৩৯ বছর একই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শেষে ঘোড়ার গাড়িতে রাজকীয় বিদায় নিলেন বেলা রানী দেব

প্রায় চার দশক আগে যে বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে পা রেখেছিলেন, সেখানেই কেটে গেল তাঁর পুরো কর্মজীবন। মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বেলা রানী দেব টানা ৩৯ বছরের দায়িত্ব পালন শেষে সোমবার অবসরে গেলেন। তাঁর এই বিদায় ছিল অত্যন্ত আবেগঘন ও বর্ণিল। বিদ্যালয়ের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সহকর্মীরা মিলে তাঁকে এক রাজকীয় বিদায় সংবর্ধনা প্রদান করেন।

সোমবার সকাল থেকেই আকাশ ছিল মেঘলা এবং দুপুরে শুরু হয় হালকা থেকে ভারী বৃষ্টি। প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজনের কোনো কমতি ছিল না। বিদ্যালয়ের সবুজ মাঠ কাদায় থকথকে হয়ে গেলেও আয়োজকেরা পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা কাটার মতো নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। প্যান্ডেলের নিচে সাজানো চেয়ারে বসে অতিথিরা এই আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হন। বিদ্যালয়ের প্রবেশপথের কাছেই অপেক্ষায় ছিল একটি সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়ি।

বেলা রানী দেব বিদ্যালয়ে পৌঁছালে বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তাঁকে ঘিরে ধরে। কেউ জড়িয়ে ধরেন, কেউ সালাম জানান, আবার নারী অভিভাবকেরা তাঁকে আলিঙ্গন করেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গৌরাঙ্গ চন্দ্র ধরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংবর্ধনা সভায় বক্তব্য দেন রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল শিকদার, বিশেষ অতিথি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল জলিল তালুকদার, উপজেলা সহকারী শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক মো. রেজওয়ানুল হক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও লেখক মহিদুর রহমান এবং অন্যতম আয়োজক তুহিন জুবায়ের।

প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও লেখক মহিদুর রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘ভালো শিক্ষকের নির্দেশক হচ্ছেন তাঁর শিক্ষার্থীরা। অনেক শিক্ষক পাওয়া যায়, কিন্তু শিক্ষার্থীরা মনে রাখেন কেবল এক-দুজনকে। বেলা রানী দেব তাঁর কর্মদক্ষতা ও ভালোবাসা দিয়ে অগণিত শিক্ষার্থীর মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন।’ সংবর্ধনার অন্যতম আয়োজক তুহিন জুবায়ের বলেন, ‘আমরা তাঁকে দিদিমণি বলে ডাকি। শৈশব থেকে তাঁকে দেখে আসছি। তাঁর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানো আমাদের কর্তব্য ছিল। আমরা চেয়েছি অবসর জীবনে তিনি যেন এই স্মৃতিটুকু মনে করে আনন্দ পান।’

অনুষ্ঠানের শেষ দিকে শিশুশিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। কেউ হাতে ফুল, কেউ ফুলের মালা, আবার কেউ উপহারের রঙিন বাক্স নিয়ে প্রিয় শিক্ষকের হাতে তুলে দেয়। সহকর্মী ও অভিভাবকেরাও তাঁকে নানা উপহারে ভরিয়ে দেন। বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মোহনা আক্তার, মেহজাবীন আক্তার ও জান্নাত আক্তার জানায়, বেলা রানী দেব তাদের পাঠ্যসূচির বাইরেও জ্ঞান অর্জনের জন্য নানা বিষয়ে উৎসাহ দিতেন এবং খুব আনন্দ দিয়ে পড়াতেন।

১৯৮৭ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে বালিগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর আর অন্য কোথাও বদলি হননি বেলা রানী দেব। বিদ্যালয় থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে উত্তর নন্দীউড়া গ্রামে তাঁর বাড়ি। তাঁর প্রয়াত স্বামী রবীন্দ্র লাল দেব সরকারি চাকরি করতেন। তাঁদের এক ছেলে জার্মানিতে উচ্চশিক্ষারত এবং মেয়ে একই বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। ৩৯ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে বেলা রানী দেব বলেন, ‘আমার অনেক ছাত্রছাত্রী দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে আছে। এই স্কুলটা আমার বাড়ির মতো, পরিবারের মতো। স্কুলের শুরুতে যারা শিক্ষার্থী ছিল, তাদের সন্তানদেরও আমি পড়িয়েছি। আজকের এই ভালোবাসা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’

বিদায়ের শেষ মুহূর্তে বিদ্যালয় ভবন থেকে বের হওয়ার পথে দুই পাশে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ান শিক্ষার্থীরা। ড্রাম ও বাদ্যের তালে নানা রঙের ধোঁয়া উড়িয়ে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করা হয়। এরপর অপেক্ষায় থাকা ঘোড়ার গাড়িতে তুলে দেওয়া হয় বেলা রানী দেবকে। সামনে ও পেছনে মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে রাজকীয় সাজে ঘোড়ার গাড়িটি তাঁর বাড়ির দিকে রওনা হয়। ৩৯ বছরের মায়ার বাঁধন ছিঁড়ে এই বিদায় মুহূর্তটি উপস্থিত সবার মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে যায়।

প্রাথমিক শিক্ষাবিদায় সংবর্ধনামৌলভীবাজাররাজনগরশিক্ষক