ছাদে টবে বেগুন চাষ পদ্ধতি : মাটি তৈরি, সার প্রয়োগ ও ফলন বাড়ানোর উপায়

বাজারে বেগুন কিনতে গিয়ে কখনো কি মনে হয়েছে, বেগুনের দাম দেখে বরং বেগুন গাছই কিনে ফেলি! কথাটা মজার হলেও সমাধান কিন্তু মন্দ নয়। বাড়ির ছাদে যদি কয়েকটি টব রাখার জায়গা থাকে, তাহলে সেখানেই অনায়াসে চাষ করতে পারেন বেগুন। এমনকি বড় কোনো বাগান কিংবা কৃষিকাজের অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন নেই। একটু যত্ন, নিয়মিত পরিচর্যা আর কিছু কৌশল জানা থাকলেই টবে বেগুন চাষ করে পরিবারের সবজির চাহিদার একটা অংশ পূরণ করা সম্ভব।

বেগুন বাংলাদেশের অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় সবজি। ভর্তা, ভাজি, মাছের ঝোল কিংবা বেগুনি—কতভাবেই না বেগুন খাওয়া হয়! তাই ছাদবাগানে বেগুন গাছ থাকলে একদিকে যেমন পাওয়া যাবে টাটকা সবজি, অন্যদিকে ছাদের সৌন্দর্যও বাড়বে। গাছে বেগুনি ফুল ফুটবে, তারপর সেই ফুল থেকে ধীরে ধীরে বড় হবে বেগুন। নিজের হাতে ফলানো বেগুন রান্না করে খাওয়ার আনন্দও আলাদা। তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক, কীভাবে ছাদে টবে বেগুন চাষ করবেন, কোন জাতের বেগুন লাগাবেন, কেমন মাটি তৈরি করবেন এবং কীভাবে যত্ন নিলে গাছে বেশি ফলন পাওয়া যাবে।

ছাদে টবে বেগুন চাষের উপযুক্ত সময়

বেগুন এমন একটি সবজি, যা উপযুক্ত জাত ও পরিবেশ পেলে বছরের বিভিন্ন সময় চাষ করা যায়। তবে আবহাওয়া, জাত এবং এলাকার জলবায়ুর ওপর ফলন অনেকটাই নির্ভর করে।

বাংলাদেশে সাধারণত শীতকাল বেগুন চাষের জন্য বেশ উপযোগী। শীতের শুরুতে চারা লাগালে গাছ ভালোভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়। তবে বারোমাসি বা গ্রীষ্মকাল উপযোগী জাত নির্বাচন করলে অন্য সময়েও চাষ করা সম্ভব।

ছাদে বেগুন চাষের ক্ষেত্রে এমন সময় চারা লাগানো ভালো, যখন গাছ পর্যাপ্ত রোদ পাবে এবং অতিরিক্ত বৃষ্টি বা জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কম থাকবে।

টবে বেগুন চাষের জন্য কোন জাত ভালো?

বেগুনের অনেক জাত রয়েছে। আকার, রং, স্বাদ ও ফলনের দিক থেকে এসব জাতের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় উপযোগী দেশীয় ও উন্নত জাতের বেগুন ছাদবাগানে লাগানো যায়।

বেগুনের কয়েকটি পরিচিত ধরন হলো—

•             লম্বা বেগুন

•             গোল বেগুন

•             সাদা বেগুন

•             সবুজ বেগুন

•             বেগুনি বা গাঢ় বেগুনি বেগুন

•             হাইব্রিড বেগুন

জাত নির্বাচনের সময় স্থানীয় কৃষি অফিস বা বিশ্বস্ত নার্সারির পরামর্শ নেওয়া ভালো। রোগ প্রতিরোধী এবং টবে চাষের উপযোগী জাত বেছে নিলে পরিচর্যার ঝামেলা তুলনামূলক কম হয়।

একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, দেখতে সুন্দর হলেই কোনো জাত টবে চাষের জন্য উপযোগী হবে, এমন নয়। গাছের আকার, শিকড়ের বিস্তার এবং ফলের ধরন বিবেচনা করে জাত নির্বাচন করতে হবে।

ছাদে টবে বেগুন চাষের জন্য কেমন টব প্রয়োজন?

