ধ্রুব নীলের ধারাবাহিক সামাজিক থ্রিলার উপন্যাস এমন আশ্চর্য রাত
প্রথম পর্ব পড়ুন এই লিংকে
পর্ব-২
শেষ রাতে দুঃস্বপ্ন দেখছেন জহির। নদীর তীরে বেড়াতে গেছেন ইরফান আর লিপিকে নিয়ে।
ঘাট বরাবর হাঁটছেন। পায়ের কাছে বিচিত্র সব মাছ খাবি খাচ্ছে। কোনো মাছের আবার পা আছে। তারা দৌড়াচ্ছে ডাঙ্গার দিকে।
ইরফান মাছ দেখে ছোটাছুটি করছে। লিপি ছুটছে পেছন পেছন। ষণ্ডামার্কা এক লোক এসে দাঁড়াল। হাতে এক গাছি দড়ি। জহির উদ্দিনকে বেশ সমীহ করে বলল, চাচাজি চলেন। সময় হইসে।
‘কই যাব! তোমার হাতে দড়ি কেন!’
‘আপনার ফাঁস লওনের কথা আইজকা।’
‘না! আজকে না তো! আমার নাতি আসছে, মেয়ে আসছে।’
‘আমি নৌকা নিয়া আসছি। নৌকা সাজানো হইসে। ওই যে দেখেন।’
ফুলের মালায় সাজানো নৌকা। ঝালরবাতিও আছে। ওদিকে আকাশভর্তি মেঘ। শীতল বাতাসে কুঁকড়ে যাচ্ছেন জহির।
‘সালেহা! সালেহা! এই লোক কে!’
‘আফনে চলেন চাচাজি। দেরি করা ঠিক না। মাইঝনদীতে গিয়া ফাঁস লইবেন। চলেন। জোর কইরা লইয়া যামু?’
স্বপ্নে লোকটার সঙ্গে যথারীতি পেরে উঠছেন না জহির। এ অবস্থায় ঘুম ভাঙার কথা। ভাঙলো না।
নৌকায় উঠতেই কয়েক সেকেন্ডে চলে গেলেন মাঝনদীতে। দূরে ইরফান আর লিপি। তাকে দেখছে না। তারা ব্যস্ত মাছ ধরাধরিতে।
জহির আচমকা পড়ে গেলেন নদীতে। বরফের মতো শীতল পানি সাঁড়াশির মতো আঁকড়ে ধরেছে তাকে।
ঘুম ভাঙতেই দেখলেন গা থেকে কাঁথা টেনে সরিয়ে ফেলেছে ইরফান। স্বপ্নে প্রচণ্ড শীত লাগার এটাই কারণ।
‘নানা পিঠা খাও।’
বাড়ির পেছনে বেড়া দিয়ে বানানো রান্নাঘরে মাটির চুলায় পিঠা হচ্ছে। ব্যাকআপ হিসেবে একটা গ্যাসের সিলিন্ডার রাখা আছে। তবে লিপি মাটির চুলাতেই পিঠা বানাবে। শহরের বাসিন্দাদের মাটির চুলা বাবদ আদিখ্যেতা থাকে। জহিরের এসব ভালো লাগে না। তবে মেয়ের হিসাব আলাদা। মেয়ে যদি এখন বলে মরিচ পোড়া দিয়ে শাপলার ডাঁটার ঝোল খাবে, তিনি সেটাও আনবেন।
লিপির পাশে হারু ফুঁ দিয়ে পিঠা খাচ্ছে আর গুটুর গাটুর করছে। ইরফান চড়ে আছে হারুর কাঁধে।
‘চাচাজি, দেহেন গাছ থেইকা টুপ কইরা একটা বান্দর আমার পিডে বসছে। বান্দর আবার পিডা খায়।’
জহির উদ্দিন ভাবলেন কিছু প্রশ্ন এখন না করলে ক্ষতি নেই। শীতের এই হিম ভোরে মেয়ে পিঠা বানাচ্ছে, শহরের নাতিটা খালি পায়ে মাটিতে ঘুর ঘুর করছে। যার কাঁধে খুশি উঠে বসছে; এমন দৃশ্য দেখতে দেখতে শাপলার ডাঁটার তরকারি দিয়ে গরম গরম রুটি খাওয়া যায়। তারপরও মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল।
‘কামাল আসে নাই?’
‘আমি পুরাপুরি চলে আসছি বাবা। আর যাব না। কামাল জামাল গোনার টাইম নাই।’
‘ওহ আচ্ছা। দে একটা পিঠা দে। গুড় কম নারিকেল বেশি। চালের গুঁড়া কই পাইলি?’
