সায়েন্স টিচার

কবির কাঞ্চন

ক’দিন ধরে পৃথাদের মন ভালো নেই। ভালো থাকবেইবা কেমন করে। ওদের সবচে’ প্রিয় সায়েন্স টীচার হঠাৎ করে গায়েব হয়ে গেছেন। স্যারের গায়েব হওয়ার বিষয়ে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। স্টপ গ্যাপ ক্লাসে যে স্যারই আসেন অমনি ওরা জিজ্ঞেস করে বসে, “স্যার, আমাদের বাবলু স্যার কোথায়? আমরা বাবলু স্যারের ক্লাস করব।” স্টপ গ্যাপ ক্লাস নিতে আসা শিক্ষক ওদের ধমক দিয়ে থামিয়ে দেন। জুম্মান স্যার তো বলেই ফেললেন, “কোন স্যার এলো-গেল সেটা তোমাদের দেখার বিষয় না। আগে মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করো। যত্তসব! “

এভাবে প্রায় পাঁচ দিন কেটে যায়। এ কয়দিনে ওদের সায়েন্স ক্লাসের অবস্থা অনেকটা যাচ্ছেতাই। বাবলু স্যারের মতো করে কেউ সায়েন্সের খুঁটিনাটি বোঝান না। তাছাড়া স্টপ গ্যাপ ক্লাস করতে আসা স্যারদের আচরণও অনেকটা সৎমায়ের মতো।

মঙ্গলবার। পৃথার হঠাৎ মনে পড়ে ওদের সায়েন্স প্রজেক্টের কথা। বাবলু স্যার লাস্ট ক্লাসে ওদের একটি প্রজেক্ট ওয়ার্ক দিয়েছিলেন। আসছে বৃহস্পতিবার সায়েন্স ক্লাসে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর একটি করে উদ্ভিদ নিয়ে আসার কথা। স্যার জোর গলায় স্পষ্ট করে বলেছেন, “উদ্ভিদ আনার ক্ষেত্রে কারোটার সাথে কারোটার কোনো মিল থাকতে পারবে না।”

স্কুল ছুটির পর পৃথা সোজা বাসায় ফিরে আসে। এরপর হাতমুখ ধুয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে আসে। পৃথার মা আগে থেকে মেয়ের জন্য খাবার রেডি করে বসে আছেন। হঠাৎ দূর থেকে ওকে লক্ষ্য করে বললেন,
: কীরে মামণি, তোকে এমন বিষন্ন দেখাচ্ছে কেন? আজ কারো সাথে কী তোর ঝগড়া হয়েছে?
: না মা, কিছু হয়নি।
: তোকে দেখে তো মনে হচ্ছে কিছু একটা হয়েছে।
: না মা, আমার কিচ্ছু হয়নি। তুমি শুধু শুধু টেনশন করছ। তবে আমি একটা বিষয় নিয়ে চিন্তিত।
: কী সেই বিষয়?
: গত পাঁচদিন ধরে আমাদের সায়েন্স টীচার, বাবলু স্যার স্কুলে আসছেন না। কিন্তু কেন তাও কেউ বলতে পারছেন না। অথচ স্যারের মতো করে কেউ আমাদের সায়েন্স বোঝান না। এ নিয়ে আমি শুধু নই; ক্লাসের সবার মন খারাপ।
: ও আচ্ছা, এই কথা! এ নিয়ে চিন্তা করার কি আছে। তোমাদের স্যার হয়তো কোনো কাজে স্কুল থেকে ছুটি নিয়েছেন। আবার সময় হলে নিশ্চয় ফিরে আসবেন।

: না মা, তাই যদি হতো স্যারের গায়েব হওয়ার বিষয়ে অন্যান্য স্যাররা তো আমাদেরকে কিছু বলতে পারতেন।

: তোমাদের এতো বেশি আগ্রহের কারণে হয়তো স্যাররা কিছু বলছেন না। থাক, এসব নিয়ে চিন্তা না করে আগে ভাত খেয়ে নাও। কথা বলতে বলতে অনেক সময় হয়ে গেছে।
: জি, মা।

এই কথা বলে পৃথা দুপুরের খাবার খেতে লাগল। খাবার খাওয়া শেষ করে পৃথা সায়েন্স বুকটা হাতে নিয়ে নিজের বেডরুমের দিকে চলে এলো। কিছুক্ষণ বইয়ে চোখ বুলাতে বুলাতে ওর দু’চোখে গভীর ঘুম নেমে আসে। মুহূর্তে সে নিজেকে একটি দূর পাহাড়ের ঢালে আবিস্কার করে। আশপাশে তাকিয়ে দেখে, ও একা নয়; ওর সাথে ওপর ঘনিষ্ঠ সহপাঠী নিশি, ফিহা, রূপমিতাও আছে। ওরা ওদের সায়েন্স প্রজেক্টের উদ্ভিদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে এখানে এসেছে। দুপুর থেকে হাঁটতে হাঁটতে ওরা খুব ক্লান্ত হয়ে গেছে। একটানা হেঁটে হেঁটে ওরা পাহাড়টির একেবারে শীর্ষের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এরইমধ্যে নিশি রূপমিতার দিকে তাকিয়ে বলল,
: এই তোরা সবাই এবার একটু থামবি? আমার খুব খিদে পেয়েছে। দুপুর থেকে একটানা হাঁটছি।

