নাম বদলেছে, আধিপত্যের খেলা বদলায়নি: ব্যারিস্টার ফুয়াদ

ফেসবুকে প্রকাশিত ব্যারিস্টার ফুয়াদের বক্তব্য থেকে

১৯০০ সালে ‘ইউনাইটেড ফ্রুট ফার্ম’ নামে একটি কোম্পানি গুয়াতেমালায় যায়। দক্ষিণ আমেরিকার একটি দেশ। তারা সরকারের কাছে বলল, তোমাদের প্রচুর জমি আছে, যেগুলোতে চাষাবাদ হচ্ছে না। পড়ে আছে, কিন্তু জমিগুলো উর্বর। আমরা এখানে কলা উৎপাদন করতে চাই। প্রচুর কলা চাষ করব এবং সেগুলো আবার আমেরিকায় নিয়ে গিয়ে ব্যবসা করব।

গুয়াতেমালা সরকার মনে করল, হ্যাঁ, আমার তো উর্বর জমি আছে, কিন্তু পড়ে আছে, চাষ হচ্ছে না। তাই তারা ইউনাইটেড ফ্রুট ফার্মকে কলা চাষের অনুমতি দিল। কোম্পানিটি প্রচুর বিনিয়োগ নিয়ে এলো। তারা রেললাইন নির্মাণ করল।

হাজার হাজার মাইল রেললাইন বসিয়ে পোর্টের সঙ্গে, রাজধানীর সঙ্গে, টেলিগ্রাফ ও কেন্দ্রীয় যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে, ব্যবসায়িক অঞ্চল ও ফার্মগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করল। ব্যবসা করতে করতে একপর্যায়ে, ৫০ বছরের মাথায় দেখা গেল, এই কোম্পানিটি গুয়াতেমালা নামক দেশের ৪০ শতাংশ জমির মালিক হয়ে গেছে।

একটা দেশের একটা কোম্পানি সেই দেশের ৪০ শতাংশ ভূমির মালিক হয়ে গেছে। তাহলে এখন আপনি চিন্তা করেন, সেই দেশটা আসলে কোথায় আছে? এবং মালিকানা হয়ে যাওয়ার পরে সে কী করছে? সে কি শুধু কলার চাষ করছে? না। সে আসলে দেশের রাজনীতি, দেশের অর্থনীতি, কে ক্ষমতায় যাবে, কে যাবে না—এসব নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।

১৯৫২ সালে একজন দেশপ্রেমিক মানুষ ক্ষমতায় এলেন। এসে এই ইউনাইটেড ফ্রুট ফার্মের ব্যবসা সম্প্রসারণের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলেন। দ্বিতীয়ত, তারা যেসব জমি কিনেছে কিন্তু কলার চাষ করছে না, সেগুলো আবার জাতীয়করণ করে নিলেন। ট্যাক্স আরোপ করলেন, যেন জনগণের মতো তারাও ট্যাক্স দেয়। চিন্তা করে দেখেন, এত বিশাল একটা কোম্পানি ট্যাক্স দিত না।

এই পরিস্থিতিতে তারা সিআইএকে জানাল যে, এখানে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

১৯৫৪ সালে সিআইএ তাদের একটি বাহিনী পাঠাল। কমান্ডো পাঠাল। তারা প্রধানমন্ত্রীকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করল এবং তাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দিল।

এরপর থেকেই দেখবেন, রাজনৈতিক বিজ্ঞানে আমরা একটা টার্ম ব্যবহার করি—‘বানানা রিপাবলিক’। গুয়াতেমালাকে কেন্দ্র করে কোস্টারিকা, আইভরি কোস্টসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি দেশে এই একই কোম্পানি কলার চাষ করত। পরবর্তীতে এই ব্যবসা তাদের হাতছাড়া হয়ে যায় এবং কোম্পানিটি নাম পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। ‘চিকিতা’ ব্র্যান্ড দেখবেন—পশ্চিমা দেশগুলোতে দোকানে যারা কলা কিনেছেন, আমরা এই ব্র্যান্ডের কলাও দেখেছি, খেয়েছি। তারা নাম পরিবর্তন করে এই ব্যবসা চালিয়েছে।

এখন দেখেন, আমাদের এই আধিপত্যবাদের গল্পটা যখন আমরা আলোচনা করি, তখন আমাদের এই ভূখণ্ডে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ছাড়া এই লড়াইয়ের গল্প আমাদের নিকট ইতিহাসে আপনি কানেক্ট করতে পারবেন না। এটা শুরু কোথায় হয়েছে এবং কীভাবে শুরু হয়েছে?

