম ভেঙে পড়ে। ওদিকে 

অনিমা রোজ ডাকপিয়নের আওয়াজ শুনলে দরজায় উঁকি দিত। কিন্তু তার জন্য কোনো চিঠি আসত না। মনটা তখন কষ্টে ভরে যেত, চোখ ভিজে উঠত কান্নায়। লুকানো বিরহের মাঝেই তার পুরো একটা বছর কেটে যায়। মাঝে মাঝে মনে হত – চয়ন হয়তো অন্য কাউকে পেয়ে তাকে ভুলেই গেছে। অভিমান আর একাকীত্বে অনিমাও জোর করে মনকে বোঝায়।

এর মধ্যেই তার বাবা এক জায়গায় ওর বিয়ের কথাবার্তা শুরু করলেন। পাত্র ব্যাংকে জব করে, ভালো সেলারী,গোছানো পরিবার। দুই পরিবারের মধ্যে কেবল প্রাথমিক আলাপ-আলোচনা চলছে। অনিমাকে মা জিজ্ঞেস করলে- “তোমাদের যা ভালো মনে হয়!”

আর কিছু বলেনি।

একদিন বিকেলে অনিমা আর ওর মা একটা মার্কেটে গিয়েছিলেন। হঠাৎ শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। মার্কেটের একপাশে জুঁই-চামেলির গন্ধে ভরা পরিবেশ। দোকানের এককোণে তারা দাঁড়িয়ে ছিলেন।

ঠিক তখনই চেনা একটা গলার স্বর-

“অনিমা?”

অনিমা তাকিয়ে দেখে চয়ন।

এই এক বছরে চয়ন কেমন যেন শুকিয়ে গেছে, চোখে ক্লান্তি, ভেজা চুল কপালে লেপ্টে আছে।

চয়ন বলল-

“তোমাদের পুরোনো বাড়িতে গিয়েছিলাম। ওখানকার দোকানদার মামা বলেছে তোমাদের বাসা বদলেছ। তাই আমি সকাল থেকে এখানে ঘুরছি।”

অনিমা প্রায় কান্না জড়িত কন্ঠে বলল-

“এই একটা বছর কোথায় ছিলে পাষণ্ড? একটা খবর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করোনি, আজ কিসের জন্য এসেছ?”

চয়ন তখনই পকেট থেকে ডায়েরির পাতা বের করে বলে-

“দেখো,আমি অনেক চিঠি পাঠিয়েছিলাম অনিমা। কিন্তু পৌঁছায়নি। আমার মায়ের অপারেশনের পর চাকরিটাও হারাই। খুব কঠিন সময় পার করেছি,যা তোমাকে বলে বুঝাতে পারবো না,কিন্তু আমি তোমাকে ভুলিনি।”

ততক্ষণে অনিমার মা পাশে এসে দাঁড়ালেন। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললেন-

“বাবা, তুমিই কি চয়ন?”

“জি আন্টি।”

“এভাবে বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে কথা বলা যায় না। চলো, আমাদের সাথে চলো।”

বাসায় পৌঁছাতে সন্ধ্যা নেমে গেল। ড্রয়িংরুমে অনিমার বাবা খবরের কাগজ  পড়ছিলেন। সালাম দিয়ে চয়ন বলল-

“আঙ্কেল, আমি চয়ন।”

বাবা ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকালেন। তিনিও অনিমার মায়ের কাছ থেকে দুজনের বিষয়টি জানতেন। চশমা নামিয়ে কিছু রাগী স্বরেই বললেন-

“অনিমার বিয়ের কথাবার্তা চলছে এটা কি জানো?”

