সরকারি স্কুলের বেহাল দশা: নতুন আন্দোলনের মুখে মোদি সরকার

ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে নতুন করে সরব হয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। সংগঠনটি এবার দেশটির সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চরম অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত দৈন্যদশা নিয়ে দেশব্যাপী আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা নিজ নিজ এলাকার সরকারি স্কুলগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করে শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন।

এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে গত ১৩ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার করিসুন্দা গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যান ২৬ বছর বয়সী আবদুল হাফিজ। স্কুলটি তাঁর নিজের শিক্ষাজীবনের স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠান। হাফিজের অভিযোগ, পরিদর্শনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্থানীয় বিজেপি কর্মীরা তাঁর বাড়িতে চড়াও হন। এ সময় তাঁকে ও তাঁর বাবা মোহাম্মদ মফিককে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত মফিককে হাসপাতালে নেওয়া হলেও দুই দিন পর তিনি মারা যান।

ঘটনার পর বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য দায় এড়িয়েছেন। তিনি হামলাকারীদের ‘অপরাধী’ হিসেবে অভিহিত করে দাবি করেছেন, এদের সঙ্গে দলের কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে বাবার দাফন সম্পন্ন করার পর হাফিজ দৃঢ় কণ্ঠে জানিয়েছেন, পরিবারের ওপর নেমে আসা এই শোক তাঁদের ন্যায়বিচারের দাবি থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না। সরকারি স্কুলে উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

সিজেপি তাদের এই কার্যক্রমকে ‘ফিক্স দ্য স্কুলস’ কর্মসূচির আওতায় নিয়ে এসেছে। সংগঠনটি চারটি প্রধান দাবির ওপর ভিত্তি করে একটি প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিটি স্কুলে নিরাপদ পানীয় জল ও পরিচ্ছন্ন শৌচাগারের ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সংযোগসহ উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষ, সীমানাপ্রাচীর ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানসম্মত দুপুরের খাবার ও নিয়মিত শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, শিক্ষার অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হওয়ার মাশুল হিসেবে প্রাণ দিতে হওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

রাজস্থানেও সিজেপির এই স্কুলভিত্তিক কর্মসূচি বাধার সম্মুখীন হয়েছে। গত ১৪ আগস্ট আলওয়ার জেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন সংগঠনের সহ-সমন্বয়ক আশুতোষ রাঙ্কা। সেখানে অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ ও পানীয় জলের দাবি জানানো হয়, যা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পরে মেনে নিতে বাধ্য হয়। তবে এর পরদিন রাজস্থান সরকার সরকারি স্কুলে ‘বহিরাগতদের’ প্রবেশ এবং অনুমতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও ধারণের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। শিক্ষার্থীদের গোপনীয়তার দোহাই দিয়ে সরকার জানিয়েছে, এ ধরনের জরিপ চালানো হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শিক্ষানীতি বিশেষজ্ঞ সামিনা বানোর মতে, ভারতের সরকারি স্কুলব্যবস্থা বর্তমানে এক গভীর কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি জানান, শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভুয়া নিয়োগ এবং দুর্গম এলাকায় দায়িত্ব পালনে অনীহা ভারতের শিক্ষাব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। তাঁর মতে, কেবল আন্দোলনের মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; বরং এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জবাবদিহিতা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলীর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সিজেপির আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। প্রথাগত রাজনৈতিক দলের মতো বিশাল সাংগঠনিক কাঠামো না থাকলেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা তৃণমূল পর্যায়ে জনমত তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে, যা আন্দোলনের ব্যয়ও কমিয়ে আনছে। তবে মাঠপর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবকদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অভাব থাকায় তাঁদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় সিজেপির শিক্ষার্থী সমাবেশের অনুমতি বাতিল বা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে বলে সংগঠনটি অভিযোগ করেছে। আশুতোষ রাঙ্কা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনাকে বিজেপির ভয়ের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, যেকোনো ধরনের বাধা সত্ত্বেও সরকারি স্কুল পরিদর্শন এবং শিক্ষা খাতের সংস্কারের দাবিতে তাদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। বরং যত বেশি প্রতিরোধ আসবে, আন্দোলন তত বেশি বিস্তৃত হবে বলে সিজেপি ঘোষণা দিয়েছে।

সামগ্রিকভাবে, সিজেপির এই উদ্যোগ ভারতের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অবহেলার চিত্রটিকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। যদিও সরকারি বিধিনিষেধ এবং রাজনৈতিক সহিংসতার মতো বড় চ্যালেঞ্জ তাদের সামনে রয়েছে, তবুও শিক্ষা সংস্কারের দাবিটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এখন দেখার বিষয়, সরকারের পক্ষ থেকে এই দাবিগুলোর বিপরীতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না।

ককরোচ জনতা পার্টিনরেন্দ্র মোদিপশ্চিমবঙ্গভারতরাজনীতিশিক্ষা ব্যবস্থা