সিম্পলি একটা কোম্পানি দিয়ে। ১৬০০ শতাব্দীতে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে একটা কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করেছে—ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামে। তারা এখানে এসে বাদশাহ আলমগীরের কাছে ব্যবসা করার অনুমতি চেয়েছে। অনেকটা জায়গিরদারের মতো—আমাদের একটা জায়গা দেন, আমাদের এই কোর্ট ব্যবহার করার অনুমতি দেন। আমরা এগুলো এগুলো করব। আপনাকে বছরে এত টাকা দেব এবং আমরা জিনিসপত্র দেশের বাইরে রপ্তানি করব।

ইন ফ্যাক্ট, এই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৬০০ শতাব্দীতে এখানে আসার পর ইউরোপের অনেকগুলো দেশের সঙ্গে ভারতেই যুদ্ধ করেছে। পর্তুগিজদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, ডাচদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, তারপর ফরাসিদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। কেন করেছে? এখানকার ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। আর এই নিয়ন্ত্রণ নিতে নিতে একটা জায়গায় এসে ১৭৫৭ সাল হয়ে গেছে।

আপনারা জানেন, এখানকার যারা উচ্চবর্ণের হিন্দু ছিল, ব্যবসায়ী ছিল এবং যারা প্রচণ্ড নবাববিরোধী ছিল, মুসলিম শাসনের অধীনে তারা মনে করছিল যে আমাদের দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তারা সবাই মিলে এই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে একত্রিত হয়ে একটা ষড়যন্ত্র করল। যেটাকে আপনি দেখবেন, ‘ওয়াটসন কনস্পিরেসি’ বলা হয়।

জগৎশেঠ, মিরজাফর, উমিচাঁদ এবং ওয়াটসন নামে একজন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তা—সিভিল সার্ভেন্ট—তারা সবাই মিলে কলকাতায় এই খিচুড়িটা পাকিয়েছে যে, নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে কীভাবে এখান থেকে সরাতে হবে।

ক্যারেক্টারগুলো ফলো করেন। তারা আসলে কী কী ভূমিকা পালন করছে, সেটা আজকের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।

আপনাদের যখন বলছি জগৎশেঠ, উমিচাঁদ, রায়দুর্লভ—এরা আসলে কে? কারা?

এস আলম, বসুন্ধরা, মেঘনা, ইউনিমার্ট, ইউনাইটেড, সিটি, টিকে—গত ১০-১৫ বছরে বাংলাদেশে যত সিন্ডিকেট হয়েছে, যাদের কারণে আমরা ৬০-৮০ টাকার তেল ২০০ টাকায় কিনেছি, ৭০ টাকার চিনি ১৬০ টাকায় কিনেছি, ১৫ হাজার টাকায় কাঁচামরিচ কিনেছি—উহারা কাহারা?

অতএব, নতুন করে কিছু ঘটছে না। আমরা যারা ইতিহাস দেখেছি, ঠিক একই জিনিসগুলো নতুন রূপে আসছে।

ওয়াটসন কে হচ্ছে? আমার দাদা! ওপারে থাকেন, যেখানে যার দরগায় এখন আমার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বসবাস করছেন।

তাহলে আপনি দেখেন, বিষয়টা কী। আপনি যদি সিম্পলি ওয়াটসনের জায়গায় দিল্লিকে, মোদিকে, বিজেপিকে রাখেন আর জগৎশেঠ, উমিচাঁদ, কৃষ্ণপদ চৌধুরীর জায়গায় যদি আজকের এই অলিগার্কদের রাখেন, আপনি দেখবেন যে আমরা নতুন করে ১৭৫৭ সালের মধ্যেই আসছি।

