সাকিব সিকান্দার
সেদ্ধ করা হোক কিংবা খোলা আগুনে আস্ত ভুনা, ভেড়ার মাংস রান্নার রয়েছে নানা পদ্ধতি ও বাহারি আয়োজন। মাংসের বিভিন্ন অংশ দিয়ে তৈরি হয় বিচিত্র সব পদ। চীনের ইনার মঙ্গোলিয়া স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতিতে ভেড়ার মাংস কেবল একটি জনপ্রিয় খাবার নয়, বরং এটি স্থানীয় জীবনযাপন, ঐতিহ্য ও পশুপালননির্ভর সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৭ নভেম্বর চীনা বর্ষপঞ্জির ২৪টি সৌরপদের অন্যতম ‘লি তোং’ বা শীতের সূচনা। শীতের আগমনের এই সময়ে উত্তর চীনের মানুষের মধ্যে শরীর উষ্ণ রাখে এমন খাবার খাওয়ার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে। ইনার মঙ্গোলিয়ায় এই মৌসুমি খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মিশে আছে স্থানীয় পশুপালন সংস্কৃতি। তাই শীতের শুরু মানেই এ অঞ্চলের মানুষের খাদ্যতালিকায় ভেড়ার মাংসের বিশেষ আয়োজন।
ইনার মঙ্গোলিয়া ক্যাটারিং অ্যান্ড হোটেল ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি লাং লিসিংয়ের ভাষায়, ‘নিঃসন্দেহে ভেড়ার মাংসই ইনার মঙ্গোলিয়ার খাবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।’
চীনা ভাষায় ‘মেংছান’ নামে পরিচিত ইনার মঙ্গোলিয়ার নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে মূলত তিনটি উপাদানকে কেন্দ্র করে মাংস, দুগ্ধজাত খাবার এবং ময়দা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পদ। তবে এসবের মধ্যে ভেড়ার মাংসের অবস্থান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
লাং লিসিংয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইনার মঙ্গোলিয়া চীনের অন্যতম প্রধান ভেড়া পালনকারী অঞ্চল। এখানে প্রতিবছর ১০ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি ভেড়ার মাংস উৎপাদিত হয়। শিলিন গোল লিগ, হুলুনবুইর ও হরকিনের মতো বিস্তীর্ণ তৃণভূমি ভেড়া চারণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
এ অঞ্চলে ভেড়ার বেশ কয়েকটি উন্নত ও বিখ্যাত জাত রয়েছে। লাংয়ের মতে, তৃণভূমিতে বেড়ে ওঠা ভেড়ার মাংসের গুণগত মান অনেকাংশেই নির্ভর করে তাদের প্রাকৃতিক খাদ্যাভ্যাসের ওপর। বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ ও ঘাস খেয়ে বেড়ে ওঠায় এসব ভেড়ার মাংসে তৈরি হয় স্বতন্ত্র স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য।
ইনার মঙ্গোলিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘শৌবারো’ বা হাতে খাওয়ার ভেড়ার মাংস। এই পদ তৈরিতে মাংসের বড় বড় টুকরা সামান্য মসলা দিয়ে পানিতে সেদ্ধ করা হয়। এতে মাংসের স্বাভাবিক স্বাদ ও কোমলতা অক্ষুণ্ন থাকে। রান্না শেষে ছোট ছোট অংশে কেটে পরিবেশন করা হয়। স্থানীয় রীতিতে সাধারণত হাত দিয়েই এই মাংস খাওয়া হয়। সঙ্গে থাকে বিশেষ ধরনের ডিপিং সস।
শীতের দিনে উত্তর চীনের আরেকটি জনপ্রিয় খাবার ভেড়ার মাংসের হটপট। এতে পাতলা করে কাটা মাংস ফুটন্ত ঝোলে অল্প সময় ডুবিয়ে রান্না করা হয়। ফলে মাংসের কোমলতা ও স্বাভাবিক স্বাদ বজায় থাকে। শীতের সন্ধ্যায় গরম হটপট ঘিরে পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে বসে খাওয়ার আয়োজনও এ অঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতির পরিচিত দৃশ্য।
এ ছাড়া আস্ত ভেড়া ভুনা ইনার মঙ্গোলিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহ্যবাহী খাবার। বিশেষ করে বিভিন্ন ভোজ, উৎসব ও বিশেষ আয়োজনে এটি পরিবেশন করা হয়। পুরো ভেড়াকে মসলা মাখিয়ে ধীরে ধীরে আগুনে ভুনা করা হয়। এতে বাইরের অংশ সোনালি ও মচমচে হয়ে ওঠে, আর ভেতরের মাংস থাকে নরম ও রসালো।
ভেড়ার মাংস দিয়ে তৈরি খাবারের বৈচিত্র্য এখানেই শেষ নয়। ভেড়ার রক্ত দিয়ে তৈরি সসেজ এবং ‘দুবাওরো’ নামে পরিচিত ভেড়ার পাকস্থলীর আবরণে মাংস মুড়িয়ে রান্না করা পদও স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খাবারের তালিকায় রয়েছে।
ইনার মঙ্গোলিয়ার পশুপালননির্ভর জনগোষ্ঠীর কাছে শীতের আগমন ঐতিহাসিকভাবেই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ঐতিহ্যগতভাবে প্রথম তুষারপাতের পর পশু জবাই ও মাংস সংগ্রহের মৌসুম শুরু হতো। শীতল আবহাওয়া মাংস সংরক্ষণের জন্য প্রাকৃতিকভাবে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করত।
একই সঙ্গে এ সময়টি ছিল ফসল ঘরে তোলার আনন্দ উদ্যাপনের উপলক্ষ। পরিবারের সদস্যরা একত্র হয়ে নানা ধরনের ভেড়ার মাংসের পদ তৈরি করতেন এবং আনন্দ-উৎসবে মেতে উঠতেন। এভাবেই শীতের শুরুতে মাংস খাওয়ার রীতি ধীরে ধীরে স্থানীয় সংস্কৃতি ও পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে শীতকালে ভেড়ার মাংস খাওয়ার পাশাপাশি সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। পুষ্টিবিদ সিং ইয়ানছুন ভেড়ার মাংসের সঙ্গে শীতকালীন মিষ্টিকুমড়া, বাঁধাকপি, মাশরুমের মতো সবজি এবং আলু ও মিষ্টি আলু খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, এসব খাবার খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি ভেড়ার মাংসের তুলনামূলক ভারী স্বাদের সঙ্গে ভারসাম্য তৈরি করে।
ইনার মঙ্গোলিয়ার ভেড়ার মাংসের খাদ্যসংস্কৃতি শুধু পরিচিত কয়েকটি পদেই সীমাবদ্ধ নয়। এই ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করতে লাং লিসিংয়ের উদ্যোগে ভেড়ার মাংসের একটি পূর্ণাঙ্গ ভোজের জন্য মানসম্মত পরিবেশন পদ্ধতিও তৈরি করা হয়েছে।
এর সর্বশেষ সংস্করণে রয়েছে মোট ২০টি পদ। এসব খাবার তৈরিতে ব্যবহার করা হয় ভেড়ার ২১ ধরনের মাংসের অংশ ও ভক্ষণযোগ্য অঙ্গ। তালিকায় রয়েছে মাথা, জিহ্বা, যকৃৎ, পাঁজর, পাকস্থলী ও লেজসহ বিভিন্ন অংশ।