চীনে বিয়ে হলো সহজ, ফুলেফেঁপে উঠছে ‘রোমান্স অর্থনীতি’

সাকিব সিকান্দার

ফুটবল মাঠে তখন দর্শকদের উল্লাস। বাইরে অস্থায়ী মঞ্চ, লাল রঙের সাজসজ্জা আর ক্যামেরার ঝলকানি। ম্যাচ দেখতে আসা মানুষের ভিড়ের মধ্যেই হবু স্বামীর হাত ধরে বিয়ের নিবন্ধনের জন্য এগিয়ে যান উয়ু চিংইয়ু। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তারা শপথ নেন, হাতে পান বিয়ের সনদ।

পূর্ব চীনের চিয়াংসু প্রদেশের উসি শহরে ফুটবল ম্যাচ চলাকালে স্টেডিয়ামের বাইরে এভাবেই বিয়ে নিবন্ধন করেন এই দম্পতি। উয়ুর ভাষায়, ফুটবল দেখার উত্তেজনা আর বিয়ের আনন্দ এক হয়ে গিয়েছিল সেই মুহূর্তে।

“এটি সত্যিই অবিস্মরণীয় ছিল। ফুটবল খেলার উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বিয়ের রোমান্স মিশে গিয়েছিল,” বলেন তিনি।

চীনে বিয়ের নিবন্ধন এখন আর শুধু সরকারি কার্যালয়ের আনুষ্ঠানিক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। পর্যটনকেন্দ্র, ফুটবল স্টেডিয়াম, সংগীত উৎসব, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কিংবা ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা—তরুণ দম্পতিরা নিজেদের পছন্দ, ভালোবাসার গল্প ও আগ্রহের সঙ্গে মিলিয়ে নিবন্ধনের জায়গা বেছে নিচ্ছেন।

২০২৫ সালের মে থেকে চীনে দম্পতিদের আর নিজ নিজ নিবন্ধিত স্থায়ী বাসস্থানের এলাকায় বিয়ে নিবন্ধন করার বাধ্যবাধকতা নেই। এখন তারা দেশের যেকোনো যোগ্য বেসামরিক নিবন্ধনকেন্দ্রে বিয়ে নিবন্ধন করতে পারেন।

এই নীতিগত পরিবর্তনের পর স্থানীয় প্রশাসনগুলো বিয়ের নিবন্ধনকে আরও ব্যক্তিগত, আনন্দময় এবং স্মরণীয় করে তুলতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে বিয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভ্রমণ, ছবি তোলা, স্থানীয় সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা এবং পরিবার-বন্ধুদের নিয়ে ছোট্ট উদ্‌যাপন।

চীনের বেসামরিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সনদ প্রদান অনুষ্ঠানের জন্য দেশটিতে ১ হাজার ৩৩০টি উন্মুক্ত স্থান তৈরি করা হয়েছে। পার্ক ও বিভিন্ন দর্শনীয় এলাকায় গড়ে উঠেছে আরও ৫২৫টি বিয়ে নিবন্ধনকেন্দ্র।

প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরোনো শহর নানচিংয়ে ঐতিহ্যপছন্দ দম্পতিরা বিয়ে নিবন্ধনের সময় হান রাজবংশের আদলে পোশাক পরার সুযোগ পাচ্ছেন। কেউ পরছেন ফিনিক্সের নকশাযুক্ত মুকুট, কেউ বেছে নিচ্ছেন প্রাচীন চীনা বিয়ের সাজসজ্জা।

কোথাও সংগীত উৎসবের ভিড়ে হচ্ছে বিয়ের নিবন্ধন, আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে এনে যৌথ বিয়ের আয়োজন করছে। প্রেমের শুরু যে ক্যাম্পাসে, সেই জায়গায় বিয়ের সনদ নেওয়ার সুযোগ অনেক দম্পতির কাছেই বিশেষ আবেগের।

সুছৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চৌ ইয়োংপো বলেন, তরুণ চীনারা প্রেম ও বিয়ে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এখন অনেক বেশি স্বাধীন।

তার ভাষায়, “তারা শুধু একটি বিয়ের সনদ চান না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, অনুষ্ঠানটির আবহ এবং স্মরণীয় মুহূর্তও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।”

এদিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইয়ুননান প্রদেশের লিচিয়াং শহরে বিয়ের নিবন্ধন এখন অনেকের কাছে ভ্রমণ অভিজ্ঞতার অংশ। তুষারঢাকা ইয়ুলোং স্নো মাউন্টেনকে পেছনে রেখে সাদা গোলাপের হৃদয়াকৃতির তোরণের নিচে শপথ নিচ্ছেন দম্পতিরা।

পর্যটন ও ফুলচাষ—দুই ক্ষেত্রেই সুবিধাজনক অবস্থানের কারণে ইয়ুননান দ্রুত বিয়ের গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এখানে বিয়ের আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠান, পর্যটনকেন্দ্র, ফটোগ্রাফি স্টুডিও এবং হোটেলগুলো মিলিয়ে গড়ে উঠছে একটি নতুন ধরনের সেবাখাত, যাকে অনেকেই বলছেন ‘রোমান্স অর্থনীতি’।

লিচিয়াংয়ে বিয়ের ফটোগ্রাফির জন্য নানা ধরনের প্যাকেজ পাওয়া যায়। প্রায় ১০ হাজার ইউয়ান বা প্রায় ১ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলারের প্যাকেজে পোশাক, সাজসজ্জা, ব্যক্তিগত পরিবহন, আবাসন এবং ছবি তোলার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

ইয়ুননানের আরেক জনপ্রিয় শহর তালিতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ৩০-এর বেশি বিয়ের আয়োজনের স্থান গড়ে তুলেছে। এর মধ্যে রয়েছে হ্রদের ধারের সবুজ মাঠ, প্রাকৃতিক দৃশ্যঘেরা খোলা প্রান্তর এবং পাই জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী উঠান।

উত্তর চীনের হ্যফেই প্রদেশের বর ওয়াং ইয়ু ও তার স্ত্রী সকালে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। বিকালে তারা আরহাই হ্রদের কাছে বিয়ের ছবি তোলেন। এ সময় তাদের স্বজন ও বন্ধুরা ঘুরে দেখেন আশপাশের পর্যটনস্থল।

ওয়াং বলেন, “কোনো জটিল আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। বিয়ে ও ভ্রমণ একসঙ্গে করতে পেরেছি। অভিজ্ঞতাটি দারুণ ছিল।”

শুধু আকর্ষণীয় স্থানে বিয়ের সনদ দেওয়াই নয়, নবদম্পতিদের জন্য সেবাও সহজ করছে স্থানীয় সরকারগুলো। বেইজিংয়ের হাইতিয়ান জেলায় বিয়ে নিবন্ধন কার্যালয়ের ভেতরেই বিয়ের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষার কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এতে একই দিনে একই ভবনে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও বিয়ে নিবন্ধনের কাজ শেষ করতে পারছেন দম্পতিরা।

অনেক এলাকায় বিয়ের খরচ কমাতে দেওয়া হচ্ছে প্রণোদনা ও কেনাকাটার ভাউচার। কয়েকটি প্রাদেশিক অঞ্চলে বাড়ানো হয়েছে বিয়ের ছুটির মেয়াদও। কোনো কোনো স্থানে নবদম্পতিরা সর্বোচ্চ ৩০ দিনের ছুটি পাচ্ছেন।

এই উদ্যোগগুলোর সঙ্গে বিয়ে, সন্তান জন্মদান এবং শিশুপালনে সহায়ক পরিবেশ তৈরির নীতিও যুক্ত করছে চীন। ২০২৫ সালে সরকার সন্তান জন্মদান ও শিশুপালনে সহায়তার জন্য ২৩টি পদক্ষেপ নেয়। কয়েকটি অঞ্চলে সন্তান জন্মদান-সংক্রান্ত চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ বা পুরোটা বহনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। চিয়াংসু প্রদেশ চালু করেছে শিশুযত্ন সেবার ভাউচার।

চীনের তরুণদের কাছে তাই বিয়ের নিবন্ধন এখন কেবল আইনগত সম্পর্কের স্বীকৃতি নয়। এটি ফুটবলের গ্যালারি, পাহাড়ের পাদদেশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি কিংবা হ্রদের তীরে নিজের ভালোবাসার গল্পকে নতুনভাবে উদ্‌যাপনের এক উপলক্ষ।

সূত্র: সিএমজি

lifestyleবিয়ে