চীনের শেষ সম্রাট আইসিন-গিয়োরো পু ঈ-এর জীবনের শেষ অধ্যায়টি রাজনৈতিক পুনর্মিলন বা রিকনসিলিয়েশনের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মাত্র তিন বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করা পু ঈ যৌবনে জাপানিদের সহায়তায় মাঞ্চুকুয়ো নামক রাষ্ট্র গঠন করে সম্রাট হয়েছিলেন। মাওলানা ভাসানী তাঁর ‘মাও সে তুং এর দেশে’ ভ্রমণকাহিনিতে উল্লেখ করেছেন, ষাটের দশকে চীনের কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া পু ঈ-এর সঙ্গে তাঁর চার ঘণ্টার দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল।
১৯৪৯ সালে চীনের বিপ্লব পরবর্তী সময়ে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দশ বছর কারাভোগ করেন পু ঈ। এই দীর্ঘ সময় তিনি নিজের আদর্শিক বিচ্যুতি ও ভুলগুলো অনুধাবন করার সুযোগ পান। কারাভোগের পর তাঁর মধ্যে যে আত্ম-সংস্কার ও অনুশোচনা তৈরি হয়, তা তাঁকে সমাজতান্ত্রিক চীনের একজন নিবেদিতপ্রাণ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। এমনকি তিনি সাধারণ নাগরিকের মতো টিকিট কেটে নিজের একসময়ের রাজপ্রাসাদ ‘ফরবিডেন সিটি’ ঘুরে দেখার মতো মানসিকতা অর্জন করেছিলেন।
বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী দুই বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর রাজনৈতিক রিকনসিলিয়েশনের বিষয়টি বারবার আলোচনায় উঠে আসছে। এক পক্ষ যখন জাতীয় ঐক্যের খাতিরে পুনর্মিলনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে, অন্য পক্ষ তখন এর তীব্র বিরোধিতা করছে। তবে এই আলোচনার কেন্দ্রে থাকা আওয়ামী লীগ যখন জুলাইয়ের সহিংসতাকে অস্বীকার করার রাজনীতিতে লিপ্ত, তখন এই রিকনসিলিয়েশনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
গত ৫ আগস্ট ভারতের দিল্লিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের অবস্থান আবারও স্পষ্ট হয়েছে। তারা ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলিকে অনুশোচনার যোগ্য কোনো বিষয় বলে মনে করে না। সজীব ওয়াজেদ জয় ও শেখ হাসিনার বক্তব্য থেকে এটি পরিষ্কার যে, শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো সহিংসতার জন্য ক্ষমা চাওয়ার কোনো তাগিদ তাঁদের মধ্যে নেই। অথচ রিকনসিলিয়েশনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো দোষী পক্ষের অনুশোচনা এবং ভুল স্বীকারের মানসিকতা।
শেখ হাসিনা রিকনসিলিয়েশনের কথা বললেও, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অনমনীয় অবস্থান এই প্রক্রিয়াকে অসম্ভব করে তুলছে। জুলাইয়ের শহীদদের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো ধরনের দায়বদ্ধতা ছাড়া পুনর্মিলনের প্রস্তাব সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার সুযোগ কম। বৈশ্বিক উদাহরণগুলো বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় হুবহু প্রয়োগ করা কঠিন, কারণ আমাদের প্রেক্ষাপট ও ক্ষমতা বদলের ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে রিকনসিলিয়েশনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও, এর বাস্তবায়নের কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। বিভক্ত এই সময়ে জাতীয় ঐক্যের অভাব এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অতীত ইশতেহার বাস্তবায়নের ব্যর্থতার ইতিহাস রিকনসিলিয়েশনের পথকে আরও সংকীর্ণ করে তুলছে। পাশাপাশি, এরশাদের স্বৈরশাসন পরবর্তী জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে ফেরার ঘটনাটি দেশীয় রিকনসিলিয়েশনের একটি উদাহরণ হলেও, সেখানে জবাবদিহিতার বিষয়টি ছিল অনুপস্থিত।
আওয়ামী লীগ যদি জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহকে অস্বীকার করার অবস্থান থেকে সরে না আসে, তবে নতুন প্রজন্মের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার মতো কলঙ্কিত হয়ে থাকবে। তাদের এই অনমনীয়তা কেবল রিকনসিলিয়েশনের ক্ষীণ সম্ভাবনাকেই নষ্ট করছে না, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চক্রকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলগুলো যদি দোষী পক্ষের ভুল শোধরানোর পরিবেশ তৈরি করতে না পারে, তবে রিকনসিলিয়েশন কেবল একটি তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকবে। ক্ষমা চাওয়া বা অনুশোচনার অভাব শুধু শীর্ষ নেতাদের মধ্যেই নয়, বরং দলের তৃণমূল পর্যায়েও প্রবল। এই রাজনৈতিক ইগো ও প্রতিহিংসাপরায়ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কোনো সুস্থ রাজনৈতিক সমঝোতা সম্ভব নয়।
পরিশেষে, আওয়ামী লীগকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কোন পথে হাঁটবে। রিকনসিলিয়েশনের দাবির পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করতে হলে তাদের অবস্থান থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া জরুরি। অন্যথায়, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পুনর্মিলনের স্বপ্ন কেবল একটি অলীক কল্পনা হিসেবেই রয়ে যাবে, যা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
