চীনের কৃষি ব্যবস্থাপনা ও প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষণে অভিজ্ঞতা নিলেন বাংলাদেশি সাংবাদিকরা

সাকিব সিকান্দার, শায়ানসি (চীন)

চীন সরকারের আমন্ত্রণে শায়ানসি প্রদেশে ১০ দিনের সফরে থাকা বাংলাদেশের বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা সফরের পঞ্চম ও ষষ্ঠ দিনে চীনের আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা, স্মার্ট ফলবাগান, ঐতিহাসিক প্রাসাদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণের অভিজ্ঞতা নিয়েছেন। পাশাপাশি সুই ও থাং রাজবংশের ইতিহাস ও সংস্কৃতিভিত্তিক মনোমুগ্ধকর লাইভ শো উপভোগ করেছেন তারা।

সফরের পঞ্চম দিন ইয়ান’আন থেকে লুওছুয়ানের উদ্দেশে যাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হয়। সেখানে সি ইয়ে কৃষি উন্নয়ন কোম্পানি পরিদর্শন করেন সাংবাদিকরা। প্রতিষ্ঠানটির আপেল প্যাকেজিং শিল্পের বিভিন্ন কার্যক্রম সরেজমিনে দেখেন তারা।

উত্তর শায়ানসি অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ আপেল প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠানটি আপেলের ঢেউটিন বাক্স, উপহারের রঙিন বাক্স, ফোম সাপোর্ট ও সুরক্ষা জালসহ বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজিং সামগ্রী তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক প্রায় ১০ লাখ সেট বাক্স উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।

এরপর লাওমিয়াও টাউনের পানহু গ্রামের স্মার্ট ফলবাগান পরিদর্শন করেন সাংবাদিক নেতারা। আধুনিক এই স্মার্ট আপেল বাগানে মাটির আর্দ্রতা, কীটপতঙ্গের অবস্থা ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণে স্মার্ট সেন্সর ব্যবহার করা হয়। রয়েছে স্বয়ংক্রিয় সেচব্যবস্থা, দূরনিয়ন্ত্রিত শিলাবৃষ্টি প্রতিরোধী জাল এবং ড্রোনের মাধ্যমে ফসল সুরক্ষার ব্যবস্থা।

বিগ ডেটা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় বাগানে পানি ও সার প্রয়োগ, গাছের ছাঁটাই এবং রোগবালাই ও কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের কাজ পরিচালনা করা হয়।

বাংলাদেশের কৃষিখাতে এমন প্রযুক্তির ব্যবহার সম্ভব কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ও কবি হাসান হাফিজ বলেন, বাংলাদেশের সিলেট ও পার্বত্য অঞ্চলেও এ ধরনের আপেল চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। চীন একটি পুরো অঞ্চলকে আপেল উৎপাদনের মাধ্যমে ব্র্যান্ডিং করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। তবে এ জন্য দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের উদ্যোগ প্রয়োজন।

চীনের কৃষির আধুনিক ব্যবস্থাপনা দেখে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মহাসচিব মো. মাইনুল হাসান বলেন, এমন প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থা দেখে তিনি অভিভূত। বাংলাদেশেও এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার এবং চীনের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তবে এসব প্রযুক্তি দেশে নিয়ে আসা ও কার্যকরভাবে ব্যবহারের জন্য নীতিনির্ধারকদের ইতিবাচক উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সফরের ষষ্ঠ দিনে সাংবাদিক নেতারা লিনইউ কাউন্টির চিউছেংকোং প্রাসাদ জাদুঘর, সুই রেনশৌ প্রাসাদ এবং থাং রাজবংশের চিউছেংকোং প্রাসাদের ধ্বংসস্তূপ পার্ক পরিদর্শন করেন।

চিউছেংকোং প্রাসাদ সুই রাজবংশের সময় নির্মিত হয়। সে সময় এর নাম ছিল রেনশৌ প্রাসাদ। পরে থাং রাজবংশের সময় এর নাম পরিবর্তন করে চিউছেংকোং রাখা হয়। সুই ও থাং—দুই রাজবংশের সম্রাটদের গ্রীষ্মকালীন রাজপ্রাসাদ হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতো। ‘দূরবর্তী রাজপ্রাসাদের শ্রেষ্ঠ’ হিসেবেও পরিচিত এই ঐতিহাসিক স্থানে ২ হাজার ১৬২টি নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে।