চয়ন মাথা নিচু করে বলল-

 ” জি– আঙ্কেল জানি। কিন্তু আমি কোনোদিন তাকে ভুলিনি।”

বাবা কিছু বললেন না।

অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে বললেন-

” এখন কিছুই করার নেই, একজায়গায় অনিমার বিয়ের কথা চলছে।” 

 বাবার এই কথায় সারাঘরে নীরবতা নেমে আসে। বাইরে তখনো বৃষ্টি ঝরছে, সেই শব্দে নীরবতাকে আরও গভীর করে তুলে। অনিমার মা স্বামীর পাশে এসে বসে বলেন-

 ” এই শোন ,এখনো তো বিয়ে চুড়ান্ত হয়নি, সবেমাত্র কথাবার্তা শুরু, এতে কোন সমস্যা হবে না, তুমি ভেবে দেখো!”

অনিমার বাবা চিন্তিত মনে গালে হাত রেখে বসে রইলেন, কিছুই বললেন না। মা আবার –

” মানুষ তো ভুল করতেই পারে , আবার ফিরেও তো আসে।”

তারপর বাবা চয়নের প্রতি- 

“এই ছেলে! তুমি কি পারবে আমার মেয়ের সারাজীবনের দায়িত্ব নিতে? না আবার আগের মতো হারিয়ে যাবে?” 

চয়ন নিচু গলায় বলে-

 ” চয়ন একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে,আর কখনোই এমন হবে না আঙ্কেল।”

এবার অনিমার বাবা-

 “আচ্ছা শোন! আগে তোমার লোকজনের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করব,কথা বলব, তারপর দেখা যাবে।

” পরের সপ্তাহে চয়নের দাওয়াতে ওদের বাড়িতে গেলেন, তার বড় ভাই ও চাচাদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথাবার্তা হলো। চয়নের মায়ের অসুস্থতা, অর্থকষ্ট, আর নতুন চাকরির বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হলো। পাত্রপক্ষের কয়েকজনকে অনিমাদের বাড়িতে আসার দাওয়াত দেওয়া হয়।

সেদিন বিদায়ের সময় বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনিমার বাবা চয়নকে বললেন-

 “ভালোবাসা শুধু মুখের কথা নয় বাবা, দায়িত্বও একটা বড় ব্যাপার, সেটি তোমাকে বুঝতে হবে।”

চয়ন মাথা নত করে মৃদু স্বরে-

 “আমি সেটা জানি  আঙ্কেল।”

বাবা মৃদু হেসে বললেন- 

“আশা করি এবার আর হারাবে না।”

এর ঠিক এক মাস পর, শ্রাবণের এক দুপুরের দিকে খুব সাধারণভাবে অনিমা আর চয়নের বিয়ে হয়।

বিয়ের পরদিন বিকেলে আবার শ্রাবণের অঝোর ধারা। বাতাসে কদম ফুলের সুবাস।

চয়ন বাইরে থেকে ফিরে মোড়ের দোকান থেকে দুটো খিলি পান কিনে আনে। সঙ্গে ছিল একটি সদ্য ফোটা কদম ফুল।

ফুলটা অনিমার হাতে দিয়ে বলে-

“সেদিন তোমার খোঁপায় গুঁজে দিয়েছিলাম, মনে আছে?”

অনিমাও হেসে বলে-

“আর, তারপর এক বছর উধাও।”

চয়ন মৃদু হেসে-

“হ্যাঁ, তা ঠিক,কিন্তু ওই ফুলের গন্ধটা আমি ভুলিনি।”

অনিমা কদম ফুলটা চুলে গুঁজে নিল।

তারপর চয়ন দুটো খিলিপান অনিমার দিকে এগিয়ে দেয়।

অনিমা পানটা হাতে নিয়ে হেসে বলে-

 “আজকে পানের দাম দিয়েছ কি? না আবার আমার মতো?”

চয়ন মৃদু হেসে-

“এবার সব হিসাব মিটিয়ে ফেলতে চাই।”

অনিমা আর কিছু বলেনি। শুধু কদম ফুলটা চুলে গুঁজে দিল।

বাইরে তখনও শ্রাবণের বৃষ্টি ঝরছে।

গ্রাম – সাভার 

পোস্ট – হেমগঞ্জ বাজার 

উপজেলা – নান্দাইল 

জেলা – ময়মনসিংহ