মায়ের গল্প: অভাগিনী

কবির কাঞ্চন

জীবনের ঘানি টানতে টানতে হাঁপিয়ে ওঠা মানুষদের অন্যতম বিল্লুরাণী। একমাত্র ছেলে দীলিপের মুখে ”বাবা’ শব্দটা ফোটবার আগেই তিনি স্বামীকে হারালেন।
স্বামী হরিপদ ছিলেন একজন প্রান্তিক জেলে। মহাজনের নৌকায় বছরব্যাপী কর্মচারী ছিলেন। সংসার খরচ মেটানোর জন্য আগে আগে মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিতেন বলে অনেকটা গৃহপালিত কর্মচারীর মতো আচরণ করা হতো তার সাথে। সেবার একটানা আকাশের অবস্থা খারাপ ছিল। তারওপর হরিপদের শরীরের অবস্থাও খারাপ ছিল। সে নৌকায় না গিয়ে বাসায় থেকে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে মহাজনের লোকজন এসে তাকে জোর করে কাজে নিয়ে যায়। যাবার বেলায় ছেলে দীলিপকে তিনি বলে গেলেন,  বাবা, ঠিকমতো লেখাপড়া করিস, তোকে অনেক বড় হতে হবে।
এই কথাটাই ছিল শেষবারের মতো বাবার মুখে শোনা কথা। হরিপদরা নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে সমুদ্রে পাড়ি জমালেও আর ফিরে আসেনি।

সেই থেকে অভাগিনীর ললাটে জুটেছে দিনে গার্মেন্টসে চাকরি আর রাতে সেলাইমেশিনের কাজ। তবু দু’চোখে তার অসীম স্বপ্ন। একদিন দীলিপ বড় হবে। অনেক বড়। দীলিপও সেপথে এগুচ্ছে। নিয়মিত পড়াশোনা করছে। আর ক’দিন পরই সে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে।

হঠাৎ করে করোনাভাইরাস আতঙ্কে সারাদেশে ‘সাধারণ ছুটি’ ঘোষণা করা হয়েছে। দীলিপের মায়ের ফ্যাক্টরী বন্ধ। সেলাইমেশিনের কাজেরও কোন অর্ডার নেই। হাতে জমা টাকা নেই। বাসায় বাজারও নেই। ফ্লোরে বসে দীলিপ নিরিবিলি পড়ছে। বাজারের ব্যাগটা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে মাকে বাসার বাইরে যেতে দেখে দীলিপ বলল,
– মা, তুমি বিশ্রাম নাও; বাজারে আমি যাই।
বিল্লুরাণী দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, 
– না বাবা, তুই মনযোগ দিয়ে পড়। বাজারে আমিই যাই।
একথা বলে বিল্লুরাণী বাসার বাইরে চলে গেলেন।

পড়ার ফাঁকে দীলিপ মোবাইলটা টেনে নিয়ে ফেসবুকে চোখ বোলায়। হঠাৎ সে দেখতে পায় কতকগুলো মানুষ অসহায়ের মতো ত্রাণ নিচ্ছে। দীলিপ ছবিটায় মন্তব্য করতে যাবে এমন সময় একজোড়া চোখে চোখ পড়তেই সে থমকে যায়। চোখজোড়ার স্নেহময়ী চাহনি গত সতেরো বছর ধরে সে দেখেছে। শাড়ির আঁচলে মুখ লুকালেও চোখদুটো লুকাতে পারেননি।

দুপুরবেলা। দীলিপ মায়ের সাথে ভাত খাচ্ছে। হঠাৎ মাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
– মা, প্রতি কেজি চাল কত করে নিয়েছো?
বিল্লুরাণী ভাতের লোকমাটা মুখে তুলতে গিয়ে
কাঁদো গলায় বললেন,
– ওসব তোর জানার দরকার নেই।
তারপর আর মায়ের মুখের দিকে তাকানোর সাহস হয়নি তার।

storiesগল্প