ফয়সল আবদুল্লাহ
নদী-নালা আর সমুদ্রের কলতান মানব সভ্যতার ইতিহাসের সাথে অবিচ্ছেদ্য সুতোয় বাঁধা। আদিম মানুষ যখন বর্শা বা তীর ফুটিয়ে মাছ শিকার করত, তখন থেকেই জলের নিচের সেই রূপালি সম্পদকে ছোঁয়া ছিল এক পরম রোমাঞ্চ ও বেঁচে থাকার লড়াই। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মানুষ যখন সুতো আর বাঁশের ছিপ দিয়ে মাছ ধরাকে কেবল জীবিকা নয়, বরং এক রাজকীয় শিল্প ও বিনোদনে রূপ দিল, তখন একটি বড় সমস্যা দেখা দিল। বড় কোনো মাছ সুতোয় টান দিলে সেই তীব্র গতি আর শক্তির সাথে লড়াই করা সাধারণ হাতের পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠত। সুতো ছিঁড়ে মাছ পালিয়ে যেত গভীর জলে। এই সীমাবদ্ধতাকে জয় করতে আজ থেকে আঠারশ বছর আগে প্রাচ্যের এক প্রাচীন ঘরে জন্ম নিয়েছিল এক জাদুকরী মেকানিক্যাল ডিভাইস—মাছ ধরার রিল। ইংরেজিতে যাকে বলে ফিশিং রিল। এটি কেবল মাছ ধরার যন্ত্র নয়; এটি হলো মানুষের এমন এক বুদ্ধিদীপ্ত আবিষ্কার, যা সুতোর টান আর হাতের আঙুলের ঘূর্ণনকে এক সূক্ষ্ম জ্যামিতিক ভারসাম্যে বেঁধে দিয়েছে।
মাছ ধরার রিল বা চাকা হলো এমন একটি ঘূর্ণায়মান যান্ত্রিক যন্ত্র, যা ছিপের গোড়ার দিকে যুক্ত থাকে। এর মূল কাজ হলো মাছ ধরার সুতোকে পেঁচিয়ে সুবিন্যস্তভাবে ধরে রাখা এবং মাছ যখন টোপ গিলে জোরে দৌড় দেয়, তখন সুতোকে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে ছেড়ে দেওয়া বা টেনে আনা।
বিজ্ঞান ও মেকানিক্সের দৃষ্টিতে এটি একটি অসাধারণ আবিষ্কার। যখন একটি বড় এবং শক্তিশালী মাছ টোপ গিলে জলের গভীরে ছুটতে চায়, তখন তার গতিশক্তিকে সরাসরি টেনে ধরে থামানো অসম্ভব। রিল এখানে একটি ‘মেকানিক্যাল অ্যাডভান্টেজ’ বা যান্ত্রিক সুবিধা তৈরি করে। এর ভেতরের গিয়ার এবং ড্র্যাগ সিস্টেম মাছের টানকে ঘর্ষণের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে সুতোটি ছিঁড়ে না গিয়ে মাছটি ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। প্রাচীন চীনে যখন জটিল কোনো মোটর বা আধুনিক কারিগরি বিদ্যার জন্ম হয়নি, তখন কেবল কাঠ এবং ব্রোঞ্জের চাকা দিয়ে এই ব্যবস্থার সৃষ্টি করা ছিল এক অবিশ্বাস্য বৈজ্ঞানিক দূরদর্শিতার প্রমাণ।
চীনের আবিষ্কার মাছ ধরার রিলে একটি মূল অক্ষের ওপর একটি চাকা ঘোরানো হয়। চাকাটির সাথে একটি ছোট হাতল যুক্ত থাকে। ওটা ঘুরিয়ে গোটানো হয় সুতো। প্রাচীন চীনা রিলগুলো আধুনিক রিলের মতো ছিপের একদম নিচে থাকত না; এগুলো থাকতো ছিপের মাঝ বরাবর বা কিছুটা ওপরে। এতে করে জেলে দুই হাত দিয়ে লিভারের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেন। যখন কোনো বড় মাছ টোপ গিলত, জেলে হাতলটি আলগা করে দিতেন। চাকাটি বনবন করে ঘুরে সুতো ছেড়ে দিত, ফলে মাছের প্রাথমিক ধাক্কায় ছিপ ভেঙে যেত না। মাছটি কিছুটা শান্ত হলে জেলে আবার হাতল ঘুরিয়ে সুতো গুটিয়ে নিতেন।
ইতিহাসে মাছ ধরার রিলের প্রথম সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় ১১৯৫ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত চীনা চিত্রশিল্পী মা ইউয়ানের একটি পেইন্টিংয়ে। ‘অ্যাংলার অন এ উইন্টার লেক’ নামক সেই চিত্রে দেখা যায়, একজন একাকী জেলে শীতের হিমশীতল হ্রদে নৌকায় বসে মাছ ধরছেন এবং তার হাতের ছিপের গোড়ায় একটি সুস্পষ্ট যান্ত্রিক রিল বা চাকা যুক্ত রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ১২৫১ এবং ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগের বিভিন্ন চীনা স্ক্রল ও চিত্রাঙ্কনে এই রিলের ব্যবহার আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চীনা ঐতিহ্যে একে বলা হতো তিয়াও ছ্য বা ‘মাছ ধরার গাড়ি’।