প্রাসাদের ধ্বংসস্তূপ পার্কে সংরক্ষিত রয়েছে বিখ্যাত ‘চিউছেংকোং লিচুয়ান শিলালিপি’, যা চীনা ক্যালিগ্রাফির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ইতিহাস সংরক্ষণে চীনের উদ্যোগের প্রশংসা করে বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রেজওয়ান উজ জামান বলেন, শায়ানসির প্রত্যন্ত পাহাড়ঘেরা এলাকাতেও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি ইতিহাস ও ঐতিহ্য অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। জাদুঘর ও প্রাচীন প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষণের ব্যবস্থা তাকে বিস্মিত করেছে।

রাতে লিনইউয়ের চিউছেংকোং পর্যটন এলাকায় সাংবাদিক নেতারা উপভোগ করেন প্রায় ৬০ মিনিটের একটি বিশেষ প্রাকৃতিক দৃশ্যভিত্তিক লাইভ শো। সুই ও থাং রাজবংশের সময়কার চিউছেংকোং প্রাসাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে নির্মিত এ পরিবেশনায় প্রাকৃতিক মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয় শিহাইউয়ানের পাহাড় ও জলাশয়।

পানির পর্দায় প্রক্ষেপণ, ত্রিমাত্রিক আলোকসজ্জা এবং থাং যুগের নৃত্যের মাধ্যমে সম্রাট থাং তাইচংয়ের লি ছুয়ান ঝরনা আবিষ্কার, বিভিন্ন দেশের দূতদের রাজদরবারে আগমনসহ ঐতিহাসিক নানা ঘটনা তুলে ধরা হয়।

বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব বাবুল তালুকদার বলেন, প্রাচীন প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষণের বিষয়টি তার কাছে অসাধারণ লেগেছে। পাশাপাশি চীনা ক্যালিগ্রাফি ও স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনা তাকে মুগ্ধ করেছে। অতিথিদের ক্যালিগ্রাফি উপহার দেওয়াকে তিনি চীনের আতিথেয়তার অন্যতম নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেন।

চীন সরকারের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা ১০ দিনের সফরে শায়ানসি প্রদেশে অবস্থান করছেন। প্রতিনিধি দলে রয়েছেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ও কবি হাসান হাফিজ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মহাসচিব ও দৈনিক ইনকিলাবের বিশেষ প্রতিবেদক মো. মাইনুল হাসান, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের বিশেষ প্রতিবেদক রেজওয়ান উজ জামান এবং বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ও দৈনিক দিনকালের প্রধান ফটোসাংবাদিক বাবুল তালুকদারসহ অন্যরা।

সফরে তাদের সঙ্গে রয়েছেন চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি) বেইজিং অফিসের বাংলা বিভাগের পরিচালক ইয়ু কুয়াংইউয়ে আনন্দী, সাংবাদিক আকাশ ও রুবি এবং ক্যামেরাম্যান ছি পেং। সফরকারী দলে আরও রয়েছেন শাংহাই আন্তর্জাতিক বিষয়ক গবেষণা একাডেমির মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক চিন লিয়াং সিযাং, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া গবেষণাকেন্দ্রের পরিচালক চৌ শি সিন এবং সমসাময়িক চীন ও বিশ্ব গবেষণা একাডেমির বৈদেশিক ভাষা উদ্ভাবন গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক চাং চিউ আন।

চীন সরকারের আমন্ত্রণে আয়োজিত এ সফরের তত্ত্বাবধানে রয়েছে চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি)। ‘চীন-বিদেশি প্রতিনিধি যৌথ সাক্ষাৎ আয়োজন’-এর অংশ হিসেবে ‘রোমিং চায়না, শায়ানসি ট্যুর’ শীর্ষক এ সফরের আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, সংস্কৃতি ও ভাববিনিময় আরও জোরদার করাই এ ধরনের সফরের অন্যতম লক্ষ্য।

সূত্র: সিএমজি