সরকার ও জনগণের মধ্যে আস্থা গড়ে তোলা: নিজে অগ্রণী হয়ে সততার সঙ্গে দেশ পরিচালনা

ইয়াং ওয়েইমিং স্বর্ণা

শাং ইয়াংয়ের ‘কাঠের খুঁটি স্থাপন করে আস্থা প্রতিষ্ঠা’র গল্প ইতিহাসে প্রশংসিত হয়ে আসছে। অন্যদিকে, চৌ রাজবংশের রাজা ইউয়ের আস্থা ভঙ্গের পরিণতি মানুষকে সতর্ক করে দেয়। সম্পূর্ণ বিপরীত পরিণতির এই দুটি ঘটনা ইতিহাসের পাতায় স্থান পেয়েছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে উঠেছে।

চীন ইতিহাসকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং প্রজ্ঞা আহরণে দেশটির দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। প্রাচীন চীনা দার্শনিকেরা পূর্বসূরিদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে অনেক আগেই সরকার ও জনগণের মধ্যে আস্থার সম্পর্কের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। তারা সংক্ষেপে বলেছিলেন, ‘জনগণের আস্থা অর্জন করলে রাজত্ব টিকে থাকে, আর জনগণকে প্রতারিত করলে পতন ঘটে।’ অর্থাৎ, জনগণের বিশ্বাস অর্জন রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার ভিত্তি, আর সেই বিশ্বাস ভঙ্গ করলে রাষ্ট্রের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে। হাজার বছরের ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, জনগণের আস্থা অর্জনই সুশাসনের মূল এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম ভিত্তি।

তাহলে সরকার কীভাবে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে? ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নৈতিক চর্চা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সমন্বয়ে আধুনিক চীন এ প্রশ্নের একটি নিজস্ব উত্তর খুঁজে নিয়েছে। দেশটি মনে করে, সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য নৈতিকতা, দায়িত্বশীলতা এবং কার্যকর জবাবদিহি—এই তিনটির সমন্বয় জরুরি।

চীনের রাজনৈতিক ঐতিহ্যে সততার সঙ্গে দেশ পরিচালনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক সি চিন পিং বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তাদের কর্মশৈলীর উন্নয়নকে দলীয় আদর্শ ও নৈতিকতার চর্চার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তাদের সচেতনভাবে সততা বজায় রাখতে হবে, নিয়মকানুন বুঝতে হবে, শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে এবং কথা ও কাজে সামঞ্জস্য রাখতে হবে। একই সঙ্গে তাঁদের মনে নৈতিক সংযম, কাজে আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং দলের ও জনগণের প্রতি আনুগত্য থাকতে হবে। প্রকাশ্যে ও ব্যক্তিগত আচরণে একই নীতি অনুসরণ করতে হবে এবং কোনো পরিস্থিতিতেই নিয়ম ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করা যাবে না।

দলীয় কর্মকর্তা ও সদস্যদের মধ্যে সততার চর্চা জোরদার করতে চীন নিয়মিত নৈতিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে সততা ও নৈতিকতা বিষয়ে নির্দেশিকা প্রণয়ন, আলোচনা সভা আয়োজন এবং নিয়মিত অধ্যয়ন কার্যক্রম। দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা ও চর্চার মধ্য দিয়ে সততা ধীরে ধীরে সরকারি কর্মকর্তাদের স্বতঃস্ফূর্ত নৈতিক আচরণে পরিণত হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাও উন্নত করা হচ্ছে।

এ লক্ষ্যে সরকারি কর্মকর্তা ও বিভাগগুলোর দায়িত্ব পালনের রেকর্ড সংরক্ষণ এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার বিষয়টি পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কোন কর্মকর্তা নিয়ম ভঙ্গ করেছেন, কোন সরকারি বিভাগ জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে—এসব তথ্য নথিবদ্ধ রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকাশ করার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। কোনো স্থানীয় সরকার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে, কিংবা নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পূর্ববর্তী প্রশাসনের বৈধ দায়দায়িত্ব অস্বীকার করলে, সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তারা আইন ও বিধি লঙ্ঘন করলে, চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলে কিংবা আস্থার অপব্যবহার করলে তার প্রভাব তাদের নিয়োগ ও পদোন্নতির মূল্যায়নেও পড়তে পারে। কর্মকর্তা ও সরকারি প্রতিষ্ঠান উভয়েই সততা বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করলে সরকারের সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা আরও শক্তিশালী হয়।

চীনে একটি প্রাচীন প্রবাদ রয়েছে—‘মানুষকে নেতৃত্ব দিতে না পারলে তারা অনুসরণ করে না, আর নিজে অগ্রণী না হলে অন্যরা বিশ্বাস করে না।’ এর মূল শিক্ষা হলো, অন্যদের কাজে উদ্বুদ্ধ করতে হলে আগে নিজেকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে সরকারকেই প্রথমে সততা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার প্রমাণ দিতে হবে। এটিই সরকারি বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠার মৌলিক শর্ত।

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির অষ্টাদশ জাতীয় কংগ্রেসের পর থেকে দলকে সর্বাত্মকভাবে কঠোরভাবে পরিচালনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নিজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতার চর্চা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে ‘কাঠের খুঁটি স্থাপন করে আস্থা প্রতিষ্ঠা’র ঐতিহাসিক গল্পের মতোই কাজের মাধ্যমে জনগণের বিশ্বাস অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তাদের সামনে এগিয়ে আসা এবং জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রত্যাশা করা হয়। কারণ, আন্তরিকতা ও বাস্তব কাজের মাধ্যমেই জনগণের আস্থা অর্জন করা সম্ভব। আর সেই আস্থা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও অগ্রগতির নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।

প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ প্রাচীন সমাজে সরকারি কর্মকর্তাদের অন্যতম গুণ হিসেবে বিবেচিত হতো। আধুনিক চীনেও এসব গুণ দলীয় কর্মকর্তা ও সদস্যদের রাজনৈতিক ও নৈতিক মানদণ্ডের অংশ। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ধারাবাহিকভাবে সততা, নৈতিকতা, কর্মশৈলীর উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। নৈতিক শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা—এই দুইয়ের সমন্বয় চীনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা ও নতুন সময়ের প্রয়োজনের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে। দেশটির দৃষ্টিতে, এই সমন্বিত পদ্ধতি সরকার ও জনগণের মধ্যে আস্থা আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি চীনা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত আধুনিকীকরণের পথে জনগণকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।

সূত্র: সিএমজি