‘নিয়ে এসেছি। হারুন ভাই নাকি খালের পাড়ে নারিকেল পাইছে। ঢাকায় এই নারিকেলের দাম কমসে কম একশ বিশ টাকা।’
হারুর টুকটাক মিথ্যা কথায় কান দেন না জহির। লিপি পিঠা বানাবে শুনে সে লেবু মিয়ার নারিকেল পেড়ে এনেছে। টের পেলে গ্রাম মাথায় তুলবে। হারুকেও তুলতে পারে। পেটা শরীরের লেবু মিয়ার স্মৃতিশক্তি সিজনিং করা বাঁশের মতো টনটনা। প্রতিটা নারিকেল গুনে রাখে।
জহির উদ্দিন আজ দোকানে গেলেন না। দুপুর না হতেই সাইকেল চালিয়ে নুরুল আলম হাজির। মাসকাবারি তিন হাজার বেতন আর দুই বেলা খাবার। এই তার জীবন।
‘বাড়িত যামু। দুই দিন ছুটি দেন।’
জহির জানেন দুদিন মানে এক সপ্তাহ। এক সপ্তাহ নাতিকে নিয়ে গ্রামের এটা ওটা দেখাবেন ঠিক করেছিলেন। নুরুল আলম ছুটিতে গেলে সেটা হবে না।
‘তোর চাকরি নট। আমি আরেকজন দেখবো। তুই যা। ছুটি কাটা।’
নুরুল আলম পাত্তা দিল না। সে জানে এই বাজারে তার মতো কাজের লোক পাওয়া কঠিন।
‘আইজকা ভাত দিবেন না? নাকি চাকরি এখনই নট।’
লিপি চলে আসায় কড়া কিছু বলতে পারলেন না জহির। তিনি কড়া কথা বলতেও পারেন না।
‘তোমার নাম নুরুল? বয়স কত?’
‘উনিশ বিশ হইব। আপনে চাচার মাইয়া? ঢাকা থেইকা আসছেন?’
নুরুলের বয়স টেনেটুনে ষোলো। নাকের নিচে পাতলা গোঁফের রেখা। লিপির দিক থেকে তার চোখ সরছে না। ঢাকায় ভালো চাকরি করলে চেহারায় একটা পরিবর্তন আসে। সহসা গ্রামের মেয়ে বলে চালানো যায় না।
‘ছুটি নেবে কেন? বিয়া করবা? পাত্রী ফাইনাল? ছুটি না নিলে তোমারে নিয়ে একটু গ্রাম দেখতে বের হবো। তুমি আমাকে সাইকেল শেখাতে পারবা?’
নুরুল আলম বাড়ি যাবে, কারণ তার খালাতো বোনের বান্ধবী ঝুমু তাকে যেতে বলেছে। কিছুদিন প্রেম টেম করে আবার ফিরবে আলতাকান্দি। লিপির প্রস্তাব শুনে মনে মনে দুবার বলল, ঝুমু তোর খেতা পুড়ি। ওদিকে রান্নাঘরে চুলায় লাকড়ি ঠেলতে ঠেলতে হারু ভাবল, তার জীবনের বত্রিশ আনা বৃথা। সে সাইকেল চালাতে পারে না।
তিন চারদিন যেতেই বাড়ির চেহারা বদলে গেল। সবার আগে বাড়ির পাশে বানানো হলো নতুন টয়লেট। তাতে দামি দেখে হাইকমোডও বসলো। বাড়ির টুকটাক কাজ করাতে গিয়েই জহির টের পেলেন ব্যাংকে এতদিনে ভালোই টাকা জমেছে তার।
ঘরের ভেতর আলাদা একটা সুঘ্রাণও পাওয়া যায়। সেটা হারুর কুড়িয়ে আনা ফুল কিংবা ইরফানের বেবি পাউডারের কারণেও হতে পারে।
নুরুল আলম বারোটার মধ্যেই দুপুরের খাবার খেতে আসে। যেতে যেতে বাজে তিনটা। লিপির জন্য চকচকে প্যাকেটের আচার নিয়ে আসে। জহিরের দোকানের আচার। ইরফানের সঙ্গে খাতিরও জমছে। ইরফান তাকে ডাকে নুরা বাই। নুরুল আলম কিছুতেই তাকে মামা বা কাকা ডাকাতে পারছে না।
জহির হারুকে দোকানে পাঠান না। সে নাকি ওজনের হিসাব বোঝে না। সে অবশ্য নদী থেকে মাছটাছ ভালোই ধরছে।
লিপি মহা উৎসাহে নার্সারি থেকে এটা সেটার চারা এনে লাগানো শুরু করেছে। জহির উদ্দিন এখন আর ফোনে ওয়েভ ফাংশন বোঝার চেষ্টা করছেন না। আজও ইরফানকে সঙ্গে নিয়ে নদীর ধারে বেড়াতে গেছেন।
মারাত্মক শীত পড়লেও ইরফানের কুচ পরোয়া নেহি। কানটুপি থাকলে আর চিন্তা নাই।
‘চাচাজি আছেন কেমন?’
