তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় আত্মশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থায় গুরুত্ব দিচ্ছে চীন

সাকিব সিকান্দার

চীনের হুনান প্রদেশের চিয়াহ্য কাউন্টির সিয়াংসি গ্রামের বাসিন্দাদের সম্প্রতি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কিছু অর্থ ফেরত দিয়েছে। অভিযোগ ছিল, স্ব-নির্মিত বাড়ির সনদপত্র প্রক্রিয়াকরণের নামে বাসিন্দাদের কাছ থেকে নিয়ম বহির্ভুতভাবে অতিরিক্ত ফি আদায় করা হয়েছিল। আর এ অভিযোগের সত্যতা মেলার পর স্থানীয় শৃঙ্খলা পরিদর্শন কর্মকর্তারা এ ব্যবস্থা নেন।

ঘটনার সূত্রপাত হয় গ্রামের এক দলপ্রধান ও অবসরপ্রাপ্ত টাউনশিপ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনয়নের মাধ্যমে। অভিযোগে বলা হয়, বসতভিটার কাগজপত্র প্রক্রিয়ায় সহায়তার নামে তারা বাসিন্দাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছিলেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং আদায় করা অর্থ বাসিন্দাদের ফেরত দেওয়া হয়।

এই ঘটনাকে তৃণমূল পর্যায়ে সি চিন পিংয়ের দল গঠনবিষয়ক চিন্তাধারার বাস্তব প্রয়োগের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ১৫ জুন অনুষ্ঠিত এক জাতীয় সম্মেলনে এ চিন্তাধারা উপস্থাপন করা হয়। এতে ১৪টি প্রধান বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সর্বাত্মক ও কঠোর আত্মশাসন এগিয়ে নেওয়া, কর্মপদ্ধতির উন্নয়নকে নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদি কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, কঠোর শৃঙ্খলার মাধ্যমে দল পরিচালনা, এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাতে কর্মকর্তারা দুর্নীতি করার সাহস না পান, সুযোগ না পান এবং দুর্নীতির ইচ্ছাও না থাকে, পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও বিধি-বিধানের মাধ্যমে দলীয় শাসন শক্তিশালী করা। নতুন যুগে দল গঠনের ক্ষেত্রে এটিকে একটি মৌলিক দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

চীনের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শাসনবিষয়ক ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ইয়াং ওয়েইতোং বলেন, ২০১২ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ১৮তম জাতীয় কংগ্রেসের পর থেকে দল গঠন নিয়ে যে ধারাবাহিক তাত্ত্বিক বিকাশ ঘটেছে, এই নতুন চিন্তাধারা তারই পরিণতি। এটি নতুন শাসন-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষ্যে প্রণীত।

তার মতে, এই চিন্তাধারার মূল যুক্তি হলো দলীয় সর্বাত্মক নেতৃত্ব এবং কঠোর আত্মশাসনের পারস্পরিক সম্পর্ক। দলীয় নেতৃত্বকে শক্তিশালী করতে সর্বাত্মক ও কঠোর আত্মশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২০১৪ সালে চিয়াংসু প্রদেশ সফরের সময় প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং প্রথম স্পষ্টভাবে ‘দলের সর্বাত্মক ও কঠোর আত্মশাসন’-এর ধারণা তুলে ধরেন। পরে এটি ‘চারটি সর্বাঙ্গীণ কৌশল’-এর অংশ হয়। এই কৌশলের অন্যান্য বিষয় হলো—সর্বক্ষেত্রে একটি মধ্যম সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলা, সর্বাত্মক সংস্কার গভীর করা এবং আইনের শাসন এগিয়ে নেওয়া।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা পরিদর্শন কমিশনের প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, কঠোর আত্মশাসনের অর্থ হলো পুরো দলকে কঠোর মানদণ্ডে পরিচালনা করা এবং দলীয় কমিটি ও শৃঙ্খলা পরিদর্শন কমিশনগুলো যেন যথাযথভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে তা নিশ্চিত করা।

চিয়াহ্য কাউন্টির ঘটনাটি দেখায়, কীভাবে তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে অসদাচরণ সৃষ্টি হতে পারে। বছরের শুরু থেকে কাউন্টির শৃঙ্খলা পরিদর্শন কর্তৃপক্ষ বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অসদাচরণ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে। এ পর্যন্ত ৯৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, ২৭ জনকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে এবং ৬ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ৯ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার) অর্থ ও সম্পদ জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে গ্রাম পর্যায়ের সম্পদ লেনদেন ও ফি আদায়ের প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের মতে, কঠোর দলীয় শাসনের জন্য শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাই মূল ভিত্তি।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ১৮তম জাতীয় কংগ্রেসের পর থেকে দলীয় শৃঙ্খলা ও আইনকে পৃথকভাবে প্রয়োগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ নীতিতে দলীয় শৃঙ্খলাকে আরও কঠোর করা এবং আইন প্রয়োগের আগেই শৃঙ্খলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

সিএমজি