ইয়াং ওয়েইমিন স্বর্ণা
ইরান গত ১লা জুন জানিয়েছে, লেবাননে ইসরাইলের চলমান সামরিক অভিযানের জবাবে তারা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের আলোচনা স্থগিত করছে। ইরান ও ‘প্রতিরোধ অক্ষ‘ হরমুজ প্রণালী ‘সম্পূর্ণরূপে অবরোধ’ করার এবং ‘মান্দেব প্রণালীসহ অন্যান্য ফ্রন্টে অভিযান শুরু করার’ পরিকল্পনা করছে।
ইসরাইলকে লক্ষ্য করে ইরানের এই ‘কঠোর হুঁশিয়ারির’ পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিস্থিতি ‘শান্ত করার’ তত্পরতা শুরু করেন। তিনি ওই দিনই ইসরাইল ও লেবাননের উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে’ আনার কথা জানান এবং বলেন, ইরানের সঙ্গে মার্কিন আলোচনা ‘দ্রুত এগিয়ে চলেছে’।
ট্রাম্প কেন এত দ্রুত ‘পরিস্থিতি শান্ত করতে’ চাইছেন? ইসরাইল কি ‘পরামর্শ শুনবে’? এই ঘটনার পর ইরান-মার্কিন আলোচনার ভবিষ্যৎ কী?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন দ্রুত ‘পরিস্থিতি শান্ত করতে’ চাইছে?
ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত, প্রণালী সম্পূর্ণ অবরোধ এবং নতুন ফ্রন্ট খোলার হুঁশিয়ারি দেওয়ার পরপরই ট্রাম্প ‘পরিস্থিতি শান্ত করার’ ভঙ্গি নেন: প্রথমে তিনি আলোচনা বন্ধের সম্ভাবনাকে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দেন, পরে ইসরাইল-লেবাননের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
ট্রাম্প প্রথমে সাংবাদিকদের জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত করার কোনো খবর তিনি ইরানের কাছ থেকে পাননি এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের কথাও উড়িয়ে দেন। এরপর তিনি সামাজিক মাধ্যমে বলেন, তিনি ইসরাইল ও লেবাননের হিজবুল্লাহ উভয় পক্ষের সঙ্গেই কথা বলেছেন এবং ইসরাইলি বাহিনী বৈরুতে সেনা পাঠাবে না এবং হিজবুল্লাহও যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, ইরানের কঠোর অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। একদিকে, ইরান-মার্কিন আলোচনা একটি জটিল মুহূর্তে পৌঁছেছে। গুঞ্জন আছে, উভয় পক্ষ চুক্তির খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। এ সময় আলোচনা বন্ধ হয়ে গেলে পূর্ববর্তী অর্জনগুলো বিনষ্ট হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন, আগামী মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে ইরানের যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। ইরানের ‘আলোচনা স্থগিতের’ হুমকি তাদের এই দুর্বল জায়গায় সরাসরি আঘাত করেছে।
অন্যদিকে, হরমুজ ও মান্দেব প্রণালী—উভয় প্রণালীর নৌপথ বন্ধ হয়ে গেলে মার্কিন অর্থনীতি, জনজীবন ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইরানের এই বার্তার পর পরই আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যায়। চায়না ইনস্টিটিউট অফ কনটেম্পরারি ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্সের মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা কেন্দ্রের উপ-পরিচালক কিন তিয়ান বলেন, ইরান ও ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ যদি মান্দেব প্রণালীতে দ্বিতীয় ‘রণক্ষেত্র’ তৈরি করে, তাহলে বিশ্বব্যাপী নৌপরিবহন ও জ্বালানি সরবরাহ আরও চাপের মুখে পড়বে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ব্যাপক বোঝা তৈরি করবে। যেমন, ইরানের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত তেলের মজুদ থেকে কিছু অংশ ছেড়ে দিয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন জ্বালানি বিভাগের তথ্য বলছে, দেশটির কৌশলগত তেলের মজুদ দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
ইসরাইল কি ‘পরামর্শ শুনবে’?
যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন যে তিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বৈরুতে সেনা না পাঠাতে রাজি করিয়েছেন, কিন্তু অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, লেবাননে ইসরাইলের অভিযানের তীব্রতা ও মাত্রা নিয়ন্ত্রণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছুটা প্রভাব থাকলেও ইসরাইল তার নিজস্ব অপারেশনাল স্বায়ত্তশাসন হারাতে চায় না।
প্রথমত, ইরানের যুদ্ধ ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কৌশলগত লক্ষ্যের পার্থক্য রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে আলোচনা করে যুদ্ধ বন্ধ করতে, হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে এবং কৌশলগত ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে চায়। অন্যদিকে, ইসরাইল ইরানকে তার ‘অস্তিত্বের হুমকি’ হিসেবে দেখে এবং লেবাননের হিজবুল্লাহসহ ইরানের ‘প্রক্সি’ নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে চায়। তারা ইরানের সঙ্গে একটি ‘নমনীয় চুক্তি’র বিরোধিতা করে।
সাংহাই ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক চিয়ান শিউমিং মনে করেন, ইসরাইলের কাছে ইরান-মার্কিন যুদ্ধবিরতি মানে ইরানের জন্য বাড়তি সুযোগ। তাতে ইরানের ওপর তাদের ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী সামরিক হামলা ‘ব্যর্থ’ হয়ে যাবে। তাই ইসরাইল লেবাননের যুদ্ধের তীব্রতা বাড়িয়ে ইরান-মার্কিন আলোচনায় ভাঙন সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, নেতানিয়াহুর জন্য লেবাননের হিজবুল্লাহকে আঘাত করার ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খুব বেশি বাধ্য হওয়া তার নিজের এবং জোট সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী।
ট্রাম্প যখন দাবি করেন যে ইসরাইল লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে ‘যুদ্ধবিরতি’ করবে, তখনই নেতানিয়াহু দেশের ভেতরে ‘শাসক ও বিরোধী উভয় পক্ষের’ কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েন। ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির সামাজিক মাধ্যমে বলেন, ‘আমাদের বন্ধু ট্রাম্পকে “না” বলার সময় এসেছে।’ ইসরাইলের বিরোধী দলনেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট বলেন, নেতানিয়াহু সরকার ‘ইসরাইলের ওপর তাদের সার্বভৌমত্বের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।’
নেতানিয়াহু জানান, তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন, কিন্তু ইসরাইলের ‘অবস্থান অপরিবর্তিত’ থাকবে এবং তারা পরিকল্পনা অনুযায়ী দক্ষিণ লেবাননে অভিযান চালিয়ে যাবে। বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননে ইসরাইলি বাহিনীর অভিযান বজায় রাখা নেতানিয়াহুর জন্য কয়েকটি কারণে জরুরি: এক, এটি যুদ্ধপন্থী জোটের মিত্রদের সন্তুষ্ট রাখে এবং জোট সরকারের পতন ঠেকায়; দুই, যুদ্ধ চালিয়ে গেলে তিনি তার বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতির মামলার শুনানি পেছাতে পারেন; তিন, উত্তর সীমান্ত এলাকার ভোটারদের নিরাপত্তা উদ্বেগ মেটানো যায়, যা আগামী সংসদ নির্বাচনে তার জনসমর্থন বাড়াতে পারে।
তবে বিশ্লেষকরা আরও বলেন, মার্কিন সামরিক সহায়তার ওপর ইসরাইল ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তাই লেবাননের অভিযান নিয়ে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সম্পর্ক ছিন্ন’ করার পথে যাবে না। বরং তারা ‘সীমিত অমান্য করা এবং আঘাত করার পাশাপাশি সমন্বয় রেখে চলার’ কৌশল নিতে পারে।
আলোচনা টালমাটাল অবস্থাতেই এগোতে পারে।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ‘দ্রুত এগোচ্ছে’ এবং আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে একটি চুক্তি হতে পারে, যাতে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করা এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয় থাকবে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্য বাজার স্থিতিশীল করতে, তেলের দাম কমাতে এবং দেশের মানুষের মনোভাব শান্ত করতেই বেশি করা হয়েছে; এটি আলোচনার প্রকৃত অবস্থা প্রতিফলিত করে না।
ইসরাইলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্চার ড্যানি সিট্রিনোভিটস মনে করেন, ইরানের পরিস্থিতি এখনও অস্থিতিশীল। যতদিন পর্যন্ত একটি চুক্তি না হচ্ছে, ততদিন নানা পক্ষের উসকানি ইরান-মার্কিন আলোচনায় বাধা সৃষ্টি করতে থাকবে। সাম্প্রতিক ঘটনা প্রমাণ করে, ইরান এখানে অধিক ধৈর্যশীল। ইরানের নেতৃত্বের দৃষ্টিতে, তারা পরিস্থিতি আরও উত্তরণের ঝুঁকি নিতে রাজি থাকলেও তাতে চুক্তি করতে রাজি হবে না, যা তাদের মূল কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে।
গবেষক কিন তিয়ান বলেন, ইসরাইলকে কেন্দ্র করে এই ‘ঘটনা’ আবারও প্রমাণ করেছে যে ইরান-মার্কিন আলোচনা কতটা ভঙ্গুর। কিন্তু যেহেতু উভয় পক্ষেরই যুদ্ধ বন্ধ ও আলোচনার বাস্তব প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তাই আলোচনা টালমাটাল অবস্থাতেই এগোতে থাকবে। চিয়ান শিউমিং মনে করেন, ইসরাইলের চলমান উসকানি, ইরান-মার্কিন পারস্পরিক সন্দেহ এবং তাদের দাবির মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্বের কারণে স্বল্পমেয়াদে একটি পূর্ণ ও স্থায়ী চুক্তি হওয়া কঠিন হবে। বরং ‘একদিকে যুদ্ধ, অন্যদিকে আলোচনা; টানাপড়েন; এবং ধাপে ধাপে যুদ্ধবিরতি’র অবস্থা বজায় থাকতে পারে।
শিউমিং আরও বলেন, ইরান-মার্কিন চুক্তি হলেও ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে কাঠামোগত দ্বন্দ্ব দূর হবে না: ইরান সহজে তার পারমাণবিক প্রকল্প ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের নীতি ছাড়বে না; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইরানকে দুর্বল করার কৌশলগত লক্ষ্য ছাড়বে না; একই সঙ্গে ‘একবার পুড়ে যাওয়া’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে পুরোপুরি ইরানের বিরুদ্ধে খামখেয়ালিপনায় আচরণ করতে দেবে না। তাই ‘আলোচনা চলবে কিন্তু চুক্তি হবে না, সংঘাত চলবে কিন্তু তা পুরোপুরি বেড়ে যাবে না’—এ পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে কিছুকালের জন্য স্বাভাবিক হয়ে থাকতে পারে।
লেখক: সংবাদকর্মী, সিএমজি বাংলা, বেইজিং