ভেষজের প্রচারে বেইজিংয়ের প্রস্তাবনা: ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় নিশ্চিত হবে স্বাস্থ্যসেবা

ইয়াং ওয়েইমিং স্বর্ণা

অক্টোবর ১৯: বেইজিংয়ে সম্প্রতি শেষ হয়েছে ২০২৬ বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা সম্মেলন। সম্মেলনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা খাতের প্রথম বেসরকারি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংস্থা—গ্লোবাল ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন অ্যালায়েন্স। এতে ১৯টি দেশ ও অঞ্চলের ১১৭টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি যুক্ত হয়েছেন। পাশাপাশি প্রকাশিত হয়েছে ‘ঐতিহ্যবাহী ঔষধি উদ্ভিদ সম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহারের বেইজিং প্রস্তাবনা’। চালু করা হয়েছে ‘নতুন যুগে শেননোংয়ের শত ঘাস পরীক্ষা’ কর্মসূচিও।

বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে এসব উদ্যোগের নাম কিছুটা অপরিচিত মনে হতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রশ্নটি বাংলাদেশের কোটি মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার একটি দেশে আধুনিক চিকিৎসাসেবার সুযোগ যখন শহর ও গ্রামের মধ্যে সমানভাবে বিস্তৃত নয়, তখন ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা কি আরও সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবার পথ তৈরি করতে পারে?

ওই সম্মেলনের কয়েক দিন আগে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং জাতীয় স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসেবা সম্মেলনে এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন, যা হবে ‘সুষম, সর্বজনীন, উচ্চমানসম্পন্ন ও দক্ষ’। তিনি আরও বলেন, রোগ হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও কার্যকর স্বাস্থ্য কৌশল। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসার উত্তরাধিকার ও উদ্ভাবনব্যবস্থা উন্নত করা এবং চীনা ও পাশ্চাত্য চিকিৎসার সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।

এই বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, চীনের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাকে কেবল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানোর সম্ভাব্য একটি উপায় হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে। তাই সম্মেলনের আলোচনায় শুধু চীনা চিকিৎসাপদ্ধতিকে বিদেশে পরিচিত করার বিষয়টি নয়, বরং বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এটিকে কীভাবে নিরাপদ, সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাইযোগ্য করা যায়, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশেও ইউনানি, আয়ুর্বেদ ও হোমিওপ্যাথিসহ বিভিন্ন বিকল্প ও ঐতিহ্যভিত্তিক চিকিৎসাপদ্ধতির দীর্ঘদিনের চর্চা রয়েছে। বহু মানুষ এসব পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন। চলতি বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশের সমাজকল্যাণ এবং নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী জাহিদ হুসাইন বলেন, প্রায় ১৮ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যচাহিদা পূরণে বৈচিত্র্যময় চিকিৎসাব্যবস্থা প্রয়োজন; কোনো একটি পদ্ধতি দিয়ে সবার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। তিনি আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি ইউনানি, আয়ুর্বেদ ও হোমিওপ্যাথির প্রতি মানুষের আস্থা জোরদারের আহ্বান জানান।

অর্থাৎ, বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার ভিত্তি নতুন করে গড়ে তোলার প্রয়োজন নেই। বরং বিদ্যমান চর্চাকে আরও নিরাপদ, সুসংগঠিত ও কার্যকরভাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। গত দুই দশকে দেশটি ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা, গবেষণা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

পরিপূরক চিকিৎসাসেবার সুযোগ

চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার সম্ভাব্য অবদানগুলোর একটি হলো, কিছু নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসমস্যার ক্ষেত্রে বিকল্প বা পরিপূরক চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। আকুপাংচার ও তুইনা—চীনা ঐতিহ্যবাহী মালিশপদ্ধতি—ব্যথা নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্বাসনের মতো ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। তবে এসব পদ্ধতির কার্যকারিতা রোগভেদে ভিন্ন হতে পারে; তাই যথাযথ প্রশিক্ষণ, চিকিৎসাগত মূল্যায়ন এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে এগুলোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশে চীনা চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে আগ্রহ ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। চলতি বছরের মে মাসে চীনের একটি বড় হাসপাতালের প্রতিনিধিদল ঢাকার সুওশি হেলথকেয়ার লিমিটেড পরিদর্শন করে। তারা সেখানে আকুপাংচার ও ফিজিওথেরাপি কেন্দ্র ঘুরে দেখে এবং চীনা ও পাশ্চাত্য চিকিৎসার সমন্বয় ও চিকিৎসাপ্রযুক্তি হস্তান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করে।

জুন মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী জুবাইদা রহমান কুয়াংআনমেন হাসপাতাল পরিদর্শনকালে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার প্রয়োগ সম্পর্কেও খোঁজ নেন।

এসব যোগাযোগ থেকে বোঝা যায়, চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা নিয়ে আলোচনা সাংস্কৃতিক পরিচিতির গণ্ডি ছাড়িয়ে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার বাস্তব প্রয়োগের দিকেও এগোচ্ছে। তবে এর সুফল পেতে হলে রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসার কার্যকারিতা এবং আধুনিক চিকিৎসার সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