স্ট্যাচু হয়ে গেলেন জহির উদ্দিন। স্বপ্নে দেখা সেই ষণ্ডামার্কা লোকটা। হাতে দড়ি নেই।
‘আমি রাসু মাঝি। ওইদিন মাইঝ নদীতে যাইতে চাইসিলেন। আইজকা যাইবেন? একশ দিলেই হবে। লগে কিডা? নাতি?’
‘হুঁ। না যাব না। আর যাব না।’
‘আর যাইবেন না কেন? ওই দিন ধরা টরা খাইছিলেন নাকি? হে হে।’
জহির বুঝতে পারছেন ওই রাতে গাঁজার নেশায় ছিল লোকটা। ধরেই নিয়েছে জহির কোনো এক নারীসঙ্গী নিয়ে নৌকা ভাড়া নিতে এসেছিল।
জহিরের উচিত গটগট করে চলে যাওয়া। তিনি নড়লেন না। লোকটাই চলে গেল। তার নৌকায় ছই লাগানো হয়েছে। সেটা আবার ফুল দিয়ে সাজানো। ভেতরে এক নবদম্পতিকে দেখে হাঁফ ছাড়লেন জহির। ইরফানকে কোলে তুলে হাঁটা দিলেন বাড়ির দিকে।
‘বাবা শোনো। তুমি মুখে বলতে পারছো না। কিন্তু প্রশ্ন জমতে জমতে ব্লাড প্রেশার যাবে বেড়ে। তার চাইতে আমি সব ক্লিয়ার করি।’
জহির উদ্দিন মুখটাকে বেকুবের মতো করে বসে রইলেন খাটে। লিপি কী বলবে বুঝতে পেরেছেন। আঁচ করতে না পারার ভান করছেন।
‘কামালের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়েছে ছমাস। কাগজপত্র বাকি। জিগাতলার একটা রুম ভাড়া করেছিলাম। জমানো টাকা ছিল। চাকরি করেছি কিছুদিন। এখন চলে গেছে। বলতে পারো পালিয়ে এসেছি। এক মাসের বাসা ভাড়া বাকি। আমি বেকার বসে আছি শুনলে ইরফানকে নিয়ে যাবে তার বাবা। অবশ্য বয়স ছয় বছর হওয়ার আগে লিগ্যাল অ্যাকশনে যেতে পারবে না।’
‘ছয় বছর পর কী করবে? বাচ্চা নিয়ে যাবে?’
‘নিয়ে গেলে যাবে। টাকা-পয়সায় তার সঙ্গে পারব না। তার বিরাট লাইনঘাট। অবশ্য ঝামেলা করবে না। আমি হুমকি দিয়েছি ঝামেলা করলে সুইসাইড করবো আর সুইসাইড নোটে তাকে দায়ী করে যাব।’
‘তুই সুইসাইড করবি কেন! করলে ও করুক ।’
বিরক্ত হলো লিপি। কামাল কেন সুইসাইড করবে! তার কীসের দুঃখ! সে হলো ভীতুর ডিম। মডেল বান্ধবীদের নিয়ে মহাসুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
মহাকাশ, দূরের গ্যালাক্সি আর ব্ল্যাকহোলে সময় স্থির হয়ে যাওয়া সংক্রান্ত একগাদা আর্টিকেল পড়ে জহিরের কাছে একটা সময় দুনিয়ার সাংসারিক সমস্যাগুলোকে তুচ্ছ মনে হতো। এখন হচ্ছে না। ভালোই টেনশনে পড়েছেন। বারবার মনে হচ্ছে ওই রাতে নদীতে ঝাঁপ দিলে বিরাট ক্যাচাল বেঁধে যেত। বাচ্চাসহ লিপি এসে পড়ত মহা বিপদে। দিশেহারা হয়ে ছুটে যেত ঢাকায়। সেখানে আবার এক মাসের ভাড়া বাকি। ঢাকায় নেই আত্মীয়স্বজন।
‘চিন্তা নাই। আমার দোকান আছে। দরকার হইলে বাপবেটি মিলে দোকানদারি করবো।’
‘না বাবা। দোকানদারি করবো না। এখানে একটা কোচিং সেন্টার খুলবো না হয় প্রাইভেট পড়াব। একটা নার্সারিও দিব। আজকাল গ্রাম থেকে অনলাইনে এসব ব্যবসা চলে ভালো।’
‘নার্সারি দিবি কই? জমি টমি তো নাই। খালের পাড়ে যেটুকু জায়গা জংলায় ভরা।’