রূপমিতা ক্লান্ত হয়ে বলল,
: হ্যাঁরে সই, আমারও খুব খিদে পেয়েছে।
পাশ থেকে ফিহা বলে ওঠলো,
: আমারও।

পৃথাকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফিহা আবার বলল,
: কিরে পৃথা, তুই যে কিছু বলছিস না। তোর কী খিদে লাগেনি?

পৃথা স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে জবাব দিলো,
: না, আমি ঠিক আছি। তোদের এতো বেশি খিদে লাগলে এখন কী করবি? এখানে তো কোনো দোকানপাট পাবি না। তো আশপাশে ঘুরে ঘুরে দেখ খাওয়ার মতো কোনো ফল পাওয়া যায় কিনা।

রূপমিতা বলল,
: আর তুই কী করবি?

পৃথা বলল,
: আমি এদিকটায় ঘুরে ঘুরে দেখি কাঙ্ক্ষিত উদ্ভিদ খুঁজে পাই কিনা।

: আচ্ছা।

এই বলে রূপমিতা, নিশি ও ফিহা খাদ্যের খোঁজে বেরিয়ে গেল। আর পৃথা একাকী পাহাড়ের আরো শীর্ষদেশে যেতে লাগল। হঠাৎ দরজায় ঘন্টা বাজার মতো একটা আওয়াজ পৃথার কানে ভেসে আসে। সে ভয়ে দাঁড়িয়ে যায়। আর মনে মনে ভাবতে থাকে, ‘এই নির্জন পাহাড়ে দরজায় ঘন্টা বাজার আওয়াজ কি করে আসতে পারে। তবে কী এখানে আমরা ছাড়া অন্য কেউ আছে!’
মুহূর্তে ওর চোখের সামনে পাহাড়ের দু’দিকে ফাঁকা হয়ে যাবার দৃশ্য দেখে পৃথা স্তব্ধ হয়ে যায়। ওর কাছে মনে হয় পাহাড়ের ভিতরে একটি সুড়ঙ্গ আছে। এবং তার মূল ফটক আপনাআপনি খুলে গেছে। এবার এক পা দুই পা করে সে সুড়ঙ্গের খুব কাছাকাছি চলে আসে। কৌতূহলী হয়ে ভিতরের দিকে তাকিয়ে দেখে ভিতরে খুব অন্ধকার। বাইরে থেকে মনে হচ্ছে ওদের বাবলু স্যারের গলার মতো কেউ একজন বিজ্ঞান ক্লাস নিচ্ছেন। একমুহূর্তে পৃথার মনে আশার সঞ্চার হয়। সে খুব মনোযোগী হয়ে ক্লাস শুনতে থাকে। এরপর আনমনে পৃথা বিড়বিড় করতে লাগল,
: হ্যাঁ, ঠিকই তো আমাদের বাবলু স্যারই ক্লাস নিচ্ছেন। কিন্তু এমন নির্জন অন্ধকার পাহাড়ের সুড়ঙ্গের ভিতরে স্যার কাদের ক্লাস নিচ্ছেন! নাকি আমি কোনো গোলক ধাঁধাঁর মধ্যে পড়ে গেছি! ধূর! কিছুই মাথায় আসছে না।
হঠাৎ সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে থেমে থেমে একটা আওয়াজ এলো,
: পৃথা, এমন আঁধারের মাঝে ওখানে একাকী দাঁড়িয়ে কী ভাবছ?

এবার পৃথা ভালোভাবে সুড়ঙ্গের ভিতরের দিকে লক্ষ্য করল। হঠাৎ দেখতে পেল সুড়ঙ্গের এককোণে বাতি জ্বলছে। আর পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন ওদের সায়েন্স টীচার। মুহূর্তে ওর মন থেকে সব ভয় উধাও হয়ে গেল। সে স্যারকে উদ্দেশ্য করে বলল,
: আসসালামু আলাইকুম, স্যার।

: ওয়ালাইকুম আসসালাম, তুমি এখানে কীভাবে এলে?

: জি, স্যার। আমি একা নই; আমার সাথে নিশি, ফিহা ও রূপমিতা আছেও।
আমরা এসেছি আপনার দেয়া সায়েন্স প্রজেক্ট ওয়ার্কের জন্য উদ্ভিদ সংগ্রহ করতে।
: তোমাদের কাঙ্ক্ষিত উদ্ভিদ কি পেয়েছ?

