দরজার ওপাশে প্রেম : একটি পরাবাস্তব প্রেমের গল্প

যামিনি রায়

বাইরে তখন ঝুমঝুম করে বৃষ্টি পড়ছে। জানালার কাঁচ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো। ঘরের মধ্যে টেবিলে রাখা বেড ল্যাম্পের মৃদু হলদে আলো চারদিকে এক স্নিগ্ধ মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে।

আরোহী সোফায় বসে একটা বই পড়ছিল, কিন্তু তার মন বইয়ে ছিল না। তার সমস্ত মনোযোগ ছিল ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা অদীপের ওপর। অদীপ তার ল্যাপটপে কাজের ব্যস্ততায় মগ্ন, কিন্তু আরোহীর ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস আর একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা তার নজর এড়ায়নি।

অদীপ ল্যাপটপটা একটু বন্ধ করে মৃদু হেসে এগিয়ে এল। সোফার হাতলে ঝুঁকে পড়ে কৌতূহলী কণ্ঠে সে বলল, “কী ব্যাপার, ম্যাডাম? বইয়ের পাতাগুলো কি আজ একটু বেশিই জটিল মনে হচ্ছে, নাকি অন্য কোথাও মন পড়ে আছে?”

আরোহী সামান্য কেঁপে উঠল। লজ্জিত হেসে সে বইটা পাশে রাখল এবং চোখ তুলে চাইল। দীপের চোখের ওই গভীর দৃষ্টি আর উষ্ণ চাহনি সবসময়ই তার হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়।

অদীপ আরোহীর ঠিক সামনে হাঁটু গেয়ে বসল। তার হাত দুটো আলতো করে নিজের হাতের তালুর মধ্যে তুলে নিল। আঙুলের ছোঁয়া পেতেই আরোহীর সারা শরীরে একটা মিষ্টি শিহরণ খেলে গেল। ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা যেন হঠাৎ করেই একটুখানি বেড়ে গেছে।

অদীপ ফিসফিস করে বলল, “বাইরের এই বৃষ্টির শব্দ আর এই নিস্তব্ধতা… সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে পৃথিবীটা শুধু আমাদের দুজনের জন্য থেমে গেছে।”

আরোহী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে আলতো করে ঝুঁকে দীপের কাঁধে মাথা রাখল। বাইরে বৃষ্টির শীতল বাতাসের বিপরীতে দীপের ছোঁয়া ছিল অগ্নিকুণ্ডের মতো উষ্ণ। তাদের দূরত্ব তখন আর মাত্র কয়েক ইঞ্চির।

অদীপের এক হাত আস্তে করে জড়িয়ে ধরল আরোহীর কোমর, আর অন্য হাতটি আলতো করে সরিয়ে দিল তার কপাল থেকে এক গোছা অবাধ্য চুল। ফিসফিস করে অদীপ বলল, “জান কি, এই বৃষ্টির চেয়েও তুমি আমার কাছে অনেক বেশি সুন্দর, অনেক বেশি মোহময়ী।”

আরোহী চোখ বন্ধ করে দীপের মুখের সুবাস আর তার বুকস্পন্দনের তাল অনুভব করতে লাগল। বাইরের বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে তখন কেবল তাদের দুজনের নিঃশ্বাসের আওয়াজই ঘরটাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। সময়ের খেয়াল আর কারো রইল না; সে এক অনন্ত রোমান্টিক মুহূর্ত, যা শুধু ভালোবাসার রঙে রাঙা।

বাইরে বৃষ্টির শব্দটা যেন হঠাৎ করেই আরও জোরালো হয়ে উঠল। ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ বেজে উঠল—তীব্র, হঠাৎ আর অপ্রত্যাশিত।

অদীপ আর আরোহী দুজনেই চমকে উঠল। এই গভীর রাতে বৃষ্টির মধ্যে কে আসতে পারে?

অদীপ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে দরজার দিকে তাকাল। আরোহীর বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। তার মনে একটা অজানা আশঙ্কার হিমেল হাওয়া বয়ে গেল। দরজা খুলতেই অদীপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে আরোহীর চোখের পলক যেন আটকে গেল।

সে রিহান! আরোহীর সাবেক প্রেমিক।

রিহানের পরনে ভেজা শার্ট, চুলে জলের ফোঁটা, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত জেদ আর দাবির দৃষ্টি। অদীপকে অবাক করে দিয়ে রিহান সোজা ঘরের ভেতরে পা রাখল এবং সরাসরি আরোহীর দিকে তাকাল।

রিহান ঠান্ডা কিন্তু ভারী গলায় বলল, “দরজাটা খুলতে একটু দেরি হলো, তাই না আরোহী? তুমি ভেবেছিলে আমি অত সহজে তোমায় ভুলে যাবো? অতীতের সব হিসেব কি এত সহজেই চুকে যায়?”