‘হারুন ভাই সব ঠিক করে দেবে। সব পরিষ্কার করা হবে। তুমি শুধু শুধু চিন্তায় মরে যাচ্ছো। হারুন ভাই চিন্তামুক্ত মানুষ। নুরুল আলমকে রাতে এ বাসায় রাখার ব্যবস্থা করো। একা একা দোকানে থাকে, খারাপ লাগে। সেও কাজে আসবে।
হারু কোথা থেকে এসেছে, পরিবারে কে আছে, জানা নেই জহিরের। ডায়াবেটিসের কারণে সব ভুলে যাচ্ছেন। সম্ভবত টুকটাক কাজের বিনিময়ে থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করতে এসেছে। সেই টুকটাক কাজের দিকবিদিক নাই।
হারুকে দেখে বয়স বোঝা যায় না। কারও জানার আগ্রহও নেই যে পঁয়ত্রিশ নাকি চল্লিশ। আছে মহাফূর্তিতে। আধ মাইল দূরে হুরাসাগর নদী। কাজ না থাকলে মাছ ধরে। মাঝে মাঝে নৌকা ভাড়া নিয়ে যাত্রী পারাপারের খেপ দেয়। মন চাইলে রান্না করে। রান্না বলতে ল্যাটকা খিচুড়ি।
হারু থাকায় একটাই লাভ হয়েছে। কথা বলার লোক পেয়েছেন জহির। গ্যালাক্সি আর দৃশ্যমান মহাকাশ ছাড়িয়েও যে আরও মহাবিশ্ব থাকতে পারে সেসব নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলাপ চালানো যাচ্ছে। মেগাভার্স, গিগাভার্স, চতুর্মাত্রিক জগত থেকে মানুষকে দেখতে কেমন লাগবে এসব হাবিজাবি।
হারু গেল থানকুনি পাতার খোঁজে। জহির উদ্দিন কয়েকবার হাত বাড়িয়ে দেখলেন। কুয়াশা ঘন হলে শীত কম হওয়ার কথা। মনে হচ্ছে না। ভেজা চাদর গায়ে কেঁপে কেঁপে উঠছেন।
কুয়াশায় দিক হারিয়ে হাঁটা দিলে কেমন হয়? এ যুগে কেউ দিকহারা হয় না। খাল পার হলেই আজিম চৌধুরীর বাড়িতে ঠোক্কর খেতে হবে। এরপর কাদা আর একটা সবজি ক্ষেত মাড়িয়ে সোজা রাস্তা ধরে এগোলে স্কুল। তারপর ঘাস শুকিয়ে আসা মাঠ। যাওয়ার সময় দুয়েকটা আগুন পোহানোর দৃশ্য চোখে পড়তে পারে।
গ্রামগুলোয় আগের মতো রহস্য নেই। অচেনা জায়গা নেই। সব পরিচিত। সব জায়গার নাম হয়ে গেছে। যেখানেই তাকান, অমুকের জমি না হয় তমুকের লিজ নেওয়া নদীনালা। নদী-খালেরও ভাগ-বাটোয়ারা করে ফেলেছে এলাকার নেতা-পুতিরা।
জহির উঠে দাঁড়ালেন। চাদর পেঁচালেন টাইট করে। উঠোন পেরিয়ে দক্ষিণের রাস্তা ধরে চললেন হুরাসাগরের দিকে। আত্মহত্যার কাজটা আজ রাতেই সেরে ফেলা যাক। এটা বিয়েবাড়ির কেনাকাটা না যে বিরাট আয়োজন করে করতে হবে।
পরিকল্পনা সাধাসিধা। নৌকা ভাড়া করবেন। মাঝিকে বিশ টাকা বাড়তি দিয়ে বলবেন ইঞ্জিন বন্ধ রাখতে। ভটভট শব্দে মাথা ধরে যায়।
মাঝি নৌকার এক মাথায়, তিনি আরেক মাথায়। নৌকা মাঝনদীতে এলে মাঝিকে বলবেন ঘুম দিতে। এরপর টুপ করে নেমে যাবেন পানিতে। সশব্দে ঝাঁপ দেওয়া চলবে না। মাঝি টের পেলে কেলেঙ্কারি। আত্মহত্যা করতে গিয়ে বেঁচে গেলে গ্রামের লোকজন বাক্যবাণেই মেরে ফেলবে।
ঘাটে কুয়াশা আরেক ডিগ্রি বেশি। মাঝারি সাইজের একটা নৌকা আছে। মাঝি কাঁথামুড়ি দিয়ে শোয়া। গাঁজার গন্ধ আসছে। যে শীত পড়েছে তাতে কাঁথায় কাজ হওয়ার কথা নয়। গাঁজা খেলে শীত কম লাগে?