টবে বেগুন চাষের সফলতার অন্যতম শর্ত হলো সঠিক পাত্র নির্বাচন। বেগুন গাছের শিকড় ভালোভাবে ছড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গা প্রয়োজন। তাই খুব ছোট টবে বেগুন লাগানো উচিত নয়।

একটি গাছের জন্য কমপক্ষে ১২ ইঞ্চি ব্যাসের টব ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ১৫ থেকে ১৮ ইঞ্চি ব্যাসের এবং যথেষ্ট গভীর টব হলে আরও ভালো। বড় আকারের বা দীর্ঘদিন ফল দেয় এমন জাতের জন্য ১৫ থেকে ২০ লিটার বা তার বেশি ধারণক্ষমতার পাত্র নির্বাচন করা ভালো।

মাটির টব, প্লাস্টিকের টব, বড় গামলা কিংবা গ্রো ব্যাগ—সবই ব্যবহার করা যায়। তবে পাত্রের নিচে অবশ্যই পানি বের হওয়ার ছিদ্র থাকতে হবে।

পানি বের হওয়ার ছিদ্র বন্ধ থাকলে টবের ভেতরে পানি জমে শিকড় পচে যেতে পারে। তখন গাছের পাতা হলুদ হয়ে যাবে, বৃদ্ধি কমে যাবে, এমনকি গাছ মারাও যেতে পারে। অর্থাৎ, বেগুন গাছের পা ভিজে থাকতে পছন্দ নয়!

ছাদে টবে বেগুন চাষের জন্য মাটি তৈরি করবেন যেভাবে

টবে বেগুন চাষের ক্ষেত্রে মাটির গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ খোলা জমিতে গাছের শিকড় প্রয়োজন অনুযায়ী ছড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু টবে সেই সুযোগ নেই। তাই টবের মাটিতেই গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে।

বেগুন গাছের জন্য ঝুরঝুরে, উর্বর ও পানি নিষ্কাশন উপযোগী দোআঁশ মাটি সবচেয়ে ভালো।

টবের মাটি তৈরির জন্য নিচের উপকরণগুলো ব্যবহার করতে পারেন—

•             ৫০ শতাংশ দোআঁশ মাটি

•             ২৫ শতাংশ ভালোভাবে পচানো গোবর সার বা

কম্পোস্ট

•             ১৫ শতাংশ কোকোপিট

•             ১০ শতাংশ মোটা বালি

এসব উপকরণ ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। চাইলে সামান্য ভার্মি কম্পোস্টও ব্যবহার করা যায়। মাটিতে কাঁচা গোবর ব্যবহার করা যাবে না। এতে গাছের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

মাটির উর্বরতা বাড়াতে পরিমিত পরিমাণে জৈব সার ব্যবহার করুন। রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে চাইলে মাটির পরিমাণ ও সারের নির্দেশনা অনুযায়ী টিএসপি ও এমওপি সার প্রয়োগ করা যেতে পারে।

মাটি তৈরি করার পর ১০ থেকে ১৫ দিন রেখে দিলে ভালো হয়। এরপর সেই মাটি টবে ভরে বেগুনের চারা লাগানোর ব্যবস্থা করুন।