আমাদের ১৭৫৭ সালটা অনেক লম্বা হয়ে গেছে। অনেক লম্বা। এবং এটা শেষ হচ্ছে না।

এই প্রক্রিয়াতেই দেখবেন, আপনি এখন মিলিয়ে দেখেন—আমরা যখন এনার্জি সার্বভৌমত্ব নিয়ে কথা বলছি, এনার্জি সিকিউরিটি নিয়ে কথা বলছি, এমন একটা সময়ে যেখানে বাংলাদেশ সরকার তার ইতিহাসের সবচেয়ে প্রফিটেবল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিপিসিকে প্রাইভেটাইজ করার চিন্তা করছে। তার তেলের সরবরাহ, গ্যাসের সরবরাহ, কেনাবেচার একটা মার্কেট শেয়ার সে বসুন্ধরাকে দিতে চাচ্ছে অথবা তার পছন্দের অন্য কোনো কোম্পানিকে দিতে চাচ্ছে।

অথচ এটা কিন্তু একটা প্রফিটেবল ইনস্টিটিউশন।

অথচ আমাদের প্রায় ৮০টির ওপরে কোম্পানি আছে বিসিআইসির অধীনে, যারা দেখবেন হিউজলি—মানে—লস এন্টারপ্রাইজ। আমাদের বিমান, আমাদের ন্যাশনাল রেলওয়ে—এরকম অসংখ্য প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু এগুলোকে প্রাইভেটাইজ করার কথা আলোচনা হচ্ছে না কেন? আপনি তেল-গ্যাসে ঢুকছেন কেন?

কারণ হচ্ছে, ন্যাশনাল রেলওয়েটা যদি আমার কোনো শত্রুর কাছেও চলে যায়, সে আসলে আমার সর্বোচ্চ কী ক্ষতি করতে পারবে? আমি যেখানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে চার ঘণ্টায় যাওয়ার কথা, আমাকে আট ঘণ্টায় নিয়ে যাবে। আমি ক্ষেপব, আমি মারামারি করব, আমি ট্রেনের বগি জ্বালিয়ে দেব। এই তো সর্বোচ্চ করব রিঅ্যাকশন।

তেল-গ্যাস যদি মার্কেটে না থাকে, তাহলে কী কী হতে পারে? আপনি শুধু এটার কনসিকোয়েন্স একটু চোখ বন্ধ করে চিন্তা করেন।

বাংলাদেশ যেন ১৬০০ সালে ফিরে গেছে। কোথাও কোনো বিদ্যুৎ নেই। কোথাও কোনো গ্যাস নেই। এভরি কোম্পানি রিলাই করে অন পাওয়ার—সব বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ নেই, আনএমপ্লয়মেন্ট নেই—সব জায়গা থেকে ছাঁটাই চলছে। ওভারনাইট কোটি কোটি মানুষ বেকার হয়ে গেছে।

আবার গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি তার যে রিকোয়ার্ড টাইমে পণ্য ডেলিভারি করার কথা, সেটা করতে পারছে না।

শুধু এটা চিন্তা করেন। ভাবেন, তাহলে সেই রকম একটা প্রফিটেবল এন্টারপ্রাইজ, যেটা কোনোদিন সরকারীকরণ করা উচিত না আমাদের মতো জায়গায়। কারণ এটা কোনো সাধারণ পণ্য নয় যে আমি এটাকে জিটুজিতে দিয়ে দিলাম। ব্যাপারটা এরকম না যে এটা চাল-ডাল, অন্য একজন কিনে কোম্পানিকে লাইসেন্স দিয়ে দিলাম। এটা মেয়ার কমোডিটি নয়। এটা ন্যাশনাল সিকিউরিটি আইটেম, আপনার সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন, আপনার দেশের অস্তিত্বের প্রশ্ন।

এবং সেটা দিচ্ছেন কাকে?

এর আগেও তো প্রাইভেটাইজ করা হয়েছে। যাদের করেছেন, পাওয়ার সেক্টরে, এনার্জি সেক্টরে—ওরা কী ডেলিভার করেছে?

আমরা এলপিজি সিলিন্ডার প্রাইভেটাইজ করেছি। বলা হচ্ছে, সরকার নীতিমালা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করবে। আগে করতে পেরেছেন? সরকার তো সিলিন্ডারের প্রাইস ঠিক করে দেয় যে ১২ কেজির এই বোতলটা আপনি ১৬০০ টাকা দিয়ে কিনবেন। ধরেন, বাজারে গিয়ে দেখেন তো আপনি সরকারের দামে কিনতে পারেন কিনা। না। আপনাকে ২০০ টাকা, ২৫০ টাকা, ৩০০ টাকা বেশি দিতে হয় কিনা। তারপরও সেটা অ্যাভেইলেবল না।

আমরা তো প্রাইভেটাইজ করেছি।

আমাদের বিদ্যুৎকে কুইক রেন্টালের নামে কী হয়েছে দেখেন। আওয়ামী লীগ আমলে সরকার বলেছে যে আমাদের প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট পাওয়ার ক্যাপাসিটি আছে। ৪ হাজার মেগাওয়াট ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট বাদ দিলে আমার তো ২৫ হাজার মেগাওয়াট প্রোডাকশন ক্যাপাসিটি থাকার কথা।

তাহলে আমার সামারে কেন ঘাটতি হচ্ছে? কেন আমার এটা ১৪ হাজার, ১৩ হাজার মেগাওয়াটের ওপরে উঠছে না?

তাহলে আমার পল্লী বিদ্যুৎ, আমার পুরো গ্রামীণ এলাকা যে অন্ধকার হয়ে গেছে, কেন যাচ্ছে?

তাহলে প্রাইভেটাইজ করলাম তো। করার পরে কী লাভ হয়েছে?

এই বসুন্ধরাকে তো আওয়ামী লীগের আমলে ২০১৬ সালে বিটুমিন প্রডিউস করার জন্য লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। তার বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে ডিজেল এবং ফার্নেস অয়েল সে প্রডিউস করে মার্কেটে কেনাবেচা করার অনুমতি নিয়ে নিয়েছে।

তারপর কী হয়েছে?

যারা প্রোডাক্ট আনতেন, বাংলাদেশে ইমপোর্ট করতেন, টোটাল মার্কেটে মনোপলি এস্টাবলিশ করে সে সবাইকে ওয়াইপ আউট করে দিয়েছে।

তাহলে আপনি ট্যারিফ কন্ট্রোল করতে পারছেন না। প্রাইস কন্ট্রোল করতে পারছেন না। মার্কেটে কম্পিটিশন ধরে রাখতে পারছেন না। আমার সিকিউরিটি মেনটেন করতে পারছেন না। আপনার নীতিমালা আপনি বাস্তবায়ন করতে পারছেন না।

তাহলে আপনি সব জায়গাতে ফেইল করার পরে মনে করছেন যে বাংলাদেশে যদি আবার তেল-গ্যাসটা আমি প্রাইভেট করে দিই, আংশিক এটা আপনি ম্যানেজ করতে পারবেন?

কিসের ভিত্তিতে বললেন?

এক্সাক্টলি ওই যে জগৎশেঠ, উমিচাঁদ, রায়দুর্লভরা মিলে যেভাবে পুরো ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রি…

কলকাতা… আপনার লর্ড ক্লাইভ, ব্রিটিশ ভাইসরয় ছিলেন, যার নেতৃত্বে যুদ্ধ হয়েছে। তিনি যখন লন্ডনে ফিরে যান যুদ্ধের পরে, দুইটা জাহাজ ভরে শুধু গোল্ড নিয়ে গেছেন।

একটা চোরের জাতি—চিন্তা করেন। একটা ব্রিটিশরা—একটা হাইলি প্রফিটেবল ‘থিপস নেশন’—অফ থিস অ্যান্ড বাবলারস, ওই সময়টার কথা বলছি।

এত বড় চোর লর্ড ক্লাইভ যে চোরেরা মিলে সংসদে আলোচনা করছে, লর্ড ক্লাইভ এটা কী করল? জাতির সম্মান, ইজ্জত, মর্যাদা সব নষ্ট করে দিয়েছে।

তার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ইনভেস্টিগেশন হয়েছে, ইনকোয়ারি হয়েছে। তার শাস্তি হয়েছে। তাকে পিয়ারেজ দেওয়া হয়নি। পরে সে স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ডে গিয়ে পিয়ার হয়েছে। আত্মহত্যা করতে হয়েছে ডিসগ্রেসের কারণে, অপমানের কারণে।

সে মনে করল, আমি ব্রিটিশ জাতিকে, ব্রিটিশ কুইনকে এত কিছু এনে দিলাম, আমার বিরুদ্ধে আবার এই অপমানজনক ইনভেস্টিগেশন!

তাহলে আপনি চিন্তা করে দেখেন, কী পরিমাণ রিসোর্স সে বাংলা থেকে নিয়ে গেছে, চুরি করে নিয়ে গেছে।

এখন সেই লর্ড ক্লাইভের গোল্ডভর্তি জাহাজে নিয়ে যাওয়াটাকে এস আলমের একটা ব্যাংক থেকে, ইসলামী ব্যাংক থেকে ৯৪ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা ভাবেন। সাইপ্রাসে ৩০-৩৫ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা ভাবেন। সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ৩০০-এর ওপরে লন্ডনে বাড়ি থাকার বিষয়টা ভাবেন।

যেই জায়গায় একটা লর্ড ক্লাইভ বসে আছে, আমাদের জায়গায় প্রতিদিন টকশোতে এসে দেখি কথা বলতেছে বড় বড় ব্যবসায়ীরা, দালালরা। এবং তারা—দেখলাম—অল্প সবাই চোর। তাদের সবার কোনো না কোনো স্বার্থ আছে।

এক চোরের বক্তব্য শুনতেছি। একটা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে, একটা অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট—তার ব্যাপারে দেখলাম, সেও নাকি ১০০০ কোটি টাকা লুটপাট করে বাড়ি করেছে, লন্ডনে কয়েকটা।

আর তারা আমাদেরকে প্রতিদিন নসিহত করে। তারাই হচ্ছে আমাদের হুজুর। প্রতিদিন আমাদেরকে ওয়াজ মাহফিল শোনায় রাষ্ট্রের…

তাহলে আজকে যখন আমরা কাঠামোগতভাবে আধিপত্যবাদের কথা বলছি, আমাদেরকে, আমার জাতিকে, আমার তরুণদের মাথায় রাখতে হবে যে ইতিহাসের কোন পরিক্রমায় আমি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পরাভূত হয়েছিলাম। সেই জায়গাটা মাথায় রাখা জরুরি।

এবং হিস্টরিক্যাল জমিদারি সিস্টেমটা দেখেন—কেন সেই লড়াইটা অনিবার্য হয়ে গিয়েছিল।

১৭৯৩ সালে যখন পার্মানেন্ট সেটেলমেন্ট করল, জমিদারি প্রথা চালু করল, পার্মানেন্ট সেটেলমেন্টের মধ্য দিয়ে আমার টোটাল কৃষক সমাজ, যারা ন্যূনতম একটা মালিকানা রাখত, তারা ওভারনাইট গরিব হয়ে গেল, শূন্য হয়ে গেল।

আগের দিনের মালিকানা ছিল—যিনি চাষ করেন, তিনি জমির মালিক। এটাই ছিল প্রিন্সিপল।

সেটা আপনি পুরো জায়গিরদারি, তালুকদারি সিস্টেমে দিয়ে দিলেন।

তাহলে কী হলো?

সেকেন্ড টিয়ারে আরেকটা ব্রিটিশরা তৈরি করল। সেটা হচ্ছে উচ্চবর্ণের হিন্দু জমিদার শ্রেণি।

বাঙালি মুসলমান এবং বঙ্গীয় নিম্নবর্ণের হিন্দুরা টু-টিয়ার কলোনাইজেশনের মধ্যে পড়লাম। আধিপত্যবাদের মধ্যে পড়লাম। যে কারণে তারা সবাই মিলে কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য লড়াই করেছিল।

এই যে হিস্ট্রিকে আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আমাকে একটা রাষ্ট্রের ফ্রেমিংকে একটা রং-কনটেক্সটে পড়তে বাধ্য করা হচ্ছে—এই ফ্রেমিংটা হচ্ছে বয়ানের পলিটিক্স।

এবং সেখান থেকে এখন আলোচনা করা, বোঝার বিষয় হচ্ছে যে ইন্ডিয়ান হেজিমনির সবচেয়ে মোটা যে বয়ানের রাজনীতি, তারা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে—কলকাতাকেন্দ্রিক, বলিউডকেন্দ্রিক। এবং সেইটাই হচ্ছে আমাদের এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের জায়গা।

জুলাইকে নিয়ে দেখেন, কী কী বয়ান তৈরি করছে প্রতিদিন।

প্রথম কথা বলছে যে, আমরা যারা জুলাইতে আন্দোলনে ছিলাম, পক্ষে ছিলাম, আমরা নাকি মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করি। প্রতিদিন আমরা নাকি মুক্তিযুদ্ধকে জুলাইয়ের মুখোমুখি করি।

যখন আপনি কাউন্টার-চ্যালেঞ্জ করবেন এই দালাল গোষ্ঠীকে, তখন দেখবেন—ভাই, কে করছে? একটু বলেন তো। দুই একটা এক্সাম্পল দেন তো। বিএনপির কে করছে? জামায়াতের কে করছে? এনসিপির কে করছে? আমরা কে করছি? আমাদের পক্ষের বুদ্ধিজীবীরা কে কাজটা করছে?

বলেন তো দুই একটা এক্সাম্পল।

তখন বলে যে, হ্যাঁ, ওই যে লম্বা চুলওয়ালা একটা ছেলে—ও তো দেখি, এর মুখের ভাষা ভালো না। ওসমান হাদি কিসব বলে, টুকটাক বলে…

আমি বললাম, এটা তো হলো না। আপনার উত্তর মিলল না। আপনি বলছেন যে জুলাইকে আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধের মুখোমুখি করছি। কীভাবে করলাম? কোথায় করলাম?

আমি যখন বয়ানের পলিটিক্সকে চ্যালেঞ্জ করছি, আমি যখন ন্যারেটিভকে চ্যালেঞ্জ করছি—যেটা আরোপিত, যেটা অসত্য, যেটা ফ্যাকচুয়ালি অন্যভাবে আমার ব্যাখ্যা করার সুযোগ আছে—আমার মুক্তির লড়াইকে শ্রদ্ধা করেই সেটা কি আপনি বলছেন যে আমি করছি?

দ্বিতীয়ত, দেখবেন একটা বয়ান তারা বারবার বলার চেষ্টা করছে, আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং মুখোমুখি করছে।

সেটা হচ্ছে—কী লাভ হলো?

‘কী লাভ হলো’ থিওরি দেখবেন।

দেখেন কী লাভ হওয়ার মধ্য দিয়ে তারা বলে যে আগে তো রাস্তাঘাটে ট্রাফিক জ্যাম আগের মতোই আছে। জিনিসপত্রের দাম তো আগের মতোই আছে। এস আলম চুরি করলে দোষ, তো বাকিরা কি চুরি করছে না? আমলাতন্ত্রের দুর্নীতি কি বন্ধ হয়েছে? গুম-খুনের বিচার কি শেষ হয়েছে?

দেখবেন, যত নাগরিক সমস্যা আছে, সেগুলো সবগুলোকে টেনে বলবে যে, হাসিনাকে সরিয়ে লাভটা কী হয়েছে?

আপনি আর্গুমেন্টটা দেখেন।

তাহলে এই যে পার্সপেক্টিভ এলিমেন্ট আসছে না—বাংলাদেশে দেখছেন না গত কয়েক দিনে অনলাইনে—এই যে ‘কী লাভ হলো’?

আমরা তো জুলাইয়ের পক্ষে ছিলাম। মানে, আমার আত্মীয়স্বজন, আমার বন্ধুবান্ধব, বাবা-মা আওয়ামী লীগ করেছে, গুম-খুনের সঙ্গে জড়িত ছিল, লেফটেন্যান্ট জেনারেল ছিল—কিন্তু জুলাই করলাম।

মানে তো এগুলোর বিচার করতে হবে।

কেন?

তাহলে আপনি দেখেন, ন্যারেটিভকে দিয়ে ঠিক করা হচ্ছে আপনি কার জন্য কাঁদবেন, কাকে স্মরণ করবেন, কাকে ভুলে যাবেন, কার জন্য লড়াই করবেন, কার জন্য লড়াই করে আবার অপমানিত বোধ করবেন, রিগ্রেট করবেন—এইটা তারা ঠিক করে দিচ্ছে।

এটার একটা বড় ফেনোমেনাল এক্সাম্পল হচ্ছে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর।

দেখেন, যেটা সব দল প্রসপার্টি একমত হয়েছে, প্রথম অধিবেশনে যেটা রেটিফাই করবে, এজ ইটস অর্ডিন্যান্সের মতো করে। বিএনপি লাস্ট মোমেন্টে এসে চারটা সংসদ দিনে এটাকে প্রথমে করল এই এগ্রিমেন্টের ব্যাপারে।