পরবর্তীতে উ চেনের চিত্রকর্ম এবং ত্রয়োদশ শতকের থিয়ানচু লিংছিয়ান গ্রন্থের কাঠখোদাই চিত্রেও ফিশিং রিলের ব্যবহার দেখা যায়। অপরদিকে, ইউরোপের ইতিহাসে ১৬৫১ সালের আগে মাছ ধরার কোনো মেকানিক্যাল রিলের উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
মাছ ধরার রিল যে চীনের একটি প্রাচীন আবিষ্কার, তার প্রমাণ কেবল মা ইউয়ানের চিত্রকর্মে সীমাবদ্ধ নয়; বরং চীনের প্রাচীন সাহিত্য ও অন্যান্য দলিলেও এর বহু প্রমাণ ছড়িয়ে রয়েছে।
৩য় শতাব্দীর দিকে লেখা ‘জনপ্রিয় অমরদের জীবন’ নামের চীনা বইতেও মাছ ধরার রিলের কথা আছে। থাং রাজবংশের বিখ্যাত কবি লু কুইমেং এবং তার বন্ধু পি রিসিউর কবিতায় প্রায়শই মাছ ধরার রিলের প্রসঙ্গ এসেছে। কবি পি রিসিউ উপহার হিসেবে পাওয়া একটি রিলের প্রশংসা করে লিখেছিলেন—‘এটি একটি কোণাকৃতির হাতলওয়ালা চাকা, যা অত্যন্ত মসৃণ এবং হালকা।’
পরবর্তীতে সং রাজবংশের কবি হুয়াং থিংচিয়ান এবং ইয়াং ওয়ানলির বিভিন্ন গীতি কবিতায় হ্রদ ও মাছ ধরার নৌকার বর্ণনায়ও ফিশিং রিলের উল্লেখ পাওয়া যায়। ওই রাজবংশের বিখ্যাত বিজ্ঞানী শেন খুও তার একটি ভ্রমণগ্রন্থে মাছ ধরার রিলের বিবরণ দিয়ে লিখেছিলেন—‘মাছ ধরার জন্য চাকাযুক্ত ছিপ ব্যবহার করা হয়, আর ছিপটি তৈরি হয় বেগুনি বাঁশ দিয়ে। এখানে চাকাটি খুব বেশি বড় করার প্রয়োজন নেই এবং ছিপটিও খুব দীর্ঘ হওয়ার দরকার নেই; কিন্তু সুতোটি যদি লম্বা হয়, তবেই আপনি চমৎকারভাবে মাছ ধরতে পারবেন।’
চীনের মাছ ধরার রিলের আরেক আদিম পূর্বসূরির সন্ধান পাওয়া যায় প্রাচীন চীনা গ্রন্থ ‘মো চু’-তে, যার সময়কাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩২০ খ্রিস্টাব্দ। বইটি ছিল তৎকালীন একদল যোদ্ধা-দার্শনিক এবং আদি-বিজ্ঞানীদের সংকলন, যাদের ‘মোহিস্ট’ বলা হতো। এই মোহিস্টরা সামরিক প্রযুক্তিতে অনেক নতুন নতুন উদ্ভাবন করেছিলেন।
তাদের তৈরি তেমনই একটি যুদ্ধাস্ত্র ছিল ‘আর্কুব্যালিস্টা’, যা ছিল মূলত এক ধরনের আদিম গোলন্দাজ বা কামানের মতো যন্ত্র। এটি দিয়ে শত্রুদের লক্ষ্য করে একসাথে একঝাঁক বর্শা নিক্ষেপ করা হতো। সেই যুগে বর্শাগুলো ছিল ব্যয়বহুল। তাই অপচয় কমাতে বর্শাগুলোর পেছনে শক্ত দড়ি বেঁধে দেওয়া হতো। বর্শা নিক্ষেপের পর একটি রিল এবং ঘূর্ণায়মান চাকা ব্যবহার করে সেগুলোকে টেনে ফিরিয়ে আনা হতো। অনেকের ধারণা এই আর্কুব্যালিস্টা থেকেই এসেছে মাছ ধরার রিল।
প্রাচীন চীনের সেই কাঠের চাকা আজ আর কাঠের গণ্ডিতে আটকে নেই। বিশ্বজুড়ে স্পিনিং রিল, বেইট কাস্টিং রিল এবং ফ্লাই রিলসহ এর শত শত আধুনিক রূপ আমরা দেখতে পাই।
আজকের আধুনিক রিলে যে ‘অ্যান্টি-রিভার্স’ গিয়ার বা ‘ড্র্যাগ সিস্টেম’ ব্যবহার করা হয়, তার আদিমতম রূপ ছিল চীনাদের সেই স্পিন্ডল ব্রেক ব্যবস্থা। এখনকার কার্বন ফাইবারের তৈরি রিলেও কিন্তু সেই একই মূল নীতি কাজ করছে, যা হাজার বছর আগে ইয়েলো রিভার বা ইয়াংজি নদীর তীরে বসে কোনো এক চীনা কৃষক বা জেলে চিন্তা করেছিলেন। চীন আজ কেবল এই যন্ত্রের আবিষ্কারকই নয়, বরং বর্তমান বিশ্বের সিংহভাগ আধুনিক ফিশিং ট্যাকল ও রিল রপ্তানিকারক দেশও।
মাছ ধরা আজ আর কেবল ক্ষুধার অন্ন জোগানোর মাধ্যম নয়। এটি এখন বিশ্বজুড়ে একটি বিশাল ক্রীড়া এবং মানসিক প্রশান্তির এক অন্যতম মাধ্যম। সপ্তাহের শেষে সমস্ত ক্লান্তি ভুলে নদীর ধারে বা সমুদ্রের বুকে ছিপ ফেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেয় লাখো মানুষ।
সিএমজি