এমন আশ্চর্য রাত : উপন্যাস : ধ্রুব নীল (পর্ব ১)

ধ্রুব নীলের ধারাবাহিক উপন্যাস এমন আশ্চর্য রাত ।

পর্ব-১
একতলা আধপাকা বাড়িটার পেছনে মজা খাল। খালে প্যাচপ্যাচে কাদামাটি। একে মজা খাল বলতে হবে কেন? ইন্টারনেটে উত্তর খুঁজতে ইচ্ছে হলো না জহির উদ্দিনের।
পৌষের আরও দুদিন। খালে পানি নেই। জংলায় ঢাকা ভাঙাচোরা ঘাট।
শুক্লাদ্বাদশীর চাঁদ। কুয়াশা ভেদ করে আসা আলোয় ঘাট-জঙ্গল চোখে পড়ে না। আলো-আঁধারিতে ব্রোঞ্জের মূর্তির মতো জলচৌকিতে বসে আছেন জহির।
গোসলের সময় মানুষ জলচৌকিতে বসে। জহিরও গোসল করছেন। জোছনা কুয়াশায় মাখামাখি অবস্থা।
জহির চাঁদ দেখতে আসেননি। পঞ্চান্ন বছর আগে মানুষ চাঁদে গিয়ে চাঁদ দেখে এসেছে। সেখানে গলফও খেলেছে। তারচেয়ে আলতাকান্দিতে বসে ঢাকার জিগাতলা দেখতে পেলে খুশি হতেন।
জিগাতলায় একমাত্র মেয়ে লিপির বাসা। বিয়ে হয়েছে বছর পাঁচেক। একটা চার বছরের ছেলেও আছে।
এখন ভিডিও কলের যুগ। লিপি সেটা দেয় না। নাতির চেয়েও জহির উদ্দিনের বেশি ইচ্ছা হয় মেয়েকে দেখার। একমাত্র মেয়ে। স্মৃতির জাবর কাটেন। ভিডিও কলের ইচ্ছেটা বলতে পারেন না। মেয়ের ওপর রাগও করতে পারেন না।
লিপি চাকরি করে। স্বামী থাকে ব্যবসা নিয়ে। বাচ্চা দেখার কেউ নাই। হিমশিম খাচ্ছে মেয়েটা। জহির উদ্দিনের একাকীত্ব তাকে স্পর্শ করার সময় কই।
জহির একা নন। বছরখানেক হলো সিন্দাবাদের ভূতের মতো জুড়ে বসেছে হারু। আলতাকান্দির ভেওয়াপাড়া গ্রামে আড়াই রুমের আধাখেঁচড়া বাড়িটায় তাদের দিনকাল ভালোই কাটছে।
শুধু সালেহা বেগম মারা যাওয়ার পর বাড়ির কাজকর্মগুলো নেই হয়ে গেছে। ভেওয়ামারা বাজারের মুদিদোকান নিয়েই জহিরের সংসার। দোকান সামলায় নুরুল আলম। উঠতি বয়স। থাকে নিজের মতো। জহিরের জীবনের সঙ্গে তার হয় নাকো দেখা।
‘চাচাজি শীত করে না? জম্মের কুয়াশা। হাত বাড়াইয়া ধরেন, দেখবেন না। ডর করে। হাত বাড়াইলাম, হাত নাই। হাত থাইকাও নাই।’
জহিরের চট করে মনে হলো, ব্যাপারটা চাঁদের মতো। মানুষ আছে বলেই তো চাঁদ আছে। কোন বিজ্ঞানী যেন বলেছিল? ছোটখাট ব্যাপার মনে থাকছে না। আইনস্টাইন বলেছেন, যে জিনিস বইখাতায় লেখা আছে সেটা মাথায় লিখে রাখার দরকার নাই।
সালেহা বেগম মারা যাওয়ার পর অদ্ভুত অভ্যাস চেপে বসে জহিরের। বিজ্ঞানচর্চা শুরু করেন। চর্চা বলতে বইটই পড়েন আর ফোনে ভিডিও দেখেন। ট্রাংকভর্তি বই। বেশিরভাগ বিদেশি। অনলাইনে অর্ডার করে কমদামে লোকাল প্রিন্ট আনিয়েছেন।
ইউটিউবে যে ভিডিও দেখেন সবই হাবিজাবি। কাজের কাজ কিছু হয়নি। লাইনমতো এগোলে থিউরিটিক্যাল ফিজিক্সে ডক্টরেট হয়ে যেত এতদিনে।
‘ঠিক। সব কিছু এই আছে এই নাই।’
‘বিরাট মারফতি কথা।’
‘মারফতি না। ঘটনা সত্য। মনে কর এই যে ইটের টুকরা। এইটারে ছোট করতে করতে কী পাইবি বল দেখি?’
‘ইটের গুঁড়া ওস্তাদ।’
‘আমাকে চাচাজি বল। ওস্তাদ বলবি না। আমি চোরের সর্দার না, বাস-ট্রাকও চালাই না।’
‘জে আইচ্ছা। আমরা চুরি করা শুরু করলে তখন ওস্তাদ কমু। চুরি করবেন?’
‘এই ইটের টুকরারে ছোট করতে করতে একসময় দেখবি ইটের গুঁড়া যা, আমি তুই ও তা। চাঁদের আলো অবশ্য পুরাপুরি তা না। চাঁদের আলো হইল ফোটন। ফোটনের ওজন নাই। কিন্তু ধর, এই টুকরা করতে করতে এক সময় দেখা যাইব একদলা ঝলক বাতি ছাড়া আর কিছু নাই।’
‘তাইজ্জবের কতা!’
‘ওই ঝলক বাত্তির ওজন আছে আবার নাই। জিনিসরে কে যে জিনিস বানাইল সেই জিনিসের পাত্তা নাই।’
‘জিনিসরে আবার জিনিস বানাইতে হইব কেন। জিনিস তো জিনিস।’
‘ঝলক বাতির ভিতরে যে কী আছে। সেইটা আবার আসে আর যায়। এই আছে এই নাই। আমরা এই আছে আর নাইয়ের জগতে আটকা পইড়া আছিরে হারু। শুধু সালেহা বেগম নাই। সে ছিল, এখন নাই। নাকি আছে?’
‘ওস্তাদ বিড়ি খাইবেন? একটা বেনসন আছে। কাতলা মারসিলাম একটা। ভাবছিলাম আপনারে ভাইজা দিব। মতিনের চ্যালা রাসু মাঝির চোখে পইড়া গেল। পাঁচশ দিয়া কিনা নিল। আজব দুনিয়া, মাঝি নিজেই মাছ কিনে। সে এত ট্যাকা পায় কেমনে।’
‘দে সিগারেট দে।’
‘আফনে ঝলক বাতির গল্প বলেন। একটু শিক্ষিত হই।’
‘ওইটা হলো কোয়ার্ক। সায়েন্টিস্টরা নাম রাখসে। নামে কিছু আসে যায় না। আমি কইলাম ঝলক বাতি। ওইটার চক্করে আটকা পইড়া আছি। ধরতে পারতেসি না। এর মধ্যিখানে আবার অনেক পাওয়ার। এটম বোমা আছে না? ওই এটম বোমার পাওয়ার। ঝলক বাতির কানেকশন ছুইটা গেলেই গুড়ুম!’
‘আফনের চেয়ে জ্ঞানী আর নাই। জ্ঞানী মানুষ ভাতে মরে। আফনে ভাতে মরবেন না। কারণ আফনের মুদি দোকান আছে। আফনে মরবেন…। দুর কী কইতাসি।’
‘খিচুড়ি বসা। ক্ষেতের আইলে যা। আইলভর্তি থানকুনি পাতা। মরিচ পোড়া দিয়া চাসনি বানাবি।’