দ্বিতীয়ত দেখেন, তারা জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে কোনো কার্যক্রম চালু রাখার ব্যবস্থা করেনি গত ছয় মাসে। জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে কোনো স্টাফ, কর্মকর্তা, কর্মচারী কাউকে অ্যাপয়েন্ট করেনি গত ছয় মাসে। যারা আছেন, তারা কেউ বেতন পাচ্ছেন না গত চার-পাঁচ মাসে।

একই রকমভাবে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন—গত ছয় মাস থেকে কেউ বেতন পাচ্ছেন না।

তাহলে আপনি জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারি। আপনি জুলাইকে ধারণ করেন, পক্ষে ছিলেন বলে দাবি করছেন। কিন্তু বয়ানের রাজনীতিতে আপনি কিন্তু এক্সাক্টলি বিজেপির, আওয়ামী লীগের, দিল্লির, কলকাতার যে হিন্দুত্ববাদী ফ্রেম-বয়ান, সেটা আপনি আবার প্রমোট করছেন। সেটার ওপর আমল করছেন।

আপনি ফেলানির যে স্কাপচার ছিল, সেটা সরিয়ে ফেলেছেন। তারপরে ইন্ডিয়ান হেজিমনির কাঁটাতারের যে সেকশন ছিল, সেটা সরিয়ে ফেলেছেন।

কেন?

তাহলে এই যে কনট্রাডিকশন, এটা প্রমাণ করছে যে বয়ানের রাজনীতিতে যে কালচারাল হেজিমনির জায়গাটা ছিল, এই জায়গাটা এজ ইট ইজ রয়ে গেছে।

এবং আমরা যাকে গণঅভ্যুত্থানের শক্তি এবং দল বলছি, তারা এই জায়গাটা বুঝতে পারছে না। অথবা বুঝেও তাদের ভিতরে যে হীনমন্যতা কাজ করছে—সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের তাদের যে হীনমন্যতা কাজ করছে—জুলাইকে ধারণ করার জন্য সেই জায়গাতে মনে হচ্ছে এই যে আধিপত্যবাদের হেজিমনি, সেটা চলমান আছে।

আজকের এই ফোরাম থেকে আমরা আহ্বান করছি আমাদের তরুণদেরকে, আমাদের দেশবাসীকে—এই ইতিহাসের যে পরম্পরা, আমাদের পরাধীনতা কীভাবে এসেছিল, এটা বোঝা যেমন জরুরি, আজকে কারা কারা ইতিহাসের সেই দায় এখন পর্যন্ত কন্টিনিউ করছেন, হেজিমনি কন্টিনিউ করছেন—শুধুমাত্র নাম বদলে, ফিগার বদলে, প্রতিষ্ঠান ভিন্ন নামে।

কিন্তু আমাদের লড়াই একই লড়াই।

যেই লড়াইতে ১৯০ বছর ধরে আমাদের পূর্বপুরুষরা লড়াই করেছেন। যেই লড়াই আমরা যুগের পর যুগ, দশকের পর দশক ধরে রাষ্ট্র বানানোর জন্য করেছি। স্বাধীনতার জন্য করেছি। মুক্তির জন্য করেছি।

প্রত্যেকটা লড়াইয়ের মেসেজ হচ্ছে—আমার অধিকারের লড়াইটা কন্টিনিউ করতে হবে।

স্বাধীন থাকার একমাত্র শর্ত হচ্ছে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই চলমান রাখা। যদি আপনি স্বাধীন থাকতে চান, এটাই করতে হবে।

যদি মেনে নেন, যা হচ্ছে সব ঠিক আছে—ঠিক আছে, আপনার সমস্যা নাই। আবার পরাধীনতার শৃঙ্খল আপনাদের গায়ে, হাতে পড়বে। সেটা দেখবেন। দাসত্বের জীবনযাপন করবেন, অপমানিত বোধ করবেন এবং অন্য দেশের তাবেদারি করবেন।

এটা চয়েস।

আমরা ’২৪-এ বেছে নিয়েছি—আমরা লড়াই করব। জীবন দেব, রক্ত দেব। কিন্তু স্বাধীনতা-আজাদির প্রশ্নে কোনো কম্প্রোমাইজ আমরা করব না।