গত ৮ ও ৯ অক্টোবর বেইজিংয়ে চীন-ইইউ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরামর্শ প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে চারটি প্রধান ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে ১৬টি ফলাফল ও ঐকমত্যের তালিকা তৈরি করেছে উভয় পক্ষ। সেইসঙ্গে ২০২৭ সালের মার্চে এ প্রক্রিয়ার তৃতীয় নিয়মিত বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে সম্মত হয়েছে তারা।
এসব অগ্রগতি প্রমাণ করে, সংলাপ ও পরামর্শের মাধ্যমে মতপার্থক্য নিয়ন্ত্রণ এবং যথাযথভাবে সমাধানের সদিচ্ছা ও প্রজ্ঞা চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন—উভয়েরই রয়েছে। এর ফলে সংঘাতের বিস্তার এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন ও ইইউ বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে এবং ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখতে রাজি হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগও কিছুটা প্রশমিত হয়েছে।
চীন ও ইইউ সর্বাত্মক কৌশলগত অংশীদার। তাদের সম্পর্কের মূল সুর হওয়া উচিত সহযোগিতা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইইউর ভেতরে সুরক্ষাবাদী প্রবণতা জোরালো হয়েছে। কিছু রাজনীতিক চীনের কথিত ‘অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা’ এবং ‘চীন-ইইউ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অসামঞ্জস্য’ নিয়ে ভুল ধারণা ছড়িয়ে স্বাভাবিক দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতায় বাধা সৃষ্টি করছেন।
দ্বিতীয় নিয়মিত বৈঠকে গৃহীত ফলাফল ও ঐকমত্যের তালিকার উল্লেখযোগ্য দিকগুলো কী? এ বিষয়ে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা গবেষণা ইনস্টিটিউটের ইউরোপ গবেষণা বিভাগের উপগবেষক শিয়া ছুয়ানশিন ‘সিএমজি সম্পাদকীয়’-এর সঙ্গে আলোচনায় বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো, উভয় পক্ষ আন্তর্জাতিক মহলের ব্যাপক মনোযোগ পাওয়া গাড়িশিল্প-সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে ধারাবাহিক আলোচনার আওতায় এনেছে।
গাড়িশিল্প চীন-ইইউ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রচলিত ও বৈদ্যুতিক গাড়ি-সংক্রান্ত বাণিজ্য বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে উভয় পক্ষ। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর ভর্তুকিবিরোধী তদন্তের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর মূল্য-প্রতিশ্রুতি এবং পুনর্বিবেচনা-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে তারা।
এতে উত্তেজনা এড়ানোর পাশাপাশি চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত রপ্তানি স্বার্থ কার্যকরভাবে সুরক্ষিত হয়েছে। এ ছাড়া রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও মেধাস্বত্বের মতো ক্ষেত্রেও অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
এসব বিষয় থেকে বোঝা যায়, চীন-ইইউ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরামর্শ প্রক্রিয়া এখন কাঠামো গঠনের পর্যায় পেরিয়ে বাস্তব ফলাফল অর্জনের ধাপে প্রবেশ করেছে।
বিশ্বের দুটি প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীন ও ইইউর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তবে তা নিরসনে প্রকৃত তথ্য বিশ্লেষণ এবং সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করা জরুরি। বর্তমানে ইইউর অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে মূলত দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ সমস্যা দায়ী; চীনের উন্নয়ন থেকে আসা তথাকথিত ‘আঘাত’ নয়।
ইউরোপের কিছু রাজনীতিকের ‘অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা’র অভিযোগ মূলত পণ্য বাণিজ্যের ঘাটতির একক সূচকের ওপর ভিত্তি করে করা হয়। অথচ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনের সঙ্গে সেবা বাণিজ্যে ইইউর উদ্বৃত্ত ছিল ৪৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। শুধু মেধাস্বত্ব ব্যবহারের ফি বাবদই চীন প্রতি বছর ইইউকে প্রায় ১০ বিলিয়ন ইউরো পরিশোধ করে।
এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, চীন ইউরোপের সমস্যার মূল কারণ নয়; বরং সমস্যা সমাধানের অংশীদার হতে পারে।
চলতি বছর চীনের ‘পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনা’র সূচনা হয়েছে। এ পরিকল্পনা চলাকালে বৈদেশিক বাণিজ্যের মান ও দক্ষতা বাড়ানো, আমদানি-রপ্তানির সুষম উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া, আমদানিতে উৎসাহ দিতে প্রযুক্তি, পণ্য ও সেবার তালিকা সংশোধন এবং বিদেশি বিনিয়োগের প্রবেশসংক্রান্ত নেতিবাচক তালিকা সংকুচিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পদক্ষেপ ইইউসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য আরও বিস্তৃত বাজারের সুযোগ তৈরি করবে।
মে মাসে চীন-ইইউ চেম্বার অব কমার্সের প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া ৬৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান চীনে তাদের ব্যবসা বজায় রাখা বা সম্প্রসারণের পক্ষে মত দিয়েছে।
দ্বিতীয় নিয়মিত বৈঠকে চীন ও ইইউ উভয় পক্ষই একমত হয়েছে যে, স্থিতিশীল ও সুস্থ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক শুধু দুই পক্ষের প্রতিষ্ঠান ও জনগণেরই উপকার করে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।
এবারের বৈঠকে উন্মুক্ত ও গঠনমূলক উপায়ে যোগাযোগ ও সহযোগিতা আরও জোরদার করার পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সংস্কার-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে চীন-ইইউ। বহুপাক্ষিকতা এগিয়ে নেওয়া এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার উন্নয়নে এ সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: সিএমজি