একটা সময় ছিল—বাংলাদেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস মানেই যেন বিকাশ। টাকা পাঠানো, ক্যাশ আউট, বিল দেওয়া কিংবা দোকানে পেমেন্ট—সবকিছুর জন্য মানুষের প্রথম পছন্দ ছিল বিকাশ। আর এমন ব্র্যান্ডিং এর সুবাদে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করে নিল ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি।
কিন্তু ডিজিটাল পেমেন্টের বাজার বদলাচ্ছে। আর এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রতিষ্ঠান নয়; বরং ইন্টারঅপারেবিলিটি বা আন্তঃপ্ল্যাটফর্ম লেনদেনের নতুন যুগ।
বাংলাদেশ ব্যাংক ধীরে ধীরে এমন একটি পেমেন্ট ইকোসিস্টেম তৈরি করছে, যেখানে একটি ব্যাংক, একটি MFS কিংবা একটি পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের গ্রাহককে শুধু সেই প্ল্যাটফর্মের মধ্যেই আটকে থাকতে হবে না। NPSB-এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের অ্যাকাউন্ট ও ওয়ালেটের মধ্যে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ বাড়ছে।
অর্থাৎ, আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু “কার গ্রাহক বেশি”—এখানে আটকে থাকবে না। প্রশ্ন হবে, কার সেবা সবচেয়ে সহজ, সস্তা এবং ঝামেলামুক্ত?
এখানেই বিকাশের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ।
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু গ্রাহক তাদের নির্দিষ্ট লেনদেন সীমিত হওয়া বা অ্যাকাউন্ট-সংক্রান্ত সমস্যার অভিজ্ঞতার কথা বলছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক যখন আন্তঃলেনদেনের দরজা খুলে দিচ্ছে, তখন গ্রাহকের হাতে বিকল্প বাড়ছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ব্যাংক ও MFS-এর মধ্যে এবং MFS-to-MFS লেনদেন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্যই ছিল নগদনির্ভরতা কমানো এবং ডিজিটাল লেনদেনকে আরও সহজ করা।
এটি MFS ব্যবসার পুরোনো “ওয়ালড গার্ডেন” মডেলের জন্য বড় পরিবর্তন।
আগে গ্রাহক যদি একটি ওয়ালেটে টাকা রাখতেন, সেই ওয়ালেটের ভেতরেই থাকা অনেক বেশি স্বাভাবিক ছিল। এখন যদি ব্যাংক থেকে সরাসরি অন্য MFS-এ টাকা পাঠানো যায়, আবার এক MFS থেকে অন্য MFS-এ টাকা যায়, তাহলে গ্রাহকের কাছে ব্র্যান্ড বদলানোর খরচও কমে যায়।
আর যেখানে switching cost কমে, সেখানে customer loyalty-এর চেয়ে customer experience বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এখানেই উপায়ের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ধরা যাক, একজন গ্রাহক একটি নির্দিষ্ট লেনদেন করতে গিয়ে সমস্যায় পড়লেন। একই কাজ যদি অন্য একটি MFS কম ঝামেলায়, কম খরচে বা কোনো promotional offer-এর মাধ্যমে করে দেয়, তাহলে গ্রাহক কেন পুরোনো প্ল্যাটফর্মেই থাকবেন?