পু ঈ তাঁর যৌবনে চীনের কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে গিয়ে জাপানিদের সাহায্য করতে থাকেন এবং এর ফলে ১৯৩৪ সালে জাপান তাঁকে মাঞ্চুকুয়ো নামক একটি রাষ্ট্র গঠন করে তাঁকে সম্রাট ঘোষণা করে।
১৯৪৯ সালে চীনের বিপ্লবের পরে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ১০ বছর কারাভোগের পর যখন তাঁর সামগ্রিক ও আদর্শিক আত্ম-সংস্কার দৃশ্যমান হয়, তখন তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগের ডিনায়ালের রাজনীতি ও অবস্থান আবারও জনসমক্ষে প্রকাশিত হয় গত ৫ আগস্ট ভারতের দিল্লিতে তাদের একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে।
এই দীর্ঘ কারাভোগ মূলত ছিল তাঁর ভুল শোধরানো ও অনুশোচনা তৈরির একটি প্রক্রিয়া, যার ফলে তিনি তাঁর বাকি জীবনকে সমাজতান্ত্রিক চীনের উন্নয়নের জন্য উৎসর্গ করেন।
আমরা যখন জুলাই-পরবর্তী সময়ের দুই বছর পার করছি, ঠিক তখনই নানা পরিসরে রিকনসিলিয়েশনের আলোচনা দেখছি ও শুনছি।
তবে যে আওয়ামী লীগের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে রিকনসিলিয়েশনের আলাপ চলমান, সেই তারাই আবার জুলাইয়ে তাদের ভূমিকা নিয়ে যখন একধরনের ডিনায়াল বা অস্বীকারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন রিকনসিলিয়েশনের আলাপ কতটা যৌক্তিক সে প্রশ্নও আমাদের সামনে আসছে।
ফলে রিকনসিলিয়েশনের আলাপ চলমান থাকলেও এটা যে বেশ কঠিন এক বিষয়, তা বলার কোনো অপেক্ষা রাখে না।
ফলে বৈশ্বিক রিকনসিলিয়েশনের উদাহরণ নিয়ে যুক্তি দিলেও সেই উদাহরণ যে আমাদের দেশে কাজ করবে, সেটাও জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না।
আমরা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ এনসিপির নির্বাচনী ইশতেহারে রিকনসিলিয়েশনের কিছু প্রতিশ্রুতি দেখতে পেলেও, তারা কী করে এর বাস্তবায়ন করতে চায় সে বিষয়ে কোনো পরিষ্কার দিকনির্দেশনা নেই।
আবার এ-ও সত্য যে আমরা কখনোই রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারের সবকিছু বাস্তবায়নের দৃষ্টান্ত ইতিপূর্বে দেখতে পাইনি।
যেখানে পরিষ্কারভাবে বোঝা গেল যে আওয়ামী লীগ মনেই করে যে ২০২৪ সালের এর জুলাই-আগস্টে তারা অনুশোচনা করার মতো কোনো কিছু করেনি।
আওয়ামী লীগের ডিনায়েলমূলক অবস্থান পরিষ্কারভাবে বোঝা গেল সজীব ওয়াজেদ জয় ও শেখ হাসিনার বক্তব্যে।
আবার যখন প্রশ্ন করা হয়, তাঁরা কি আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারী ও শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংসতার জন্য দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা প্রার্থনা করবেন?
অপর দিকে শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যের একপর্যায়ে বললেন যে তিনিও রিকনসিলিয়েশন চান।
তবে বর্তমান বাস্তবতায় এসবই অনেকটা অনিশ্চিত।
আবার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে অস্বীকার করে তাঁদের সেই রিকনসিলিয়েশন চাওয়াকেও যে এ দেশের অধিকাংশ মানুষ মেনে নেবে না, সেটাও বেশ পরিষ্কার।
জুলাইকে আওয়ামী লীগ যেভাবে উপস্থাপন করে তেমন অবস্থান থেকে ফিরে না এলে এ দেশের একটা প্রজন্মের কাছে তাদের অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতা জামায়াতে ইসলামীর ১৯৭১-এর ভূমিকার কালিমা বয়ে বেড়ানোর মতোই হবে।
এটা দোষী দলের জন্য যেমন প্রযোজ্য, ঠিক তেমনি ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের জন্যও প্রযোজ্য।
এমন একটি অবস্থায় বিগত সময়ের এরশাদের স্বৈরশাসনের পরে তাঁর বিচারপ্রক্রিয়ার উদাহরণও আমরা এখানে টানতে পারি।
যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টি একসময় এরশাদের নেতৃত্বেই আবারও রাজনীতিতে ফিরে আসে।
যদিও আমরা এই দৃষ্টান্তকে রাজনৈতিক রিকনসিলিয়েশনের উদাহরণ হিসেবে খুব একটা মানতে চাই না।
কিন্তু এটিও একটি হোম গ্রোওন বা দেশীয়, স্বতন্ত্র ও বাস্তববাদী রিকনসিলিয়েশনের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
যদিও এখানে ঠিক রিকনসিলিয়েশনের সব পূর্বশর্ত যেমন জবাবদিহি, সত্য উদ্ঘাটন, ভুক্তভোগীদের দুর্দশাকে স্বীকার করে নেওয়া, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে আমূল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, এবং ভুক্তভোগীদের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং অতীতে সংঘটিত নিপীড়ন ও অধিকার লঙ্ঘনের সামাজিক স্বীকৃতির বিষয়গুলো ছিল না।
তাই আমাদের রিকনসিলিয়েশনের জনপরিসরের পশ্চিমা মডেলের আলাপের বাইরে গিয়ে দেশীয় বা স্বতন্ত্র ও বাস্তববাদী মডেল নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে।