ইয়াং ওয়েইমিং স্বর্ণা
চোখ বন্ধ করুন। একটি জায়গার কথা ভাবুন। পায়ের নিচে হাড়গোড়ের স্তূপ। মাথার ওপর নীরব আকাশ। চারপাশে অসংখ্য তরুণ-তরুণীর বিষণ্ন মুখ, যারা কিনা বহুকাল আগের একটি শীতের দিনে চিরকালের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাদের আর বড় হয়ে ওঠা হয়নি, কাউকে ভালোবাসা হয়নি, দেখা হয়নি পৃথিবীর সৌন্দর্য। এটা নানচিং। এটা চিয়াংতুংমেন।
নানচিং শহরের পশ্চিমে একটি জায়গা—চিয়াংতুংমেন। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি ধূসর ভবন। নীরব অথচ ভারী। ইতিহাসের মৌন সাক্ষী—যে কথা বলতে চায় না, কিন্তু নীরবও থাকতে পারে না। এটাই জাপানি আগ্রাসী বাহিনীর নানচিং গণহত্যায় নিহতদের স্মৃতি জাদুঘর।
১৯৮৫ সালে এখানে নির্মাণকাজ চলার সময় শ্রমিকদের কোদাল ও মাটি খোঁড়ার যন্ত্রে উঠে আসে এক অকল্পনীয় বাস্তবতা—একটি কঙ্কাল, তারপর আরেকটি, তারপর অগণিত অস্থি। এগুলো ছিল ১৯৩৭ সালের নানচিং গণহত্যার সময় নিহতদের তাড়াহুড়ো করে মাটিচাপা দেওয়া দেহাবশেষ। একটি শহরের ক্ষত, প্রায় অর্ধশতাব্দী মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকার পর, আবার উঠে আসে মানুষের সামনে, বিশ্বের সামনে।
বাংলাদেশের মানুষও জানে গণকবরের অর্থ কী। আমাদের মাটির নিচেও সমাহিত রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, বেদনা ও অগণিত মানুষের স্মৃতি। তাই নানচিংয়ে কাচের প্যানেলের নিচে সংরক্ষিত সেই অস্থিগুলো যখন দেখি, তখন বুঝতে পারি—এটি শুধু অন্য একটি দেশের মানুষের কষ্ট নয়। এটি এশিয়া এবং বৃহত্তর মানবজাতির একটি অভিন্ন ঐতিহাসিক স্মৃতি।
জাদুঘরের ভেতরে রয়েছে একটি দীর্ঘ দেয়াল। সারি সারি নাম—এত ঘন, যেন শরতের ঝরা পাতার স্তর। পাশে একটি সংখ্যা—তিন লাখ!
ভেতরে আরও এগিয়ে গেলে শুধু সংখ্যাটি আপনাকে স্তম্ভিত করবে না। বরং আপনাকে থামিয়ে দেবে ছবিগুলো।
একটির পর একটি সাদাকালো ছবি। কোথাও অস্পষ্ট, কোথাও স্পষ্ট। অধিকাংশ মুখই তরুণ। আছে শিশুও। লম্বা পোশাক পরা ভদ্রলোক, বেণি করা কিশোরী, কোলে শিশুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মা, স্কুলের পোশাক পরা ছাত্র।
তারা কি নিছকই একটি সংখ্যা? অথচ, তারা প্রত্যেকে একটি করে জীবন—যে জীবন হঠাৎ থেমে গিয়েছিল।
এই আঁধারের মাঝেও কয়েক খণ্ড আলোর সন্ধান পেয়েছি। কিছু মানুষের মুখ। সত্যিকারের ‘মানুষ’।
এমন এক জার্মান নাগরিক জন রাবে। জাপানি হামলার সেই ভয়াবহ সময়ে নিজের বাড়ি ও নিরাপদ অঞ্চল ব্যবহার করে ছয়শর বেশি চীনা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। চরম নিষ্ঠুরতার সামনে মানবতার এক ক্ষুদ্র কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধের প্রতীক তিনি।
ছিলেন আমেরিকান শিক্ষিকা মিনি ভট্রিন। নানচিংয়ের চিনলিং নারী ও শিশু কলেজে দিনরাত থেকে অসংখ্য চীনা নারী ও শিশুকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। গণহত্যার সেই ভয়াবহতা তার মনোজগত ওলোটপালট করে দিয়েছিল। মানসিক ক্ষত এতটাই গভীর হয়েছিল যে, তিনি আত্মহত্যাও করেন। ওটা কি আত্মহত্যা? নাকি হত্যা?
এই মানুষগুলোর গল্প আমাকে বাংলার একটি পরিচিত অভিব্যক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়—‘মানুষের মানুষ’।
সবচেয়ে অন্ধকার সময়েও কিছু মানুষ বেছে নেন মানুষ হয়ে থাকাকে। এটাও ইতিহাসের আরেকটি শিক্ষা।
ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক শুধু এই নয় যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল। আরও ভয়াবহ হলো—কখনও কখনও মানুষ সেই ঘটনার স্মৃতি মুছে ফেলতে, অস্বীকার করতে কিংবা তার অর্থকে বদলে দিতে চায়।
দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ ‘অস্বীকার’ শব্দটির অর্থ ভালোভাবেই বোঝে। উপনিবেশের নৃশংসতা অস্বীকার, যুদ্ধের অপরাধ অস্বীকার, গণহত্যার শিকার মানুষের অস্তিত্ব ও বেদনা অস্বীকার—এমন উদাহরণ কম নেই।
নানচিংয়ের স্মৃতি তাই শুধু অতীতের দিকে তাকানো নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাসকে কীভাবে স্মরণ করা হবে, সেটিও বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৩৭ সালের নানচিং গণহত্যার স্মৃতি নিয়ে চীন ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে। জাপানের যুদ্ধকালীন কর্মকাণ্ড, যুদ্ধাপরাধ এবং সেই ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে দুই দেশের সমাজ ও রাজনীতিতে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান দেখা যায়।
প্রতি বছর ১৫ আগস্ট জাপানের আত্মসমর্পণের বার্ষিকী ঘিরে দেশটিতে যুদ্ধস্মৃতি ও যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক নতুন করে সামনে আসে। ইয়াসুকুনি মন্দিরে শ্রদ্ধা নিবেদন নিয়েও প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ ও বিতর্ক রয়েছে। কারণ, মন্দিরটিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদেরও স্মরণ করা হয়।
অন্যদিকে, গত কয়েক বছরে জাপান তার প্রতিরক্ষা নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষামুখী নীতির পাশাপাশি ‘কাউন্টার-স্ট্রাইক ক্যাপাবিলিটি’, দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর মতো বিষয়গুলো দেশটির নিরাপত্তা আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই পরিবর্তনগুলোকে ঘিরে জাপানের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন রয়েছে।
একটি পুরোনো কথার কথা মনে পড়ে—যে প্রতিবেশী নিজের অতীতের ভুল নিয়ে আত্মসমালোচনা করতে অনিচ্ছুক, তার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ আচরণ নিয়ে প্রশ্ন জাগতেই পারে।
তবে ইতিহাসের শিক্ষা হওয়া উচিত ভয় নয়; বরং সতর্কতা।
হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন—নানচিং তো চীন ও জাপানের ইতিহাসের অংশ। বাংলাদেশের সঙ্গে এর সম্পর্ক কোথায়? সম্পর্ক আছে। কারণ ইতিহাস পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়।
১৯৩৭ সালে নানচিং গণহত্যার সময় জাপানি সামরিক বাহিনী চীনের পাশাপাশি এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলেও সামরিক অভিযান চালাচ্ছিল। পরবর্তী সময়ে জাপানের দখলদারিত্ব ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে—বার্মা, মালয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকায়।
সেই যুদ্ধে ভারতীয় উপমহাদেশের বহু মানুষও সরাসরি জড়িয়ে পড়েছিলেন। ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্য, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ যুদ্ধের নানা পর্যায়ে জাপানি সামরিক আগ্রাসনের শিকার হন।
তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এশীয় ইতিহাস শুধু কোনো একটি দেশের ইতিহাস নয়। এটি গোটা অঞ্চলের মানুষের অভিজ্ঞতার অংশ। সামরিকবাদ যখন সীমাহীন হয়ে ওঠে, তার অভিঘাতও সীমান্ত মানে না। এই কারণেই নানচিংয়ের স্মৃতি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি চীন সফরে আসা কয়েকজন ভারতীয় সাংবাদিক জাদুঘরটি ঘুরে দেখেছেন। নানচিং গণহত্যা সম্পর্কে আগে স্পষ্ট ধারণা ছিল না ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকার সাংবাদিক শ্রবণা চ্যাটার্জীর। জাদুঘরটি তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
তিনি বললেন, ‘যেটা ঘটেছে, যেটা সত্য, সেটাকে সেভাবেই বাঁচিয়ে রাখার যে চেষ্টা, সেই উদ্যোগটা নেওয়া ও এত চমৎকারভাবে যে করেছে সেটা প্রশংসাযোগ্য কাজ। অনেক বছরের অনেক শ্রম গেছে এই ইতিহাসটাকে বাঁচিয়ে রাখতে। আমার অনুভূতিটাও মিশ্র। বিশেষ করে গণকবরটা যেভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে তা একদিকে সাহসী কাজ, অন্যদিকে খুব নাড়া দেওয়ার মতো। আমরা কীসের মধ্য দিয়ে গিয়ে এতদূর এসেছি, সেটা আমরা সবসময় টিকিয়ে রাখতে পারি না। সেই হিসেবে এটি একটি প্রশংসাযোগ্য কাজ। এভাবে ইতিহাস সংরক্ষণের প্রক্রিয়াটা আগে কোথাও দেখিনি।’
কলকাতার গণশক্তি পত্রিকার মুখ্য সাংবাদিক অজয় দাশগুপ্ত বলেন, ‘১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জাপানের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। ফ্যাসিবাদী যুদ্ধের অবসানের একাশি বছর পূর্তির পরদিনই ফ্যাসিবাদী বীভৎসতার ভয়ঙ্করতম নিদর্শন নানচিং গণহত্যার শিকারদের স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করতে পারা তাৎপর্যপূর্ণ বটে।’
তিনি বলেন, ইতিহাসের তুলনামূলকভাবে অনালোচিত এই অধ্যায়কে চীন সরকার যেভাবে সুনিপুণভাবে উপস্থাপন করেছে, তা শিক্ষণীয়। একই সঙ্গে ফ্যাসিবাদের প্রকৃত চেহারা সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দুই সাংবাদিকের অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় থাকলে তার প্রভাব সীমিত হতে পারে। কিন্তু যখন একটি জাদুঘর সেই ইতিহাসকে ছবি, দলিল, স্থাপনা, দেহাবশেষ ও মানুষের গল্পের সঙ্গে যুক্ত করে, তখন অতীত যেন হঠাৎ বর্তমানের সামনে এসে দাঁড়ায়।
নানচিং গণহত্যার স্মৃতি জাদুঘরের শেষ প্রান্তে রয়েছে একটি বিশাল শান্তিঘণ্টা। দর্শনার্থীরা চাইলে সেটি হালকা করে বাজাতে পারেন।
ঘণ্টার শব্দ ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মনে হয়, যারা আর কোনোদিন কথা বলতে পারেননি, তাদের পক্ষেই যেন সেই ঘণ্টা কথা বলছে।
যদি কখনো চীনে যাওয়ার সুযোগ হয়, নানচিংয়ে একবার যাওয়া যায়। শপিং করার জন্য নয়।উঁচু ভবন দেখার জন্যও নয়। শুধু চিয়াংতুংমেনে দাঁড়ানোর জন্য। সেই মাটির ওপর, সেই নুড়ি পাথরের পাশে, যেখানে প্রতিটি অস্থি একটি করে মানুষের জীবনের কথা বলে।
সেখানে চীনা ভাষা জানার প্রয়োজন নেই। শুধু কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলেই হয়। কারণ—
বেদনার কোনো অনুবাদ লাগে না।আর আমাদের দায়িত্ব? ঘৃণা নয়, স্মরণ। স্মরণ করা, ইতিহাসকে সত্যের সঙ্গে সংরক্ষণ করা এবং পরবর্তী প্রজন্মকে বলা—একবার শীতে মানুষ তার নিজের মতো মানুষকেই নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। সেই শীত আর কখনো যেন ফিরে না আসে।
লেখক: সাংবাদিক, সিএমজি বাংলা, নানচিং থেকে।