হারু কোথা থেকে এসেছে, পরিবারে কে আছে, জানা নেই জহিরের। ডায়াবেটিসের কারণে সব ভুলে যাচ্ছেন। সম্ভবত টুকটাক কাজের বিনিময়ে থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করতে এসেছে। সেই টুকটাক কাজের দিকবিদিক নাই।
হারুকে দেখে বয়স বোঝা যায় না। কারও জানার আগ্রহও নেই যে পঁয়ত্রিশ নাকি চল্লিশ। আছে মহাফূর্তিতে। আধ মাইল দূরে হুরাসাগর নদী। কাজ না থাকলে মাছ ধরে। মাঝে মাঝে নৌকা ভাড়া নিয়ে যাত্রী পারাপারের খেপ দেয়। মন চাইলে রান্না করে। রান্না বলতে ল্যাটকা খিচুড়ি।
হারু থাকায় একটাই লাভ হয়েছে। কথা বলার লোক পেয়েছেন জহির। গ্যালাক্সি আর দৃশ্যমান মহাকাশ ছাড়িয়েও যে আরও মহাবিশ্ব থাকতে পারে সেসব নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলাপ চালানো যাচ্ছে। মেগাভার্স, গিগাভার্স, চতুর্মাত্রিক জগত থেকে মানুষকে দেখতে কেমন লাগবে এসব হাবিজাবি।
হারু গেল থানকুনি পাতার খোঁজে। জহির উদ্দিন কয়েকবার হাত বাড়িয়ে দেখলেন। কুয়াশা ঘন হলে শীত কম হওয়ার কথা। মনে হচ্ছে না। ভেজা চাদর গায়ে কেঁপে কেঁপে উঠছেন।
কুয়াশায় দিক হারিয়ে হাঁটা দিলে কেমন হয়? এ যুগে কেউ দিকহারা হয় না। খাল পার হলেই আজিম চৌধুরীর বাড়িতে ঠোক্কর খেতে হবে। এরপর কাদা আর একটা সবজি ক্ষেত মাড়িয়ে সোজা রাস্তা ধরে এগোলে স্কুল। তারপর ঘাস শুকিয়ে আসা মাঠ। যাওয়ার সময় দুয়েকটা আগুন পোহানোর দৃশ্য চোখে পড়তে পারে।
গ্রামগুলোয় আগের মতো রহস্য নেই। অচেনা জায়গা নেই। সব পরিচিত। সব জায়গার নাম হয়ে গেছে। যেখানেই তাকান, অমুকের জমি না হয় তমুকের লিজ নেওয়া নদীনালা। নদী-খালেরও ভাগ-বাটোয়ারা করে ফেলেছে এলাকার নেতা-পুতিরা।
জহির উঠে দাঁড়ালেন। চাদর পেঁচালেন টাইট করে। উঠোন পেরিয়ে দক্ষিণের রাস্তা ধরে চললেন হুরাসাগরের দিকে। আত্মহত্যার কাজটা আজ রাতেই সেরে ফেলা যাক। এটা বিয়েবাড়ির কেনাকাটা না যে বিরাট আয়োজন করে করতে হবে।