বেগুনের চারা তৈরি ও রোপণ পদ্ধতি

  • বেগুন চাষের জন্য বীজ থেকে চারা তৈরি করা যায়। আবার সময় বাঁচাতে নার্সারি থেকেও সুস্থ ও সবল চারা কিনে আনতে পারেন।
  • নিজে চারা তৈরি করতে চাইলে ছোট পাত্র বা বীজতলায় ঝুরঝুরে মাটি ও জৈব সারের মিশ্রণ ব্যবহার করুন। বীজ বেশি গভীরে পুঁতবেন না। হালকাভাবে মাটি দিয়ে ঢেকে পানি ছিটিয়ে দিন।
  • সাধারণত উপযুক্ত পরিবেশে কয়েক দিনের মধ্যে বীজ থেকে চারা গজাতে শুরু করে। চারার বয়স ৩০ থেকে ৪০ দিন হলে, গাছের বৃদ্ধি ও পাতার অবস্থা উপযুক্ত থাকলে মূল টবে রোপণ করা যায়।
  • চারা রোপণের জন্য বিকেলবেলা বেছে নেওয়া ভালো। এতে দুপুরের তীব্র রোদে চারার ওপর চাপ কম পড়ে।
  • টবের মাঝখানে একটি গর্ত করে চারাটি সাবধানে বসিয়ে দিন। খেয়াল রাখতে হবে, চারা তোলার সময় শিকড়ের মাটির বল যেন ভেঙে না যায়। এরপর চারার গোড়ায় মাটি দিয়ে হালকাভাবে চেপে দিন এবং পানি দিন।
  • প্রথম কয়েক দিন গাছের দিকে একটু বেশি নজর রাখুন। চারা নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সময় সরাসরি তীব্র রোদ থেকে সাময়িক সুরক্ষা দিতে পারেন। তবে পরে পর্যাপ্ত রোদে রাখতে হবে।

বেগুন গাছে কতটুকু রোদ ও পানি প্রয়োজন?

  • বেগুন রোদপ্রিয় গাছ। ভালো ফলন পেতে প্রতিদিন অন্তত ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা সরাসরি সূর্যালোক পাওয়া দরকার। তাই ছাদের এমন জায়গায় টব রাখুন, যেখানে দিনের বেশির ভাগ সময় রোদ আসে।
  • আলো কম হলে গাছ লম্বা হলেও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ফুল কম আসতে পারে এবং ফলনও আশানুরূপ হবে না।
  • পানির ক্ষেত্রেও কিছুটা সতর্কতা প্রয়োজন। বেগুন গাছের মাটি একেবারে শুকিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। আবার অতিরিক্ত পানি দিয়ে টবকে ছোটখাটো পুকুর বানানোরও প্রয়োজন নেই।
  • মাটির ওপরের এক ইঞ্চি অংশ শুকিয়ে এলে পানি দিন। গরমের সময় প্রতিদিন পানি দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে শীত বা বর্ষায় মাটির আর্দ্রতা বুঝে পানি দিতে হবে।
  • সকালে পানি দেওয়া ভালো। পানি দেওয়ার সময় পাতার ওপর না দিয়ে গাছের গোড়ায় দিন। বৃষ্টির পানি টবে জমছে কি না, সেটিও নিয়মিত পরীক্ষা করুন।

বেগুন গাছে সার প্রয়োগের নিয়ম

বেগুন গাছের ভালো বৃদ্ধি ও ফলনের জন্য নিয়মিত পুষ্টি প্রয়োজন। বিশেষ করে গাছে ফুল ও ফল আসার সময় পুষ্টির চাহিদা বাড়ে।

টবে বেগুন চাষে জৈব সার ব্যবহার করা বেশ কার্যকর। প্রতি ১৫ থেকে ২০ দিন পরপর টবের ওপরের মাটি সামান্য আলগা করে পরিমাণমতো ভার্মি কম্পোস্ট বা ভালোভাবে পচানো কম্পোস্ট মিশিয়ে দিতে পারেন।

গাছের বৃদ্ধি অনুযায়ী সার প্রয়োগের একটি সাধারণ পরিকল্পনা হতে পারে—

চারা লাগানোর ১৫-২০ দিন পর: গাছের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করুন। প্রয়োজন হলে সামান্য জৈব সার দিন।