‘কী চান?’
‘মাঝনদীতে যাবে?’
‘মাইজ নদীত যাইয়া কী করবেন? লগে মাইয়া মানুষ আছে?’
‘না। মেয়ে মানুষ নাই। মাঝনদীতে যাব। তোমার ভাড়া তো একশ। পকেটে দুইশ আছে। পুরাটাই পাবা।’
‘শইলে টান দিসে। আইজ পারুম না। মরতে চাইলে কালকা আসেন।’
জহিরের মনে হলো জগতে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মতো আরও কিছু রহস্য আছে। গঞ্জিকা সেবনের কারণে মাঝির মগজে কিছু অলিগলি ফটাফট খুলে গেল? নিউরনগুলো দারুণ উত্তেজনায় ফায়ারিং শুরু করেছে? গভীর রাতে চাদর পেঁচানো মধ্যবয়সী এক লোক উদাস ভঙ্গিতে (মেয়েসঙ্গী ছাড়া) মাঝনদীতে যাবে বলায় মাঝির মগজ আসল কাহিনি ধরে ফেলল?
‘শরীরের টান জিনিসটা কী?’
‘নদীতে জোয়ার-ভাটা হয় না? ওই রকম। শইলে এখন ভাটা। বিদায় হন।’
‘বিদায় হবো কেন? নদীর পাড় তো তোমার বাড়িঘর না।’
‘তাইলে খাড়াইয়া মোতা দেন।’
জহির চিন্তায় পড়ে গেলেন। বিরক্ত অবস্থায় আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে না। আত্মহত্যা করার আগে মানুষ চরম বিষণ্ন থাকে? নাকি বিষণ্নতা কেটে যাবে ভেবে কিছুটা আনন্দে থাকে? কেউ একরাশ বিরক্তি নিয়ে একদলা থুথু ফেলে সুইসাইড করবে?
আত্মহত্যা করতে গিয়ে বেঁচে ফিরে আসা কয়েকজনের সাক্ষাৎকার পড়তে পারলে জানা যেত। ফোনের ব্রাউজারে টাইপ করা যাক। কী লিখবেন? ইনসাইড আ সুইসাইডাল মাইন্ড?
মোবাইলে ডেটা না থাকায় বিষয়টা জানতে পারলেন না জহির। মনে অপূর্ণতা খচখচ করছে। থাক, আত্মহত্যা আরেকদিন করা যাবে। ছোট বাথরুম চেপে রেখে মরার কথা ভাবাও যাচ্ছে না।
মাঝির কথা শুনে জহিরের মনে হলো তার ভালোই বেগ পেয়েছে। মগজটাও বার্তা দিয়ে যাচ্ছে, বিরক্তি কমাতে হলে ঘন কুয়াশার রাতে থানকুনি ভর্তা দিয়ে গরম খিচুড়িও খাওয়া চাই। বাড়ি চলো বাড়ি চলো বাড়ি চলোরে।
‘নানা আইছে। নানা ভাত খাও। মা ভাত দাও। নানার ভাত দাও।’
জহির উদ্দিনের ধারণা ভুল প্রমাণ হলো। মেয়েকে ভালোবাসেন ঠিকই। তবে সোয়েটার কানটুপি পরে চেয়ারে বসে থাকা চার বছরের নাতি ইরফানের প্রতি মমতার পাহাড় আছড়ে পড়েছে। অনভ্যাসের কারণে ছুটে গিয়ে কোলে নিতে পারলেন না। হাসতে গিয়ে দেখলেন চোখে পানি চলে আসছে।
‘বাবা, খিচুড়িটা গরম গরম খাও। হারুন ভাই অমৃত রান্না করেছে। পোড়া মরিচ দিয়া থানকুনির ভর্তা। আমি জলপাই-রসুনের আচারও এনেছি।’
‘হারু আবার হারুন হইল কবে! হারুন! তুমি এরফান আলিরে একটা ডিম ভাইজা দাও।’
হারু ‘জি ওস্তাদ’ বলে ছুট লাগাল। তার উত্তেজনা দেখে মনে হচ্ছে বাড়িতে ডিম না থাকলে মুরগির পেটে চাপ দিয়ে বের করে আনবে।
(চলবে)শেষ রাতে দুঃস্বপ্ন দেখছেন জহির। নদীর তীরে বেড়াতে গেছেন ইরফান আর লিপিকে নিয়ে।
ঘাট বরাবর হাঁটছেন। পায়ের কাছে বিচিত্র সব মাছ খাবি খাচ্ছে। কোনো মাছের আবার পা আছে। তারা দৌড়াচ্ছে ডাঙ্গার দিকে।
ইরফান মাছ দেখে ছোটাছুটি করছে। লিপি ছুটছে পেছন পেছন। ষণ্ডামার্কা এক লোক এসে দাঁড়াল। হাতে এক গাছি দড়ি। জহির উদ্দিনকে বেশ সমীহ করে বলল, চাচাজি চলেন। সময় হইসে।
‘কই যাব! তোমার হাতে দড়ি কেন!’
