লি ওয়ানলু শিশির
সম্প্রতি চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক কর্মকর্তা সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ভিসামুক্ত সুবিধায় চীনে প্রবেশকারী বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে চীন ছাড়ার আগে কর ফেরত পাওয়ার আবেদন এবং ফেরত দেওয়া করের পরিমাণও বেড়েছে। বিদেশি পর্যটকদের কেনাকাটায় পূর্ণ লাগেজ শুধু তাদের বাড়তি ব্যয়ের কথাই বলে না, বরং ‘চীনে তৈরি’ পণ্যের প্রতি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা বৃদ্ধির ইঙ্গিতও দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘চীন ভ্রমণ’-এর জনপ্রিয়তা বিদেশি গণমাধ্যমেরও নজর কেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ওয়ার্ল্ড ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ভিসামুক্ত নীতি এবং প্রবেশসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সহজ করার ফলে চীন ভ্রমণ আগের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধাজনক হয়েছে। পাশাপাশি, দেশটির উচ্চগতির রেলব্যবস্থা এবং বিস্তৃত ডিজিটাল পরিষেবা বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে।
চীনে ভিসামুক্ত প্রবেশের সুযোগ সম্প্রসারণ দেশটির বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে উঠেছে। বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশপ্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় ভ্রমণের প্রস্তুতিতে সময়, খরচ ও আনুষ্ঠানিকতার চাপ কমছে। ফলে স্বল্প সময়ের ছুটি কাটানো, হঠাৎ ভ্রমণের পরিকল্পনা করা কিংবা একই সফরে একাধিক গন্তব্য ঘুরে দেখার সুযোগ বাড়ছে।
এটি পর্যটন ব্যবসাতেও যোগ করেছে নতুন সম্ভাবনা। ভ্রমণ প্রতিষ্ঠানগুলো সহজেই নতুন গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে পারছে, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলছে এবং বিদেশি পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী বিশেষ ভ্রমণের আয়োজন করছে।
বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণকে আরও গতিশীল করে তুলেছে চীনের উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক। উন্নত রেল যোগাযোগের সুবাদে একই ছুটিতে একাধিক শহর ও পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখা সম্ভব হচ্ছে। চীনের পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে আগে পরিচিত নন, এমন পর্যটকদের কাছেও রেলভ্রমণ হয়ে উঠতে পারে আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা।
বিশেষ করে, যারা নিজেদের মতো করে ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তাদের জন্য নির্ভরযোগ্য আন্তনগর রেল যোগাযোগ বাড়তি স্বাধীনতা এনে দিয়েছে।
পর্যটকরা এখন শুধু বেইজিং বা শাংহাইয়ের মতো বড় শহরেই আটকে থাকছেন না; বরং আশপাশের ছোট শহর ও কম পরিচিত গন্তব্যেও সময় কাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
আধুনিক প্রযুক্তিও চীন ভ্রমণকে আরও সহজ করে তুলেছে। মোবাইল পেমেন্ট, অনলাইনে বুকিং, অ্যাপের মাধ্যমে গাড়ি ভাড়া এবং অনুবাদের সরঞ্জাম বিদেশি পর্যটকদের দৈনন্দিন নানা সমস্যার সমাধান দিচ্ছে।
যাতায়াত, হোটেল বুকিং কিংবা পর্যটনকেন্দ্রের টিকিট কেনার মতো কাজ এখন ডিজিটাল পরিষেবার মাধ্যমে সহজে সম্পন্ন করা যাচ্ছে। অপরিচিত পরিবেশেও পর্যটকেরা নিজেদের উদ্যোগে ভ্রমণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারছেন।
চীনের পর্যটনে আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রবণতা হলো স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে কাছ থেকে জানার আগ্রহ। বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক নিদর্শন কিংবা শাংহাইয়ের আধুনিক আকাশচুম্বী ভবন বরাবরের মতোই পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। তবে এর পাশাপাশি বিদেশি ভ্রমণকারীরা এখন স্থানীয় বাজার, ঐতিহ্যবাহী জনপদ এবং আঞ্চলিক উৎসবের প্রতিও আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মেলামেশা, আঞ্চলিক খাবারের স্বাদ নেওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখার মধ্য দিয়ে চীনকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছেন বিদেশি পর্যটকরা। এই প্রবণতা অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত পর্যটন গন্তব্যগুলোর জন্যও তৈরি করছে নতুন সম্ভাবনা। নিজস্ব ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে এসব অঞ্চল বিশেষায়িত পর্যটন পণ্য ও পরিষেবা গড়ে তোলারও সুযোগ পাচ্ছে।
লেখক: সাংবাদিক, সিএমজি বাংলা