অদীপ এক মুহূর্তে পুরো পরিস্থিতি বুঝে নিল। তার চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে গেল। সে এগিয়ে এসে আরোহী আর রিহানের মাঝখানে একটা অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি করে দাঁড়াল। দীপের কন্ঠে শীতল দৃঢ়তা, “দরজা দিয়ে আসার একটা শালীনতা থাকে, মিস্টার রিহান। আর আপনি কার ঘরে, কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন, সেটা আশা করি ভুলে যাননি।”

রিহান একটা বাঁকা হাসি হাসল। অদীপের চোখে চোখ রেখে সে বলল, “শালীনতা শেখানোর আপনি কে? আরোহীর অতীতে আমি ছিলাম, আর আমাদের গল্পটা মাঝপথে থেমে গেলেও শেষ হয়ে যায়নি। ও এখনো আমার…”

“রিহান! বন্ধ করো এসব!” আরোহী এবার আর চুপ থাকতে পারল না। সে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “আমাদের অধ্যায় অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। আজ তুমি এখানে কেন এলে?”

রিহান এক পা এগিয়ে এসে আরোহীর হাত ধরতে গেল, ঠিক তখনই অদীপের হাত এসে রিহানের হাতটা মাঝপথেই আটকে দিল। ঘরের মধ্যে তখন চরম টান টান উত্তেজনা। ত্রিভুজ প্রেমের এই আকস্মিক ঝড়ে চারপাশের স্নিগ্ধ পরিবেশ মুহূর্তে একটা বারুদের স্তূপে পরিণত হলো।

অদীপ আরোহীর দিকে একবার ফিরে তাকাল, তার চোখে ভালোবাসার পাশাপাশি এখন এক তীব্র অধিকারবোধ। আর রিহানের চোখে জেদ। বাইরে অবিরাম বৃষ্টি পড়ছে, আর ঘরের ভেতরে শুরু হয়ে গেছে এক আবেগের অদৃশ্য যুদ্ধ—কে জিতবে শেষ পর্যন্ত? বর্তমানের গভীর ভালোবাসা, নাকি অতীতের না মেটানো অধিকার?

বাইরের বৃষ্টির তীব্রতা যেন সেদিন রাতের সমস্ত উত্তেজনাকে ছাপিয়ে যেতে চেয়েছিল। রিহানের কথায় অদীপের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। এক মুহূর্তও দেরি না করে অদীপ তার শক্ত হাতের এক প্রবল ঘুসি বসল রিহানের চোয়ালে।

রিহান ধাক্কা সামলাতে না পেরে পাশের সোফার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। ঘরের মধ্যে তখন চরম বিশৃঙ্খলা। কিন্তু অদীপের রাগ তখনও থামেনি; সে রিহানকে চেপে ধরে একের পর এক আঘাত করতে লাগল। রিহান আত্মরক্ষার চেষ্টা করলেও অদীপের ক্ষোভের সামনে টিকতে পারল না। তার নাক-মুখ ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল।

“বন্ধ করো এটা! প্লিজ থামো, অদীপ!” আরোহী আর্তনাদ করে উঠল। সে ছুটে এসে কোনোমতে অদীপের হাত টেনে ধরে তাকে থামাল।

কিন্তু ততক্ষণে সব কিছু পাল্টে গেছে। রিহানের রক্তাক্ত ও বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে আরোহীর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এতদিন সে রিহানের ওপর রাগ পুষে রেখেছিল, কিন্তু এই চরম বিপদের মুহূর্তে সে বুঝতে পারল, অতীতের সেই গভীর ভালোবাসা বা দুর্বলতা তার মন থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি। অদীপের এই চরম হিংস্র রূপ আর অধিকার ফলানোর জেদটা আরোহীর কাছে ভালোবাসার চেয়ে এক ভয়ের খাঁচা বলে মনে হলো। সে অদীপের দিকে ঘৃনা আর আশ্চর্যের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। অদীপ তখন বুঝতে পারল, সে রিহানকে মারলেও আরোহীর মনটাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে।

অদীপ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল, আর দরজাটা সজোরে বন্ধ হয়ে গেল।

ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে রিহান। আরোহী আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে দ্রুত ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে এল। নিজের হাতে পরম যত্নে রিহানের মুখের রক্ত মুছে দিল, কাটা জায়গায় ওষুধ লাগিয়ে দিল। রিহানের ব্যথাতুর চোখের দিকে তাকিয়ে আরোহীর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সেই সেবার মধ্য দিয়েই তাদের পুরোনো প্রেম যেন ছাই থেকে নতুন করে জেগে উঠল। অদীপের প্রতি সমস্ত আকর্ষণ হারিয়ে আরোহী পুরোপুরি সমর্পণ করল রিহানকে। এর কিছুদিন পরেই তারা গোপনে একে অপরকে বিয়ে করে নিল।

এরপর কেটে গেল বেশ কিছুদিন।

আজ আবার ঠিক তেমনি একটা থমথমে ঝড়ের রাত। বাইরে প্রলয়ঙ্করী ঝড় বইছে, আর জানালার কাঁচ কাঁপিয়ে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ছে। আরোহী আর রিহান এখন এক ছাদের নিচে, বিবাহিত জীবন কাটাচ্ছে। কিন্তু দুজনের মনের মধ্যে কোথায় যেন একটা অদৃশ্য আশঙ্কা কাজ করছিল।

ঠিক তখনই—দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ বেজে উঠল।

তীব্র, ভারী আর অত্যন্ত পরিচিত সেই কড়া নাড়ার আওয়াজ। রিহান আর আরোহী দুজনেই চমকে একে অপরের দিকে তাকাল। এই গভীর রাতে বৃষ্টির মধ্যে দরজার ওইপাশে কে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে?

storiesগল্পপ্রেমের গল্প