‘আপনার ফাঁস লওনের কথা আইজকা।’
‘না! আজকে না তো! আমার নাতি আসছে, মেয়ে আসছে।’
‘আমি নৌকা নিয়া আসছি। নৌকা সাজানো হইসে। ওই যে দেখেন।’
ফুলের মালায় সাজানো নৌকা। ঝালরবাতিও আছে। ওদিকে আকাশভর্তি মেঘ। শীতল বাতাসে কুঁকড়ে যাচ্ছেন জহির।
‘সালেহা! সালেহা! এই লোক কে!’
‘আফনে চলেন চাচাজি। দেরি করা ঠিক না। মাইঝনদীতে গিয়া ফাঁস লইবেন। চলেন। জোর কইরা লইয়া যামু?’
স্বপ্নে লোকটার সঙ্গে যথারীতি পেরে উঠছেন না জহির। এ অবস্থায় ঘুম ভাঙার কথা। ভাঙলো না।
নৌকায় উঠতেই কয়েক সেকেন্ডে চলে গেলেন মাঝনদীতে। দূরে ইরফান আর লিপি। তাকে দেখছে না। তারা ব্যস্ত মাছ ধরাধরিতে।
জহির আচমকা পড়ে গেলেন নদীতে। বরফের মতো শীতল পানি সাঁড়াশির মতো আঁকড়ে ধরেছে তাকে।
ঘুম ভাঙতেই দেখলেন গা থেকে কাঁথা টেনে সরিয়ে ফেলেছে ইরফান। স্বপ্নে প্রচণ্ড শীত লাগার এটাই কারণ।
‘নানা পিঠা খাও।’
বাড়ির পেছনে বেড়া দিয়ে বানানো রান্নাঘরে মাটির চুলায় পিঠা হচ্ছে। ব্যাকআপ হিসেবে একটা গ্যাসের সিলিন্ডার রাখা আছে। তবে লিপি মাটির চুলাতেই পিঠা বানাবে। শহরের বাসিন্দাদের মাটির চুলা বাবদ আদিখ্যেতা থাকে। জহিরের এসব ভালো লাগে না। তবে মেয়ের হিসাব আলাদা। মেয়ে যদি এখন বলে মরিচ পোড়া দিয়ে শাপলার ডাঁটার ঝোল খাবে, তিনি সেটাও আনবেন।
লিপির পাশে হারু ফুঁ দিয়ে পিঠা খাচ্ছে আর গুটুর গাটুর করছে। ইরফান চড়ে আছে হারুর কাঁধে।
‘চাচাজি, দেহেন গাছ থেইকা টুপ কইরা একটা বান্দর আমার পিডে বসছে। বান্দর আবার পিডা খায়।’
জহির উদ্দিন ভাবলেন কিছু প্রশ্ন এখন না করলে ক্ষতি নেই। শীতের এই হিম ভোরে মেয়ে পিঠা বানাচ্ছে, শহরের নাতিটা খালি পায়ে মাটিতে ঘুর ঘুর করছে। যার কাঁধে খুশি উঠে বসছে; এমন দৃশ্য দেখতে দেখতে শাপলার ডাঁটার তরকারি দিয়ে গরম গরম রুটি খাওয়া যায়। তারপরও মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল।
‘কামাল আসে নাই?’
‘আমি পুরাপুরি চলে আসছি বাবা। আর যাব না। কামাল জামাল গোনার টাইম নাই।’
‘ওহ আচ্ছা। দে একটা পিঠা দে। গুড় কম নারিকেল বেশি। চালের গুঁড়া কই পাইলি?’
