বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) স্পেকস ২০৩০ উদ্যোগের। যেটিকে সারাদেশে মানসম্মত, সাশ্রয়ী ও জনকেন্দ্রিক চক্ষুসেবার সুযোগ সম্প্রসারণের পথে একটি বড় পদক্ষেপ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডা. মুহিত জানান, সরকার উপজেলা পর্যায়ে নির্মিতব্য ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালগুলোতে চক্ষুসেবার জন্য বিশেষায়িত বহির্বিভাগ, অন্তর্বিভাগ এবং অপারেশন থিয়েটার সুবিধা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। সরকার একটি সমন্বিত জাতীয় চক্ষুসেবা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে, যার লক্ষ্য প্রায় ১০ লাখ ছানি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা, কয়েক কোটি চশমা বিতরণ নিশ্চিত করা এবং ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির চিকিৎসা সেবা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, “আমরা আধুনিক চক্ষুসেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রায় ৫০০ উপজেলায় উন্নত চক্ষুসেবার আওতায় আসবে, যাতে মানুষকে চিকিৎসার জন্য জেলা শহর বা ঢাকায় যেতে না হয়।’’ তিনি জানান, বর্তমানে নিয়োগ প্রক্রিয়ার অধীনে থাকা প্রায় ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মীর প্রশিক্ষণে প্রাথমিক চক্ষুসেবাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এছাড়া সরকার বিদ্যমান জেলা হাসপাতালের অবকাঠামোর সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশের অন্তত অর্ধেক জেলায় নিয়মিত ছানি অপারেশন এবং রিফ্র্যাক্টিভ এরর বা প্রতিসরণ ত্রুটি সংশোধনসেবা বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। গত ছয় মাস ধরে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করে সরকার এই খাতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি অনুষ্ঠানে বলেন, ‘‘বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে একটি সমন্বিত চক্ষুসেবা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে এবং রিফ্র্যাক্টিভ এরর চিকিৎসার আওতা বাড়াতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’’ তিনি শিশুদের জন্য স্কুলভিত্তিক দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা ও চশমার সহজলভ্যতা এবং শ্রমিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ২০২৪ সালের মে মাসে বিশ্বব্যাপী চালু হওয়া স্পেকস ২০৩০ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো রিফ্র্যাক্টিভ এরর-সংক্রান্ত সেবা সহজলভ্য করা। এই প্রক্রিয়ায় অরবিস ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছে।
অনুষ্ঠানের আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের অসংক্রামক রোগ, মানসিক স্বাস্থ্য ও প্রতিবন্ধী বিষয়ক ইউনিট প্রধান এবং আঞ্চলিক উপদেষ্টা ড. তাশি তোবগে স্পেকস ২০৩০ উদ্যোগের বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও দেশীয় প্রেক্ষিত নিয়ে একটি বিস্তারিত উপস্থাপনা করেন। অনুষ্ঠানে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. এএসএমএম কাদির এবং বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ড. আহমেদ জামশেদ মোহাম্মদ উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনের পর, অরবিস ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর এবং ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর প্রিভেনশন অব ব্লাইন্ডনেসের (আইএপিবি) বাংলাদেশ শাখার অনারারি কান্ট্রি চেয়ার ডা. মুনির আহমেদের পরিচালনায় বাংলাদেশে স্পেকস ২০৩০ বাস্তবায়নের মাধ্যমে চক্ষুসেবা শক্তিশালীকরণ বিষয়ক একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। প্যানেলে বাংলাদেশে আইএলও-র কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ রাজেশ নারওয়াল, আইএপিবি-র আঞ্চলিক কর্মকর্তা ইন্দ্র প্রসাদ শর্মা এবং সিএসএফ গ্লোবালের জহুরুল ইসলাম জুয়েল অংশ নেন। তারা কর্মক্ষেত্রে চক্ষুস্বাস্থ্য, তথ্য-প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়ন এবং সাশ্রয়ী মূল্যে চশমা সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
স্পেকস ২০৩০ পাঁচটি কৌশলগত স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে রচিত এবং এর লক্ষ্য হলো রিফ্র্যাক্টিভ এরর-সংক্রান্ত সেবার সুযোগ সম্প্রসারণের জন্য সরকার, পেশাজীবী সংগঠন, এনজিও, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একত্রিত করা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে চক্ষুসেবা খাতের সকল অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হবে।
পরিশেষে, স্পেকস ২০৩০ এই প্রচেষ্টাগুলোকে সমন্বয় করার জন্য একটি জাতীয় কাঠামো প্রদান করবে এবং ২০৩০ সালের বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রার দিকে একটি বাস্তবায়ন কর্মপন্থা তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশের চক্ষুসেবা খাতে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।