চারা লাগানোর ২৫-৩০ দিন পর: গাছের বৃদ্ধি ভালো রাখতে পরিমিত পরিমাণে জৈব সার প্রয়োগ করুন।

ফুল আসার সময়: গাছের পুষ্টির চাহিদা অনুযায়ী কম্পোস্ট এবং প্রয়োজনীয় পটাশজাতীয় সার ব্যবহার করা যেতে পারে।

ফল ধরার সময়: নিয়মিত অল্প পরিমাণে জৈব সার দিন এবং মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখুন।

রাসায়নিক সার ব্যবহার করলে অবশ্যই পাত্রের মাটির পরিমাণ অনুযায়ী নির্ধারিত মাত্রা অনুসরণ করতে হবে। অতিরিক্ত ইউরিয়া প্রয়োগ করলে গাছের পাতা ও ডালপালা বেশি বাড়তে পারে, কিন্তু ফুল ও ফলের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। মনে রাখবেন, গাছকে বেশি খাওয়ালেই সে বেশি বেগুন উপহার দেবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই!

আরও পড়ুন

এই রুটিন মেনে চললে বারান্দা বা ছাদবাগানের সার নিয়ে টেনশন থাকবে না⁠ — সার ও জৈব উপাদান ব্যবস্থাপনা।

বেগুন গাছের ডালপালা ছাঁটাই ও পরিচর্যা

গাছ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর নিচের দিকে কিছু পুরোনো পাতা, শুকনো পাতা এবং দুর্বল ডাল দেখা দিতে পারে। এসব নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।

গাছের ভেতরে বাতাস চলাচলের সুযোগ রাখতে অপ্রয়োজনীয় ডালপালা ছেঁটে দিতে পারেন। এতে আলো-বাতাস সহজে প্রবেশ করবে এবং রোগবালাইয়ের ঝুঁকিও কমবে।

গাছ বেশি বড় হলে একটি কাঠি বা বাঁশের খুঁটি দিয়ে বেঁধে দিন। বেগুনের ফল বড় হলে ডালের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। তখন গাছ হেলে পড়তে বা ডাল ভেঙে যেতে পারে। তবে ছাঁটাইয়ের নামে সব ডাল কেটে ফেলবেন না। ফুল ও ফল ধরার উপযোগী সুস্থ ডালগুলো অক্ষত রাখতে হবে।

বেগুন গাছের রোগবালাই ও পোকামাকড় দমন

টবে বেগুন চাষের সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয়গুলোর একটি হলো পোকামাকড়। গাছ যত সুন্দরভাবে বেড়ে উঠুক না কেন, হঠাৎ ডগা শুকিয়ে যাওয়া কিংবা ফলের ভেতর পোকা দেখা গেলে বাগানির মন খারাপ হওয়াই স্বাভাবিক।

বেগুন গাছে সাধারণত কয়েক ধরনের পোকা ও রোগের আক্রমণ দেখা যায়।

১. ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা

এটি বেগুনের অন্যতম ক্ষতিকর পোকা। পোকার আক্রমণে গাছের কচি ডগা শুকিয়ে যায়। ফলের গায়ে ছিদ্র দেখা যায় এবং ভেতরে শূককীট পাওয়া যেতে পারে। আক্রান্ত ডগা ও ফল দ্রুত কেটে গাছ থেকে সরিয়ে ফেলুন। মাটিতে বা টবের আশপাশে আক্রান্ত ফল ফেলে রাখবেন না। নিয়মিত গাছ পরীক্ষা করুন। প্রয়োজনে  কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার করুন।

২. সাদা মাছি ও জাবপোকা

পাতার নিচে ছোট ছোট সাদা বা সবুজ পোকা দেখা গেলে সতর্ক হতে হবে। এসব পোকা গাছের রস শুষে নেয়। ফলে পাতা কুঁকড়ে যেতে পারে এবং গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। পাতার নিচের অংশ নিয়মিত পরীক্ষা করুন। আক্রান্ত পাতা সরিয়ে ফেলুন। হলুদ আঠালো ফাঁদ ব্যবহার করেও সাদা মাছির সংখ্যা কমানো যায়।