পরিকল্পনা সাধাসিধা। নৌকা ভাড়া করবেন। মাঝিকে বিশ টাকা বাড়তি দিয়ে বলবেন ইঞ্জিন বন্ধ রাখতে। ভটভট শব্দে মাথা ধরে যায়।
মাঝি নৌকার এক মাথায়, তিনি আরেক মাথায়। নৌকা মাঝনদীতে এলে মাঝিকে বলবেন ঘুম দিতে। এরপর টুপ করে নেমে যাবেন পানিতে। সশব্দে ঝাঁপ দেওয়া চলবে না। মাঝি টের পেলে কেলেঙ্কারি। আত্মহত্যা করতে গিয়ে বেঁচে গেলে গ্রামের লোকজন বাক্যবাণেই মেরে ফেলবে।
ঘাটে কুয়াশা আরেক ডিগ্রি বেশি। মাঝারি সাইজের একটা নৌকা আছে। মাঝি কাঁথামুড়ি দিয়ে শোয়া। গাঁজার গন্ধ আসছে। যে শীত পড়েছে তাতে কাঁথায় কাজ হওয়ার কথা নয়। গাঁজা খেলে শীত কম লাগে?
‘কী চান?’
‘মাঝনদীতে যাবে?’
‘মাইজ নদীত যাইয়া কী করবেন? লগে মাইয়া মানুষ আছে?’
‘না। মেয়ে মানুষ নাই। মাঝনদীতে যাব। তোমার ভাড়া তো একশ। পকেটে দুইশ আছে। পুরাটাই পাবা।’
‘শইলে টান দিসে। আইজ পারুম না। মরতে চাইলে কালকা আসেন।’
জহিরের মনে হলো জগতে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মতো আরও কিছু রহস্য আছে। গঞ্জিকা সেবনের কারণে মাঝির মগজে কিছু অলিগলি ফটাফট খুলে গেল? নিউরনগুলো দারুণ উত্তেজনায় ফায়ারিং শুরু করেছে? গভীর রাতে চাদর পেঁচানো মধ্যবয়সী এক লোক উদাস ভঙ্গিতে (মেয়েসঙ্গী ছাড়া) মাঝনদীতে যাবে বলায় মাঝির মগজ আসল কাহিনি ধরে ফেলল?
‘শরীরের টান জিনিসটা কী?’
‘নদীতে জোয়ার-ভাটা হয় না? ওই রকম। শইলে এখন ভাটা। বিদায় হন।’
‘বিদায় হবো কেন? নদীর পাড় তো তোমার বাড়িঘর না।’
‘তাইলে খাড়াইয়া মোতা দেন।’
জহির চিন্তায় পড়ে গেলেন। বিরক্ত অবস্থায় আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে না। আত্মহত্যা করার আগে মানুষ চরম বিষণ্ন থাকে? নাকি বিষণ্নতা কেটে যাবে ভেবে কিছুটা আনন্দে থাকে? কেউ একরাশ বিরক্তি নিয়ে একদলা থুথু ফেলে সুইসাইড করবে?
আত্মহত্যা করতে গিয়ে বেঁচে ফিরে আসা কয়েকজনের সাক্ষাৎকার পড়তে পারলে জানা যেত। ফোনের ব্রাউজারে টাইপ করা যাক। কী লিখবেন? ইনসাইড আ সুইসাইডাল মাইন্ড?
মোবাইলে ডেটা না থাকায় বিষয়টা জানতে পারলেন না জহির। মনে অপূর্ণতা খচখচ করছে। থাক, আত্মহত্যা আরেকদিন করা যাবে। ছোট বাথরুম চেপে রেখে মরার কথা ভাবাও যাচ্ছে না।
মাঝির কথা শুনে জহিরের মনে হলো তার ভালোই বেগ পেয়েছে। মগজটাও বার্তা দিয়ে যাচ্ছে, বিরক্তি কমাতে হলে ঘন কুয়াশার রাতে থানকুনি ভর্তা দিয়ে গরম খিচুড়িও খাওয়া চাই। বাড়ি চলো বাড়ি চলো বাড়ি চলোরে।

