জেলার সদর উপজেলার সবজি চাষীরা আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে আগাম জাতের শীতকালীন সবজি চাষ ও ফসল পরিচর্যায় এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ পরিচালক (শস্য) মো. আনিসুজ্জামান গতকাল বুধবার বাসস’কে বলেন, দিনাজপুরকে দেশের শস্য ভাণ্ডার বলা হয়। জেলার সবগুলো উপজেলায় অধিকাংশ শস্যই উৎপাদিত হয়ে থাকে। চলতি বছর জেলার সদর উপজেলাসহ সবগুলো উপজেলায় কৃষকরা আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কৃষকরা শীতের আগমনে মৌসুমের শুরুতে আগাম জাতের শীতকালীন সবজি বাজারজাত করে অধিক লাভের আশা করছেন। শীতের সবজি বাজারে উঠতে শুরু করেছে এবং ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে।
তিনি বলেন, সাধারণত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসে শীতকালীন সবজি বাজারে আসে। সে সময় আমদানি বেশি থাকায় কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পান না। কিন্তু বর্ষার শেষ দিকে কার্তিক মাসের প্রথম থেকে বাজারে সবজির দাম ও চাহিদা দুটোয় বেশি থাকে। এ বিষয়টি মাথায় রেখেই সবজি চাষীরা চলতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই সবজি চাষযোগ্য উঁচু জমি প্রস্তুত করে চাষাবাদ শুরু করেছেন।
সরেজমিনে দিনাজপুর সদর উপজেলার নশিপুর কর্ণাই, গোলাপগঞ্জ, সুন্দরবন, ফাজিলপুর ও আউলিয়াপুর গ্রামের শীতকালীন শস্য ক্ষেতের মাঠ ঘুরে এই চিত্র দেখা গেছে।
সদর উপজেলার কর্ণাই গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম (৪২) বাসস’কে জানান, তিনি চলতি বছর তার ৬০ শতক জমিতে ৩ ভাগে আগাম জাতের সবজি চাষ শুরু করেছেন। এরমধ্যে আগাম জাতের ফুলকপি, বাঁধাকপি, কাঁঠালি বেগুন ও টমেটো চাষ করেছেন। তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুম শেষ এবং আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি হতে সবজি চাষ শুরু করেছি। এখন ক্ষেতের সবজি অনেকটা বেড়ে ওঠেছে। কিন্তু অসময়ে বৃষ্টি হওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখেই সবজি ক্ষেতে পানি নিষ্কাশনের জন্য ৩ ফুট পর পর ড্রেন করে পানি নেমে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। ফলে সবজি ক্ষতিগ্রস্তের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।
সবজি ক্ষেত থেকে বৃষ্টির পানি সহজেই নেমে যাচ্ছে। বৃষ্টির পানিতে যাতে সবজির কোনো ক্ষতি না হয়, সেজন্য সার্বক্ষণিক পরিচর্যার কাজ চলমান রেখেছি।
রফিকুলের সবজি ক্ষেতে আগাম জাতের ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, টমেটো ও মুলা আগামী ১০/১৫ দিনের মধ্যে বাজারে তুলতে পারবেন। তিনি আশা করছেন, কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময়ে তার ক্ষেতের সবজি বাজারে বিক্রি করতে পারবেন। এ সময় সবজি বাজারজাত করতে পারলে তিনি ভালো দাম পাবেন এবং লাভবান হবেন।
সদর উপজেলার উলিপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক (৪৮) বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরে আমরা কয়েকজন কৃষক আগাম জাতের এসব শীতকালীন সবজি চাষ করছি। এভাবেই আগাম জাতের সবজি চাষে আমরা লাভবান এবং সফল হয়েছি। আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করায় আমাদের পরিশ্রম ও খরচ দুটোই কমেছে। এবার একইভাবে কয়েক ধরনের সবজি চাষ করেছি। আশা করছি মৌসুমের আগেই সবজি বিক্রি করে ভালো দাম পাব।
ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদিপুর গ্রামের কৃষক সহিদ মিয়ার (৩৮) সাথে কথা বলে জানা গেছে, তিনি এবার ৩২ শতক জমিতে আগাম জাতের ফুলকপি চাষ করেছেন। ইতোমধ্যেই প্রায় ২১ হাজার টাকা খরচ হয়েছে এবং বাজারজাত করা পর্যন্ত খরচ হবে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। সহিদ আশা করছেন, ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যে তিনি বাজারে ফুলকপি তুলতে পারবেন।
তিনি বলেন, ‘গত বছর এই জমিতেই ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার ফুলকপি বিক্রি করেছিলাম। এবার ভালো কিছু আশা করছি। কপির পাশাপাশি শিম ও শসা চাষ করেছি। এবারে তার সবজির ফলন অনেক ভালো হয়েছে। গত বছরে তুলনায় এবারে আরও অধিক লাভবান হওয়ার আশা করছেন।
জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন বাসস’কে বলেন, ‘আগাম জাতের সবজি চাষ লাভজনক ফসল। তাই অনেক চাষী এই পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। এখানকার উৎপাদিত সবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো যায়। কৃষি বিভাগ আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও রোগবালাই দমনে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছেন।
দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো.আফজাল হোসেন বাসস’কে বলেন, চলতি মৌসুমে জেলার ১৩টি উপজেলায় ২৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে আগাম জাতের সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা ৭ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে। এছাড়াও ৩৬ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে এ বছর আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আধুনিক কৃষি পদ্ধতি ব্যবহারে কৃষকরা এখন সবজি চাষসহ সব ধরনের কৃষি পণ্য উৎপাদনে এগিয়ে যাচ্ছে।