৩. পাতা ও ফলের দাগ রোগ

ছত্রাকের আক্রমণে পাতায় বাদামি বা কালচে দাগ হতে পারে। অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও গাছের গোড়ায় পানি জমে থাকলে এ ধরনের সমস্যা বাড়ে।

আক্রান্ত পাতা সরিয়ে ফেলুন। গাছের গোড়ায় পানি জমতে দেবেন না। প্রয়োজন হলে কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন।

৪. গোড়া পচা ও গাছ ঢলে পড়া

অতিরিক্ত পানি, দুর্বল পানি নিষ্কাশন এবং মাটিবাহিত রোগের কারণে গাছের গোড়া পচে যেতে পারে। এ সমস্যা দেখা দিলে প্রথমেই পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ঠিক করুন।

সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ। গাছের পাতায়, ডালে কিংবা ফলে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে শুরুতেই ব্যবস্থা নিন।

বেগুন গাছে ফুল আসে, কিন্তু ফল ধরে না কেন?

ছাদবাগানিদের একটি সাধারণ অভিযোগ হলো, গাছে অনেক ফুল আসে, কিন্তু বেগুন ধরে না। এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে।

প্রথমত, পর্যাপ্ত রোদ না পেলে ফুল ও ফলের উৎপাদন ব্যাহত হয়। দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত তাপমাত্রা বা অনিয়মিত পানি দেওয়ার কারণে ফুল ঝরে যেতে পারে। তৃতীয়ত, অতিরিক্ত ইউরিয়া প্রয়োগে গাছের পাতার বৃদ্ধি বেশি হলেও ফুল ও ফল কম হতে পারে।

এ ছাড়া পরাগায়নের সমস্যা থাকলেও ফল ধরতে অসুবিধা হতে পারে।

এ সমস্যা এড়াতে গাছকে পর্যাপ্ত রোদে রাখুন, নিয়মিত পানি দিন এবং সুষম সার ব্যবহার করুন। ফুল ফোটার সময় গাছের আশপাশে মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগবাহীর বিচরণ থাকলে উপকার পাওয়া যায়।

প্রয়োজনে সকালে ফুলের পরাগ এক ফুল থেকে অন্য ফুলে আলতোভাবে স্থানান্তর করে হাতের সাহায্যে পরাগায়নেও সহায়তা করা যায়।

কত দিনে বেগুন ধরবে এবং কখন সংগ্রহ করবেন?

বেগুন গাছে সাধারণত চারা রোপণের ৫০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে ফুল আসতে শুরু করতে পারে। জাত ও পরিবেশভেদে সময় কমবেশি হয়। ফুল আসার পর ফল বড় হতে আরও কিছুদিন সময় লাগে।

সাধারণত চারা রোপণের ৬০ থেকে ৮০ দিনের মধ্যে প্রথম বেগুন সংগ্রহ করা সম্ভব। তবে এটি নির্দিষ্ট সময় নয়। জাত, আবহাওয়া ও পরিচর্যার ওপর ফলন নির্ভর করবে।

বেগুন সংগ্রহের সময় ফলের আকার, রং ও চকচকে ভাব দেখে বুঝতে হবে। ফল বেশি পেকে গেলে বীজ শক্ত হয়ে যায় এবং স্বাদ কমে যেতে পারে।

ফল সংগ্রহের সময় হাত দিয়ে টানাটানি না করে ধারালো কাঁচি বা ছুরি ব্যবহার করুন। এতে গাছের ডাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে। নিয়মিত পাকা বেগুন সংগ্রহ করলে গাছে নতুন ফল আসার সুযোগ তৈরি হয়।