‘নিয়ে এসেছি। হারুন ভাই নাকি খালের পাড়ে নারিকেল পাইছে। ঢাকায় এই নারিকেলের দাম কমসে কম একশ বিশ টাকা।’
হারুর টুকটাক মিথ্যা কথায় কান দেন না জহির। লিপি পিঠা বানাবে শুনে সে লেবু মিয়ার নারিকেল পেড়ে এনেছে। টের পেলে গ্রাম মাথায় তুলবে। হারুকেও তুলতে পারে। পেটা শরীরের লেবু মিয়ার স্মৃতিশক্তি সিজনিং করা বাঁশের মতো টনটনা। প্রতিটা নারিকেল গুনে রাখে।
জহির উদ্দিন আজ দোকানে গেলেন না। দুপুর না হতেই সাইকেল চালিয়ে নুরুল আলম হাজির। মাসকাবারি তিন হাজার বেতন আর দুই বেলা খাবার। এই তার জীবন।
‘বাড়িত যামু। দুই দিন ছুটি দেন।’
জহির জানেন দুদিন মানে এক সপ্তাহ। এক সপ্তাহ নাতিকে নিয়ে গ্রামের এটা ওটা দেখাবেন ঠিক করেছিলেন। নুরুল আলম ছুটিতে গেলে সেটা হবে না।
‘তোর চাকরি নট। আমি আরেকজন দেখবো। তুই যা। ছুটি কাটা।’
নুরুল আলম পাত্তা দিল না। সে জানে এই বাজারে তার মতো কাজের লোক পাওয়া কঠিন।
‘আইজকা ভাত দিবেন না? নাকি চাকরি এখনই নট।’
লিপি চলে আসায় কড়া কিছু বলতে পারলেন না জহির। তিনি কড়া কথা বলতেও পারেন না।
‘তোমার নাম নুরুল? বয়স কত?’
‘উনিশ বিশ হইব। আপনে চাচার মাইয়া? ঢাকা থেইকা আসছেন?’
নুরুলের বয়স টেনেটুনে ষোলো। নাকের নিচে পাতলা গোঁফের রেখা। লিপির দিক থেকে তার চোখ সরছে না। ঢাকায় ভালো চাকরি করলে চেহারায় একটা পরিবর্তন আসে। সহসা গ্রামের মেয়ে বলে চালানো যায় না।
‘ছুটি নেবে কেন? বিয়া করবা? পাত্রী ফাইনাল? ছুটি না নিলে তোমারে নিয়ে একটু গ্রাম দেখতে বের হবো। তুমি আমাকে সাইকেল শেখাতে পারবা?’
নুরুল আলম বাড়ি যাবে, কারণ তার খালাতো বোনের বান্ধবী ঝুমু তাকে যেতে বলেছে। কিছুদিন প্রেম টেম করে আবার ফিরবে আলতাকান্দি। লিপির প্রস্তাব শুনে মনে মনে দুবার বলল, ঝুমু তোর খেতা পুড়ি। ওদিকে রান্নাঘরে চুলায় লাকড়ি ঠেলতে ঠেলতে হারু ভাবল, তার জীবনের বত্রিশ আনা বৃথা। সে সাইকেল চালাতে পারে না।
তিন চারদিন যেতেই বাড়ির চেহারা বদলে গেল। সবার আগে বাড়ির পাশে বানানো হলো নতুন টয়লেট। তাতে দামি দেখে হাইকমোডও বসলো। বাড়ির টুকটাক কাজ করাতে গিয়েই জহির টের পেলেন ব্যাংকে এতদিনে ভালোই টাকা জমেছে তার।
ঘরের ভেতর আলাদা একটা সুঘ্রাণও পাওয়া যায়। সেটা হারুর কুড়িয়ে আনা ফুল কিংবা ইরফানের বেবি পাউডারের কারণেও হতে পারে।
নুরুল আলম বারোটার মধ্যেই দুপুরের খাবার খেতে আসে। যেতে যেতে বাজে তিনটা। লিপির জন্য চকচকে প্যাকেটের আচার নিয়ে আসে। জহিরের দোকানের আচার। ইরফানের সঙ্গে খাতিরও জমছে। ইরফান তাকে ডাকে নুরা বাই। নুরুল আলম কিছুতেই তাকে মামা বা কাকা ডাকাতে পারছে না।
জহির হারুকে দোকানে পাঠান না। সে নাকি ওজনের হিসাব বোঝে না। সে অবশ্য নদী থেকে মাছটাছ ভালোই ধরছে।
লিপি মহা উৎসাহে নার্সারি থেকে এটা সেটার চারা এনে লাগানো শুরু করেছে। জহির উদ্দিন এখন আর ফোনে ওয়েভ ফাংশন বোঝার চেষ্টা করছেন না। আজও ইরফানকে সঙ্গে নিয়ে নদীর ধারে বেড়াতে গেছেন।
মারাত্মক শীত পড়লেও ইরফানের কুচ পরোয়া নেহি। কানটুপি থাকলে আর চিন্তা নাই।
‘চাচাজি আছেন কেমন?’
স্ট্যাচু হয়ে গেলেন জহির উদ্দিন। স্বপ্নে দেখা সেই ষণ্ডামার্কা লোকটা। হাতে দড়ি নেই।
‘আমি রাসু মাঝি। ওইদিন মাইঝ নদীতে যাইতে চাইসিলেন। আইজকা যাইবেন? একশ দিলেই হবে। লগে কিডা? নাতি?’