এই জায়গাটিই মার্কেটিংয়ের ভাষায় pain point exploitation।
চ্যালেঞ্জার ব্র্যান্ডের কাজ হলো—বাজারের বড় খেলোয়াড় যেখানে দুর্বল, ঠিক সেখানেই নিজের শক্তি দেখানো।
উপায়ের NPSB-ভিত্তিক টাকা আনা এবং UCB ATM থেকে নির্দিষ্ট সুবিধায় cash-out-এর মতো অফার তাই কেবল একটি promotional campaign হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বড় প্রতিদ্বন্দ্বীর ecosystem-এর বাইরে একটি বিকল্প পথ তৈরির চেষ্টা হিসেবেও দেখা যায়।
তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।
বিকাশকে নোকিয়ার সঙ্গে তুলনা করা খুব সহজ। “নোকিয়া রাজা ছিল, তারপর Android এসে সব শেষ করে দিল”।
বিকাশের একচেটিয়া সুবিধার জায়গাটি ধীরে ধীরে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে।
আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে Bangla QR-এ। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে Bangla QR লেনদেনে আন্তঃব্যাংক চার্জ শূন্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে মার্চেন্টদের জন্য incentive ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
এর অর্থ হলো, ভবিষ্যতে একটি দোকানে একটি নির্দিষ্ট MFS-এর QR না থাকলেও গ্রাহক নিজের পছন্দের ব্যাংক বা ওয়ালেট ব্যবহার করে Bangla QR-এর মাধ্যমে পেমেন্ট করতে পারবেন।
এখানে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি প্রযুক্তিগত নয়—মানসিক।
গ্রাহক বুঝতে শুরু করবেন, “এই দোকানে বিকাশ নেই, তাই আমি পেমেন্ট করতে পারব না”—এই ধারণাটি আর সত্যি নয়।
একইভাবে, “আমার টাকা এই ওয়ালেটেই থাকতে হবে”—এই ধারণাটিও দুর্বল হবে।
তখন প্রতিটি MFS-এর জন্য প্রশ্ন হবে:
আপনার প্ল্যাটফর্মে আমি কেন থাকব?
উত্তরটি শুধু “আমাদের সবচেয়ে বেশি গ্রাহক” হতে পারবে না।
উত্তর হতে হবে—দ্রুততর সেবা, কম খরচ, ভালো customer support, বেশি সুবিধা, নিরাপত্তা এবং সর্বোপরি কম friction।
এখানেই ব্যবসার জন্য তিনটি বড় শিক্ষা আছে।
প্রথমত, প্রতিযোগীর দুর্বলতা খুঁজুন।
বড় ব্র্যান্ডের সবচেয়ে বড় সমস্যা অনেক সময় তার আকার। বিশাল প্রতিষ্ঠান ধীরে সিদ্ধান্ত নেয়। ছোট প্রতিষ্ঠান সেই জায়গায় দ্রুত আঘাত করতে পারে। গ্রাহক যেখানে সমস্যায় পড়ছেন, challenger brand সেখানে সমাধান নিয়ে হাজির হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, customer lock-in-এর চেয়ে customer preference বেশি শক্তিশালী।
গ্রাহককে প্রযুক্তিগতভাবে আটকে রাখা যায়, কিন্তু সন্তুষ্ট রাখা যায় না। শেষ পর্যন্ত মানুষ সেই প্ল্যাটফর্মই ব্যবহার করবে, যেটি তার কাজ সহজ করে।
তৃতীয়ত, timing অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রাহকের মধ্যে frustration তৈরি হওয়ার পর offer দিলে সেটি শুধু বিজ্ঞাপন থাকে না—তা হয়ে যায় switching incentive।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত অন্যটি।
বাজারের রাজা হওয়া আর বাজারের রাজা হয়ে থাকা—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
বিকাশের সামনে এখন নোকিয়ার মতো পতন অনিবার্য।
আগে প্রশ্ন ছিল—“আপনার বিকাশ আছে?”
ভবিষ্যতের প্রশ্ন হতে পারে—
“আপনার পেমেন্টের জন্য কোনটা সবচেয়ে ভালো?”
আর সেই প্রশ্নের উত্তর যদি গ্রাহক প্রতিবার নিজের সুবিধা অনুযায়ী দিতে পারেন, তাহলে কোনো MFS-এর জন্যই বাজারকে নিজের সম্পত্তি মনে করার সুযোগ থাকবে না।
matinews.com এ বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন
matinewsbd@gmail.com