ছাদে টবে বেগুন চাষে যে ৭টি ভুল এড়িয়ে চলবেন

নতুন বাগানিরা অনেক সময় কিছু সাধারণ ভুল করেন। এগুলো এড়িয়ে চলতে পারলে ভালো ফলনের সম্ভাবনা বাড়বে।

১. খুব ছোট টবে বেগুন গাছ লাগাবেন না।

২. পর্যাপ্ত সূর্যালোক ছাড়া বেগুন চাষের চেষ্টা করবেন না।

৩. টবে পানি জমতে দেবেন না।

৪. কাঁচা গোবর বা অপরিপক্ব কম্পোস্ট ব্যবহার করবেন না।

৫. অতিরিক্ত রাসায়নিক সার প্রয়োগ করবেন না।

৬. আক্রান্ত ডাল, পাতা ও ফল গাছে ঝুলিয়ে রাখবেন না।

৭. ফল বড় হওয়ার পরও দীর্ঘদিন গাছে রেখে দেবেন না।

ছাদে টবে বেগুন চাষে লাভ কী?

ছাদে টবে বেগুন চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, অল্প জায়গাতেই সবজি উৎপাদন করা যায়। যাদের বাড়িতে বাগান করার মতো জমি নেই, তারাও কয়েকটি টব দিয়ে শুরু করতে পারেন।

নিজের হাতে উৎপাদিত বেগুন টাটকা অবস্থায় রান্না করা যায়। এতে সবজি কেনার খরচের কিছুটা সাশ্রয় হয়। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের, বিশেষ করে শিশুদের গাছ লাগানো ও পরিচর্যার কাজে যুক্ত করা যায়। এতে তাদের মধ্যে প্রকৃতি ও কৃষির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।

আরেকটি বিষয় হলো, ছাদে সবুজ গাছপালা থাকলে পরিবেশও সুন্দর দেখায়। সারাদিনের কাজ শেষে গাছের পরিচর্যা করতে করতে মনও কিছুটা সতেজ হয়ে ওঠে।

তবে ছাদে বাগান করার আগে ভবনের ছাদের ভার বহনক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে। অতিরিক্ত ভারী টব, ড্রাম বা মাটির স্তূপ এক জায়গায় রাখা ঠিক নয়। ছাদের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ও জলরোধী স্তরের সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।

ছাদে টবে বেগুন চাষ খুব কঠিন কোনো কাজ নয়। সঠিক জাত নির্বাচন, উপযুক্ত টব, উর্বর মাটি, পর্যাপ্ত রোদ, পরিমিত পানি এবং নিয়মিত পরিচর্যা—এই কয়েকটি বিষয় মেনে চললেই ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।

শুরুতে দুই-তিনটি টব দিয়ে বেগুন চাষ শুরু করুন। অভিজ্ঞতা বাড়লে টবের সংখ্যা বাড়াতে পারেন। প্রথমবার হয়তো গাছে খুব বেশি বেগুন ধরবে না। কিন্তু ধৈর্য ধরে পরিচর্যা করলে একসময় নিজের ছাদেই বেগুনের ছোটখাটো বাগান গড়ে উঠবে।

তখন বাজারে বেগুনের দাম বাড়লে মন খারাপ করারও প্রয়োজন হবে না। বরং ছাদে উঠে গাছ থেকে বেগুন তুলে রান্নাঘরে চলে যেতে পারবেন। বাজারের ব্যাগে বেগুন কেনার বদলে নিজের বাগান থেকে বেগুন তোলার আনন্দই হবে আলাদা!

আরও পড়ুন

বারান্দায় বাগান করার টিপস | বারান্দায় কোন গাছ লাগাবেন⁠ — টব নির্বাচন, মাটি তৈরি ও গাছের পরিচর্যা।

Agricultural tipsকৃষিচাষছাদবাগানটবে চাষটিপসবেগুন