: না স্যার, এখন পাইনি। আমরা খুঁজতে খুঁজতে এখানে চলে এসেছি।

: চিন্তা করো না। তোমরা ঠিক জায়গায় চলে এসেছ। এই সুড়ঙ্গের ডান দিকে কিছুদূর গেলে নানান বৈচিত্র্যের উদ্ভিদ পাবে। নিজেদের পছন্দমত সংগ্রহ করতে পারবে।

: ধন্যবাদ, স্যার। কিন্তু আমাদের দুঃখ হচ্ছে আপনাকে নিয়ে। আজ এতোদিন হয়ে গেছে আমরা আপনার কোনো ক্লাস পাচ্ছি না। এ নিয়ে আমাদের ক্লাসের সবার মন খারাপ।

বাবলু স্যার মৃদু হেসে বললেন,
: কেন? তোমাদের ক্লাসে আমার পরিবর্তে অন্য টীচার আসেননি?

: এসেছেন। কিন্তু আমরা সায়েন্সের মজা হারিয়ে ফেলতে বসেছি। স্যার, আপনি আমাদেরকে ছেড়ে এমন নির্জন পাহাড়ের সুড়ঙ্গের মধ্যে কেন পড়ে আছেন? প্লিজ স্যার, আবার আমাদের ক্লাসে ফিরে আসুন।

এবার বাবলু স্যার গম্ভীর হয়ে বললেন,
: শোন মা, আমি একটি বিশেষ কাজে এখানে এসেছি। এখানে তোমাদের মতো আরো কিছু শিক্ষার্থী আছে। অবশ্য ওরা তোমাদের মতো নয়। ভিন্নগ্রহের। ওদের সায়েন্স ক্লাস নিচ্ছিলাম। তো তোমরা কোনো চিন্তা করো না। আগামী বৃহস্পতিবার তোমাদের ক্লাসে ব্যতিক্রম কিছু দেখতে পাবে।

পৃথা চোখ কপালে তুলে বলল,
: ভিন্নগ্রহের শিক্ষার্থীদের সায়েন্স শিখে কী লাভ, স্যার?
: লাভ আছে। ওরাও তোমাদের মতো জ্ঞানপিপাসু। এই পৃথিবী সম্পর্কে ওরা আরও জানতে চায়। আগামীর পৃথিবী ওরা ওদের করতে চায়। মনে রেখো, কারও এগিয়ে যাওয়া বা পিছিয়ে পড়া নির্ভর করে তাদের শিক্ষা-দীক্ষার ওপর। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে তোমাদেরকে আরও বেশি মনোযোগী হয়ে পড়াশোনা করতে হবে। ক্লাসে গিয়ে ওদের ব্যাপারে বিস্তারিত বলব। এখন আর কথা বাড়িও না। সন্ধ্যা নেমে গেছে। চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। আর নিশি, ফিহা আর রূপমিতাও মনে হয় এদিকে আসছে। ওদের নিয়ে সাবধানে বাসায় ফিরে যাও। আরেকটা কথা, আমি যে এখানে আছি একথা কাউকে বলবে না। এমনকি রূপমিতাদেরকেও না। বললে তোমাদের খুব ক্ষতি হয়ে যাবে, বুঝলে?

পৃথা মাথা নেড়ে বলল,
: জি স্যার, আর কাউকে বলব না। কিন্তু বৃহস্পতিবার আমাদের ক্লাসে আসবেন তো? আমরা আপনার অপেক্ষায় থাকব।

বাবলু স্যার আবার হাসলেন। এরপর পৃথার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে বললেন,
: গন্তব্যে ফিরে যাও। বৃহস্পতিবার তোমাদের ক্লাসে আমি আসব। তোমরা সবাই নিজ নিজ উদ্ভিদ নিয়ে হাজির হবে।
একথা বলতে না বলতেই সুড়ঙ্গের মুখ আবার বন্ধ হয়ে গেল।
ভয়ে “নিশি, ফিহা, রূপমিতা” বলে পৃথা চিৎকার করতে লাগল।
পৃথার চিৎকার শুনে ওর মা পাশের কক্ষ থেকে দৌড়ে আসেন। ততক্ষণে পৃথা মেঝেতে গড়াগড়ি করে বলতে লাগল,
: নিশি, আমাদের সায়েন্স টীচার এখানে আছেন। ফিহা, স্যার এখানে ভিন্নগ্রহের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান ক্লাস নিচ্ছেন। রূপমিতা, আসছে বৃহস্পতিবার স্যার আমাদের ক্লাসে উপস্থিত থাকবেন।

কবির কাঞ্চন
কবি ও গল্পকার
সহকারী প্রধান শিক্ষক
জেলা প্রশাসন স্কুল ও কলেজ (ইংরেজি ভার্সন) নোয়াখালী