‘হুঁ। না যাব না। আর যাব না।’
‘আর যাইবেন না কেন? ওই দিন ধরা টরা খাইছিলেন নাকি? হে হে।’
জহির বুঝতে পারছেন ওই রাতে গাঁজার নেশায় ছিল লোকটা। ধরেই নিয়েছে জহির কোনো এক নারীসঙ্গী নিয়ে নৌকা ভাড়া নিতে এসেছিল।
জহিরের উচিত গটগট করে চলে যাওয়া। তিনি নড়লেন না। লোকটাই চলে গেল। তার নৌকায় ছই লাগানো হয়েছে। সেটা আবার ফুল দিয়ে সাজানো। ভেতরে এক নবদম্পতিকে দেখে হাঁফ ছাড়লেন জহির। ইরফানকে কোলে তুলে হাঁটা দিলেন বাড়ির দিকে।
‘বাবা শোনো। তুমি মুখে বলতে পারছো না। কিন্তু প্রশ্ন জমতে জমতে ব্লাড প্রেশার যাবে বেড়ে। তার চাইতে আমি সব ক্লিয়ার করি।’
জহির উদ্দিন মুখটাকে বেকুবের মতো করে বসে রইলেন খাটে। লিপি কী বলবে বুঝতে পেরেছেন। আঁচ করতে না পারার ভান করছেন।
‘কামালের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়েছে ছমাস। কাগজপত্র বাকি। জিগাতলার একটা রুম ভাড়া করেছিলাম। জমানো টাকা ছিল। চাকরি করেছি কিছুদিন। এখন চলে গেছে। বলতে পারো পালিয়ে এসেছি। এক মাসের বাসা ভাড়া বাকি। আমি বেকার বসে আছি শুনলে ইরফানকে নিয়ে যাবে তার বাবা। অবশ্য বয়স ছয় বছর হওয়ার আগে লিগ্যাল অ্যাকশনে যেতে পারবে না।’
‘ছয় বছর পর কী করবে? বাচ্চা নিয়ে যাবে?’
‘নিয়ে গেলে যাবে। টাকা-পয়সায় তার সঙ্গে পারব না। তার বিরাট লাইনঘাট। অবশ্য ঝামেলা করবে না। আমি হুমকি দিয়েছি ঝামেলা করলে সুইসাইড করবো আর সুইসাইড নোটে তাকে দায়ী করে যাব।’
‘তুই সুইসাইড করবি কেন! করলে ও করুক ।’
বিরক্ত হলো লিপি। কামাল কেন সুইসাইড করবে! তার কীসের দুঃখ! সে হলো ভীতুর ডিম। মডেল বান্ধবীদের নিয়ে মহাসুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
মহাকাশ, দূরের গ্যালাক্সি আর ব্ল্যাকহোলে সময় স্থির হয়ে যাওয়া সংক্রান্ত একগাদা আর্টিকেল পড়ে জহিরের কাছে একটা সময় দুনিয়ার সাংসারিক সমস্যাগুলোকে তুচ্ছ মনে হতো। এখন হচ্ছে না। ভালোই টেনশনে পড়েছেন। বারবার মনে হচ্ছে ওই রাতে নদীতে ঝাঁপ দিলে বিরাট ক্যাচাল বেঁধে যেত। বাচ্চাসহ লিপি এসে পড়ত মহা বিপদে। দিশেহারা হয়ে ছুটে যেত ঢাকায়। সেখানে আবার এক মাসের ভাড়া বাকি। ঢাকায় নেই আত্মীয়স্বজন।
‘চিন্তা নাই। আমার দোকান আছে। দরকার হইলে বাপবেটি মিলে দোকানদারি করবো।’
‘না বাবা। দোকানদারি করবো না। এখানে একটা কোচিং সেন্টার খুলবো না হয় প্রাইভেট পড়াব। একটা নার্সারিও দিব। আজকাল গ্রাম থেকে অনলাইনে এসব ব্যবসা চলে ভালো।’
‘নার্সারি দিবি কই? জমি টমি তো নাই। খালের পাড়ে যেটুকু জায়গা জংলায় ভরা।’
‘হারুন ভাই সব ঠিক করে দেবে। সব পরিষ্কার করা হবে। তুমি শুধু শুধু চিন্তায় মরে যাচ্ছো। হারুন ভাই চিন্তামুক্ত মানুষ। নুরুল আলমকে রাতে এ বাসায় রাখার ব্যবস্থা করো। একা একা দোকানে থাকে, খারাপ লাগে। সেও কাজে আসবে।