চাঁদের আলোয় ঢাকায় চীনের উৎসব, সংস্কৃতির মেলবন্ধনে বন্ধুত্বের নতুন বার্তা

চারদিকে উৎসবের আমেজ। চীনা অক্ষরে সাজানো নানা বার্তা, রঙিন লণ্ঠনের আলো আর ঐতিহ্যবাহী সাজসজ্জায় বদলে গেছে ঢাকার চেনা পরিবেশ। শরতের পূর্ণিমার আলোয় চাঁদের উৎসবকে ঘিরে আয়োজনে একত্রিত হন বাংলাদেশে বসবাসরত চীনা নাগরিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। পরবাসে থেকেও নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার বুকে যেন এক টুকরো চীন। মঙ্গলবার রাজধানীর রেডিসন ব্লু বলরুমে ওভারসিজ চাইনিজ অ্যাসোসিয়েশন ইন বাংলাদেশের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় চীনের ঐতিহ্যবাহী মধ্য-শরৎ উৎসব বা ‘মিড-অটাম ফেস্টিভ্যাল।

এরপর মঞ্চে একের পর এক মনমুগ্ধকর পরিবেশনা।ঐতিহ্যবাহী চীনা গান, নৃত্য আর সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন। কখনো সুরের মূর্ছনা, কখনো নৃত্যের ছন্দ—প্রতিটি পরিবেশনাতেই ফুটে ওঠে চীনা সংস্কৃতির বৈচিত্র্য। দূর পরবাসে থেকেও নিজেদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরার আনন্দ ছিল প্রবাসীদের চোখেমুখে।

বর্ণাঢ্য এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ের অতিথিরা। অনুষ্ঠানে ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, হংকং ইকোনমিক অ্যান্ড ট্রেড অফিস, ব্যাংকের পরিচালক চেং চি লিং, ওভারসিজ চাইনিজ অ্যাসোসিয়েশন ইন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ছ্যাং ইউ চোং ফেলিক্স, মহাপরিচালক বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বিভাগের ড. সৈয়দ মুনতাসীর মামুন, বিসিসিসিআইয়ের সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম সহ চীনা দূতাবাসের কর্মকর্তারা।

চীন ও বাংলাদেশের বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করাই ছিল আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

নিবন্ধন আর কুশল বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসবের সন্ধ্যা। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মরত ও বসবাসরত চীনা কমিউনিটির প্রতিনিধিদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে জমে ওঠে আয়োজন। শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয় পরস্পরের সঙ্গে দেখা, গল্প, শুভেচ্ছা আর আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে সন্ধ্যাটি পরিণত হয় মিলনমেলায়।

উৎসব মানেই আনন্দ। আর প্রিয় সংস্কৃতিকে নিজের দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে উদযাপন—সে আনন্দ যেন আরও আলাদা। বাংলাদেশে বসে নিজেদের ঐতিহ্য উদযাপনের অনুভূতি কেমন—জানালেন উৎসবে অংশ নেওয়া চীনা নাগরিকরা।

আয়োজকদের মতে, এ ধরনের উৎসব প্রবাসী চীনা কমিউনিটির মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ ও চীনের জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে।

উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে উঠে আসে দুই দেশের সম্পর্কের নানা দিক। প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রত্যাশার কথা জানান চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।

তিনি বলেন, দেশের বাইরে বসবাস করলেও প্রবাসী চীনা নাগরিকদের সঙ্গে মাতৃভূমির সম্পর্ক অটুট থাকে। মধ্য-শরৎ উৎসব শুধু পরিবারের সঙ্গে মিলনের উপলক্ষ নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে চীনা সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি, পর্যটন এবং মানুষে মানুষে যোগাযোগ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বাড়াতে হবে।

উৎসবের এই আলো-ঝলমলে আয়োজন শুধু চীনা সংস্কৃতির উদযাপন নয়—এখানে মিলেছে দুই দেশের মানুষ, সংস্কৃতি আর বন্ধুত্বের গল্প। বাংলাদেশের মাটিতে নিজেদের ঐতিহ্যকে উদযাপন করে প্রবাসী চীনারাও যেন ফিরে পেয়েছেন আপন ঘরের আবহ। বাংলাদেশের মাটিতে চীনের ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব যেন আবারও মনে করিয়ে দিল—ভৌগোলিক দূরত্ব যতই থাকুক, সংস্কৃতি আর মানুষের বন্ধন তৈরি করতে পারে নতুন এক সেতু।

সূত্র: সিএমজি বাংলা