শিল্প ও মানকরণ

বাংলাদেশ বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেনেরিক ওষুধ উত্পাদনকারী দেশ, ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের বার্ষিক উত্পাদন মূল্য ৩০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, ওষুধ প্রায় ১৬০টি দেশে রপ্তানি হয়; কিন্তু ঐতিহ্যবাহী ভেষজ ও বিকল্প চিকিত্সা পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে অংশ এখনও নগণ্য, নিয়ন্ত্রণ বিচ্ছিন্ন ও মানের ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা। ঔষধি উপাদানের গুণমান নিয়ন্ত্রণ, চিরায়ত নামযুক্ত ফর্মুলার মানকরণ, ফর্মুলা গ্রানুলের মান ব্যবস্থা নির্মাণে চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিত্সার সঞ্চয় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী চিকিত্সার আধুনিকায়নের জন্য একটি অনুকরণযোগ্য প্রযুক্তিগত পথ প্রদান করতে পারে।

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে চীন-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় চিকিৎসাসামগ্রী ও ওষুধবাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৪৮ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। চীনা ঔষধি উপাদান ও ক্বাথ তৈরির উপকরণও এ বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য পণ্য।

যদি উভয় পক্ষ সহযোগিতাকে বাণিজ্য থেকে যৌথ মান নির্ধারণ ও স্থানীয় উত্পাদনে সম্প্রসারিত করতে পারে, তবে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ভেষজ শিল্প ‘ঐতিহ্য আছে, শিল্প নেই’ অবস্থা থেকে ‘মান আছে, ব্র্যান্ড আছে’ অবস্থায় উন্নীত হওয়ার সুযোগ পাবে।

মানুষ ও প্রতিষ্ঠানে সংযোগ

স্বাস্থ্যসেবা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, গবেষক ও প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতার ওপর। তাই প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং যৌথ চিকিৎসা উদ্যোগ চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।

ইউনান প্রদেশে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের চিকিৎসাকর্মীদের জন্য চীন সফর ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি প্রতিনিধিরা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও নতুন চিকিৎসাপ্রযুক্তির অভিজ্ঞতা দেশে কাজে লাগানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া চীন-বাংলাদেশ যৌথ হৃদ্‌রোগ চিকিৎসাকেন্দ্র এবং যৌথ সার্জারি ক্লিনিকের মতো উদ্যোগও দুই দেশের চিকিৎসা সহযোগিতার পরিসর বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা এ ধরনের যৌথ উদ্যোগ আরও বিভাগে সম্প্রসারণের প্রত্যাশা জানিয়েছেন।

ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার ক্ষেত্রেও চিকিৎসক ও গবেষকদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী চীনের একটি হাসপাতাল পরিদর্শনের পর বলেন, বাংলাদেশে চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার প্রয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি দেশে ফিরে দুই দেশের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা খাতে যোগাযোগ ও সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন।

বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা যদি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিয়ে উপযুক্ত ক্ষেত্রে চীনা চিকিৎসাপদ্ধতি প্রয়োগের সুযোগ পান, আর দুই দেশের গবেষক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো যদি যৌথভাবে চিকিৎসার মান ও নিরাপত্তা যাচাই করেন, তাহলে সহযোগিতা আনুষ্ঠানিক বৈঠক ও চুক্তির গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পৌঁছাতে পারবে।

প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তার ভাষণে আরও বলেন, ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য মানবজাতির অভিন্ন কামনা’, এবং ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের স্বাস্থ্য ও চিকিত্সা ক্ষেত্রে সহযোগিতা গভীরতর করতে হবে’।

বাংলাদেশের জন্য এসব বক্তব্যের তাৎপর্য নির্ভর করবে সেগুলো কতটা বাস্তব সেবায় রূপ নেয়, তার ওপর। ঢাকার কোনো চিকিৎসাকেন্দ্রে নিরাপদ ও উপযুক্ত আকুপাংচার সেবা, বাংলাদেশের ওষুধশিল্পে উন্নত মান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কিংবা দুই দেশের চিকিৎসকদের যৌথভাবে রোগীর চিকিৎসা নিয়ে কাজ করা—এসবই সহযোগিতার বাস্তব ফল হতে পারে।

বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের গুরুত্ব এখানেই। এটি কেবল একটি দেশের চিকিৎসাপদ্ধতিকে অন্য দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার আয়োজন নয়; বরং ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানকে আধুনিক গবেষণা, মান নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা যায়, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার একটি ক্ষেত্র।

বাংলাদেশ ও চীন—দুই দেশেই ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এই অভিজ্ঞতাকে নিরাপদ ও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবায় রূপ দিতে পারলে সহযোগিতা শুধু ওষুধের বাণিজ্য বাড়াবে না; বরং গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসাসেবার সুযোগও সম্প্রসারিত করতে পারে। শেষ পর্যন্ত ‘স্বাস্থ্য সিল্ক রোড’-এর সবচেয়ে স্থায়ী সাফল্য হবে তখনই, যখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং আরও বেশি মানুষ মানসম্মত, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা পাবে।

লেখক: সাংবাদিক, সিএমজি বাংলা, বেইজিং

কলামচীনভেষজসিএমজি