‘নানা আইছে। নানা ভাত খাও। মা ভাত দাও। নানার ভাত দাও।’
জহির উদ্দিনের ধারণা ভুল প্রমাণ হলো। মেয়েকে ভালোবাসেন ঠিকই। তবে সোয়েটার কানটুপি পরে চেয়ারে বসে থাকা চার বছরের নাতি ইরফানের প্রতি মমতার পাহাড় আছড়ে পড়েছে। অনভ্যাসের কারণে ছুটে গিয়ে কোলে নিতে পারলেন না। হাসতে গিয়ে দেখলেন চোখে পানি চলে আসছে।
‘বাবা, খিচুড়িটা গরম গরম খাও। হারুন ভাই অমৃত রান্না করেছে। পোড়া মরিচ দিয়া থানকুনির ভর্তা। আমি জলপাই-রসুনের আচারও এনেছি।’
‘হারু আবার হারুন হইল কবে! হারুন! তুমি এরফান আলিরে একটা ডিম ভাইজা দাও।’
হারু ‘জি ওস্তাদ’ বলে ছুট লাগাল। তার উত্তেজনা দেখে মনে হচ্ছে বাড়িতে ডিম না থাকলে মুরগির পেটে চাপ দিয়ে বের করে আনবে।

(চলবে)

ধ্রুব নীলের সব বই

উপন্যাসএমন আশ্চর্য রাতগল্পধ্রুব নীল